ময়ুখ চৌধুরীর ‘জারুলতলার কাব্য’

মীজানুর রহমান মিজু

শুক্রবার , ৫ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ
145

শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, সহানুভূতি আর নির্ভরতার সমন্বয়ে তৈরি এক আবেগঘন অথচ অদৃশ্য সম্পর্কের নাম প্রেম। প্রেমের আনন্দ অসীম, বেদনা অপার। প্রেম কি শোকাতুর হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস কিংবা বিরহ ব্যথায় ভরা বেদনাবিধূর এক হাহাকার শুধু? হৃদয়-হৃদয় যুদ্ধই কি প্রেম? প্রেম কি শরৎ বাবুর কষ্টের নায়ক দেবদাস? -শরতের শিশির ভেজা আলোকোজ্জ্বল সকাল কি প্রেম নয় তবে? -প্রেমিক হৃদয়ের এমন সব বহুকৌণিক ভাবনার এক সমৃদ্ধ গ্রন্থনা কবি ময়ূখ চৌধুরীর ‘জারুলতলার কাব্য’।
জারুলতলার কাব্য’ ময়ুখ চৌধুরীর নবম কাব্যগ্রন্থ। বিষয়-ভাবনার বিচারে গ্রন্থটি স্বাতন্ত্র্যের দাবিদার। কেননা, এ গ্রন্থের মূল প্রক্ষেপণ বিন্দু সরল ও একমাত্রিক; আর তা হচ্ছে ‘প্রেম’ বা ‘ভালোবাসা’। মানুষের এই প্রেম-চেতনা চিরন্তন ও সর্বজনীন, বয়স বা কালিক ভাবনার উর্ধ্বে এর অবস্থান। এ কাব্যগ্রন্থ রচনা প্রসঙ্গে কবি তাঁর গ্রন্থ পরিচয়ে বলেন, ‘কবিতা ভালোবাসেন, এরকম বেশ কিছু তরুণ-তরুণী, এমনকি অনতি বয়স্ক ভদ্র মহিলা ও ভদ্রলোক এই মর্মে দাবি জানালেন- আমি যেন তাদের মনের মতন কিছু লিখি। সোজা কথায়, পরপর কয়েকটা গম্ভীর অভিব্যক্তিময় কাব্যের পর এবার যেন ভালোবাসার দিকে হাত বাড়াই।’” কবিও তাই প্রায় অর্ধশতক ভালোবাসার কবিতা সংকলিত করে পাঠকের হাতে তুলে দিলেন ‘জারুলতলার কাব্য’। তরুণ বা নব্য প্রেমিক-প্রেমিকারা কবির প্রাথমিক টার্গেট হলেও সব বয়সী মানুষের জন্যই কবিতাগুলো সমান উপভোগ্য। কেননা, প্রেমের অনুভূতি সর্বকালেই চিরনতুন, অমর, অজর। সময়ের স্রোতে প্রেমিক-প্রেমিকা আজ যেখানেই এসে দাঁড়াক না কেন, তাদের মনে আজো জাগরুক সেই অস্ফূট তরুণ প্রেম, যার স্পর্শে আজো শিহরিত হয় হৃদয়, আনন্দ-আবেশে বুঁজে আসে চোখ। কবি বলেন, ‘ইস্টিশনের অল্পদূরে অন্যরকম তরী/জারুলতলায় তরুণ ছায়ায় থমকে গেছে ঘড়ি।” (জিরোপয়েন্ট টু ইনফিনিটি)
অগণিত তরুণ শিক্ষার্থীর বাঁধভাঙা আড্ডার স্থান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ‘জারুলতলা’। কথায়, গানে, আড্ডায়, বিতর্কে, আনন্দ-কলহাস্যে মুখরিত এ স্থান হাজারো তরুণ-তরুণীর পদভারে সদা-মুখরিত। এখানেই হয়তো একদিন চন্দ্রলেখার সাথে বিশ্বজিতের দেখা হয়ে যায়। হয়তো মনের অজান্তেই প্রেমও হয় যায় দু’জনের মাঝে। এভাবেই জারুলতলা অগণিত প্রেমিক-প্রেমিকার হৃদয় অঙ্কিত তীর্থস্থান হয়ে দাঁড়ায়; হয়ে ওঠে হৃদয়ের চরে জেগে ওঠা ভালোবাসা-নির্ভরতার “সবুজ ঘাসের দেশ।” এ ‘জারুলতলা’ তার ব্যক্তর্থ ছাড়িয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার যে কোন মিলনস্থলের প্রতীক হয়ে ওঠে ; হয়ে ওঠে সর্বাঙ্গীন ও শাশ্বত। পৃথিবীর আদি সভ্যতায় এ জারুলতলা ছিল, আজো আছে, অনাগতকালেও প্রেমের তীর্থভূমি হয়ে জেগে থাকবে পৃথিবীর বুকে। কবি তাই ‘পারা-না-পারা’ কবিতায় বলেন, “এইসব দৃশ্যাবলী ছিল/ ইরাবতী তীরে আছে আরও/ হরপ্পার চাকা হয়ে তুমি/ পৃথিবীটা ঘুরে আসতে পারো।”
