যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে বেঁচে থাকা

গ্রেনেড হামলার ১৫তম বার্ষিকী আজ

আজাদী ডেস্ক

বুধবার , ২১ আগস্ট, ২০১৯ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ
670

দেড় দশক আগে এইদিনে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী শান্তি সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। তখন বিএনপি-জামায়াত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। মূলত আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে বিএনপি-জামায়াত তথা চার দলীয় জোট সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নৃশংসতম গ্রেনেড হামলা চালায়। জাতি আজ শ্রদ্ধাবনতচিত্তে ইতিহাসের ভয়াবহতম গ্রেনেড হামলার ১৫তম বার্ষিকী পালন করবে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন নেতা সেদিন অল্পের জন্য এই ভয়াবহ হামলা থেকে বেঁচে গেলেও মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বেগম আইভি রহমান ও অপর ২৪ জন নিহত হন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনসমূহ দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে দলের নেতাকর্মীরা আজ সকাল ৯টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নির্মিত বেদীতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করবেন। একই দিন বিকেল ৪টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খবর বাসসের। এছাড়া এই হামলায় আরো ৪শ জন আহত হন। আহতদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। তাদের কেউ কেউ আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি। ঢাকার তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ এবং হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী তাৎক্ষণিকভাবে মানববলয় তৈরি করে নিজেরা আঘাত সহ্য করে শেখ হাসিনাকে গ্রেনেডের হাত থেকে রক্ষা করেন। মেয়র হানিফের মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত অস্ত্রোপাচার করার কথা থাকলেও গ্রেনেডের স্প্লিন্টার শরীরে থাকার কারণে তার অস্ত্রোপাচার করা সম্ভব হয়নি। পরে তিনি ব্যাংকক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এদিকে শেখ হাসিনা গ্রেনেডের আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও তাঁর শ্রবণ শক্তি নষ্ট হয়ে যায়।