গ্রন্থটির সব কবিতাই সপ্তবর্গা প্রেমের আভায় ভাস্বর। প্রেমিক-প্রেমিকার মান-অভিমান, বিরহ-বেদনা, রাগ-অনুরাগ, ব্যর্থ প্রেমের হাহাকার প্রাপ্তিতেও অপ্রাপ্তির বেদনা কিংবা অপ্রাপ্তিতেও প্রাপ্তির দুঃখ-বিলাস-সবকিছুরই সাক্ষ্য মেলে বিভিন্ন কবিতায়। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যায়: ১. “মুখের ভাষায় হয়তো বিরাগ ছিল/ তাই বলে কি এমনি করেই যাবে?/ চোখের ভাষা দেখলে না তো সখি,/ সেইখানে প্রেম জ্বলছিল কীভাবে!” (রাগ-অনুরাগ) ২. “রামচন্দ্রের সেতুবন্ধ আর সীতার ঋতুবন্ধের পার্থক্য যে বোঝে না/ গতকাল বিকেলে তার হাত ধরে ফুটপাত বদল করেছো।” (অগ্নিকান্ড) ৩. “ভাঙা টুকরো জোড়া দিয়ে আমি যেন প্রতিমা বানাই”। (অপরাজিতার ভাঁজে) ৪. কাঁচের টুকরো ভেবে বড় বেশি অবজ্ঞা করেছো।’ (বিস্মরণ) ইত্যাদি। তেষট্টি বছর প্রতীক্ষায় থেকে থেকে প্রেমিকার প্রতি বিক্ষুব্ধ প্রেমিকের অভিসম্পাৎ দেখি ‘অমানুষ’ কবিতায়। ‘বলো তুমি, কখন বিধবা হবে তুমি”! তীব্র প্রেমের এমন ধ্বংসাত্মক উচ্চারণ কিছুটা ব্যতিক্রমী বটে। ‘জারুলতলার কাব্যের’ আরেকটি ব্যতিক্রমী কবিতা ‘সবচেয়ে ভালবাসি যাকে, তার মুখোমুখি হলে।’- শিরোনাম-সর্বস্ব কবিতাটির পুরো পৃষ্ঠাই খালি! পৃষ্ঠার নীচে ডানদিকে কবিতার রচনাকাল লেখা আছে ৩১.০৩.৭৫। গভীরভাবে যে ভাষাকে স্তব্ধ করে দেয়, সবচেয়ে বেশি থাকে ভালোবাসা যায়, তার মুখোমুখি হলে যে আমাদের মুখে কথা জোগায় না-এই হচ্ছে কবিতার বিষয়বস্তু। শুধু শব্দ দিয়েই কবিতা হয় না, নৈশঃশব্দ ও যে কবিতার জন্ম দিতে পারে- এ ধারনা সম্ভবত আমরা এই প্রথম আবিষ্ক্কার করলাম। তারুণ্যের রাজনীতি চিন্তা ও শুদ্ধ রাজনীতির প্রতি কবির পক্ষপাত দেখি ‘মিছিল তুমি বাম দিকে যাও’ কবিতায় : “ডান দিকে নয়, হাতছানিতে মুক্তি ডাকে বাঁয়ে/ মাটির মানুষ পলির মতন নদীর মোহনায়”। প্রেমের কবিতা সংকলনে রাজনীতিকে বিষয়বস্তু করে লেখা কবিতাটি একটি স্বতন্ত্র সংযোজন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার অপ্রাপ্তির বেদনা বা বিচ্ছেদের হাহাকারই বেশি বাঙ্মময় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন কবিতায়। -“তর্জনীর নখ দিয়ে একবার এঁকে দাও নদী/ সেখানে মরণ ডুব দিয়ে ফের উঠে আসি তোমার ডাঙায়।” বৈষ্ণবী)
অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মতো ‘জারুলতলার কাব্য’ গ্রন্থেও কবির ভাষা নির্মাণ ছন্দোবদ্ধ; মুক্ত ছন্দে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। কবিতার মেজাজকে তার বিষয়বস্তুর সঙ্গে দ্রবীভূত করতে বাক্য-নির্মাণের এ কৌশল বেশ লাগসই ভাবেই ব্যবহার করছেন তিনি। তাঁর অলংকার তথা উপমা, বিরোধাভাস, চিত্রকল্প প্রভৃতির ব্যবহারও যথাকাব্যিক। ‘আমাদের সমুদ্র সমায়িকী’ কবিতার কয়েকটি ছত্র লক্ষ করি- “কাচের মতো মসৃণ, অথচ কঠিন/ ধ্রুবতারার মতো স্পষ্ট, অথচ অনেক দূর’।/ অথবা ‘পাশাপাশি বসেছিলাম; কাছাকাছি হতে পারিনি’। কিংবা, “তোমার সিঁড়ি জাপানি গোলাপের ষড়যন্ত্রে আচ্ছন্ন।” ইত্যাদি।
সবশেষে বলা যায়, প্রেম চিরন্তন, শাশ্বত। এর গতি আছে, ক্ষয় নেই। প্রেমের স্থান হলো হৃদয়ে, ‘জারুলতলা’ সেই হৃদয়েরই অন্য নাম। সময়ের বিবর্তনে মানুষের বাহ্যিক বা আকৃতিগত পরিবর্তন হয়; কিন্তু যুগ যুগ ধরে প্রেমিক মন থেকে যায় চিরতরুণ, চিরনতুন! তাই তো ‘জিরো পয়েন্ট টু ইনফিনিটি’ কবিতায় কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয় সময়ের গতিও প্রেমের নিত্যতার সুর:-

ভালোবাসা টিকেট কেটে যাচ্ছে অনেক দূর
যায় রেখে যায় জারুলতলায় চিরন্তনের সুর।
জীবনতরী খাচ্ছে গিলে পাতালপুরীর দৈত্য,
জারুলতলার দ্বৈত ছায়া চিরকালের সত্য।

x