অভিযোগ আছে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিকারের ব্যাপারে তৎকালীন বিএনপি সরকার নিলিপ্ত ভূমিকা পালন করেছিল। শুধু তাই নয়, এ হামলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে সরকারের কর্মকর্তারা ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত পাঁচটি গ্রেনেড ধ্বংস করে দিয়ে প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টাও করা হয়েছিল। পরবর্তীতে নতুন করে তদন্ত শুরু হলে বিএনপি সরকারের প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুরজ্জামান বাবর ঘটনার সাথে তারেক রহমান জড়িত আছেন বলে দাবি করে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাধর বড় পুত্র তারেক রহমান এ হামলার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন।
একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়ে গত বছরের ১০ অক্টোবর রায় দেন বিচারিক আদালত। এ রায়ের বিষয়ে হাই কোর্টে আপিল মামলা শুনানির অপেক্ষায় আছে। বর্তমানে শুনানির জন্য পেপারবুক তৈরির কাজ চলছে।
যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে বেঁচে থাকা
বিডিনিউজ জানায়, গ্রেনেডের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৪ জন, তবে ক্ষত নিয়ে বেঁচে গেছেন যারা তাদের অনেকেরই জীবন হয়ে উঠেছে বিষময়। ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় ভয়াবহ সেই হামলার ১৫ বছর পর যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানোর কথা জানালেন তারা।
চিকিৎসার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে অনুদান পেলেও অব্যাহত কষ্টের জীবনে প্রয়োজনের সময় দলীয় নেতাদের পাশে না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। তাদেরই একজন পুরান ঢাকার বাসিন্দা রাশিদা আক্তার রুমা, যার এক পা দিয়ে এখনো রক্ত ঝরে। ঘটনার সময় কোতোয়ালী থানা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা রাশিদা এখন দলের কোনো পদে নেই।
দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পায়ে শত শত স্প্লিন্টার হাড়ের ভিতরে, এই হাড়ের ভিতরের স্প্লিন্টারগুলো যখন উপর নিচে চলাচল করে তখন মনে হয় নিজের পা নিজে কেটে ফেলি। পায়ে খুব যন্ত্রণা করে। ২১ আগস্ট ঘটনার পরই আমার পা কেটে ফেলতে চেয়েছিল। তখন সাবের ভাইসহ কয়েকজন পা কাটতে দেয়নি। আবার যখন কাটতে চাইছিল তখন আপা (শেখ হাসিনা) না করেছেন। তখন আপা বলছে, পা রাখ, যত টাকা লাগে আমি দেব। এখন ডান পা কিছুটা ভালো, কিন্তু বাঁ পায়ের ক্ষত এখনো শুকায়নি, এই যে দেখেন রক্ত ঝরছে। ১৫ বছরে মধ্যে এই ঘা শুকায়নি। এখন ডাক্তার বলছে, এই পা কেটে ফেলতে হবে, এছাড়া কোনো উপায় নাই।
স্বামী মারা যাওয়ায় শিক্ষার্থী তিন ছেলে-মেয়ের সংসারের ভার বইতে হয় এই নারীকে। তাই সরকারি সহায়তা পেলেও চিকিৎসার পুরো খরচ যোগাতে হিমশিম খান বলে জানালেন তিনি। রাশিদা জানান, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সহায়তা হিসেবে এককালীন ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়, যা ব্যাংকে রয়েছে। তার থেকে মাসে আট হাজার টাকা করে পান, যা সংসারের পেছনে ব্যয় হয়। এর বাইরে চিকিৎসা খরচ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। কিন্তু এখন মাসে ১২-১৪ হাজার টাকা খরচ যাচ্ছে, নিজের জায়গা বিক্রি করে চিকিৎসা করছি। দলের কোনো নেতা আমার খবর নেয় না। আমি মরে যাচ্ছি, কেউ খবরও নেয় না।
চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়েও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেন রাশিদা। তিনি বলেন, যেহেতু আমার পায়ে ঘা, সব সময় পানি ঝরে, তাই দুদিন পর পর হাসপাতালে যেতে হয়। হাসপাতালে গেলে গ্রেনেড হামলার রোগী বললে তারা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, ঠিকমতো চিকিৎসা করে না। বিছানা তো দূরের কথা ফ্লোরে শুয়ে থেকে চিকিৎসা করতে হয়। আমি গত কয়েক দিন আগেও ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে এমন লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হয়েছি।
ওই হামলার ভয়াবহতা নিয়ে রাশিদা বলেন, ওই দিনটির কথা মনে হলেই আমার মনে হয় মৃত্যুর খুব কাছ থেকে বেঁচে আসছি। স্প্লিন্টারের আঘাতের সাড়ে ১৫ বছর পর শরীরের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আত্মহত্যা করে মরে যাই। এখন উন্নত চিকিৎসা ছাড়া আমার পা কাটতে হবে।
তার মতোই দলীয় নেতাদের প্রতি ক্ষোভের কথা জানালেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মাহবুবা পারভীন। তিনি শরীরে প্রায় সাড়ে পাঁচশ স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, নেত্রী ব্যতীত অন্য কোনো একজন মানুষ আমার খোঁজ-খবর নেয় নাই। আমি স্বেচ্ছাসেবক লীগ করেছি, অথচ আমার সংগঠনের কেউই আমার খোঁজ নেয়নি।
ওই হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে ওষুধ ছাড়া কোনো রাতেই ঘুমাতে পারেননি জানিয়ে মাহবুবা বলেন, হামলার প্রায় তিন বছর পর একদিন রাত ৩টার সময় আমি ব্লেড দিয়ে কেটে স্প্লিন্টার বের করতে চেয়েছিলাম। এরপর ইনফেকশন হয়ে সেখানে পচন ধরে গিয়েছিল। এত যন্ত্রণা আর ভেতরে কামড়াচ্ছিল। ২০০৪ থেকে এই পর্যন্ত একটা রাতেও ঘুমাতে পারি না। রাতে অনেক পাওয়ারের ঘুমের ওষুধ খেতে হয়। এ রকম আরো অনেকেই প্রতিদিন যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে বেঁছে আছেন।

x