মোহিত কামালের চোরা গলি : সামাজিক সংকটের দৃশ্যমান চেহারার উপন্যাস

আহমেদ মাওলা

শুক্রবার , ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ
25

মোহিত কামাল বর্তমান সময়ের একজন জননন্দিত কথাসাহিত্যিক। লিখছেন প্রায় তিনদশক ধরে। নাগরিক মধ্যবিত্তের ইস্তিকরা পোশাকের নিচে যে দগদগে ঘা,ব্যক্তি-মানুষের ভেতরের ভাঙচুর, টানাপোড়েন,রক্তক্ষরণ ইত্যাদি তার লেখা প্রধান বিষয়। প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের মনোদৈহিক বিষয়গুলোকে তিনি উপন্যাসে খুলে-মেলে ধরেন। সমকালীন জীবন থেকে নেয়া গল্পগুলোকে ছোট ছোট বাক্যে, সহজ-সাবলীল ভাষায় বর্ণনা করেন বলে তিনি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। আনন্দের বিষয় যে,ইতোমধ্যে সারাদেশে মোহিত কামালের একটা নিজস্ব পাঠক শ্রেণি গড়ে উঠেছে। পাঠকের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পাওয়া একজন লেখকের সবচেয়ে বড় অর্জন। পাঠক চাহিদার কারণেই মেলায় তার বই পাঁচ-সাতটা সংস্করণ হয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত তার চোরা গলি(২০১৮) উপন্যাসের প্রধান বিষয় সমকালীন জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সমাজিক সংকট মাদকাসক্তি। পেশাগত অভিজ্ঞতার কারণে বিষয়টিকে তিনি একটি শৈল্পিক শুশ্রূষা দিতে সক্ষম হয়েছেন। শহরের পাড়া-মহল্লার গলিতে ফাঁদ পেতে আছে নানান প্রলোভন। রঙিন প্রলোভনে পা দিয়ে আটকে যাচ্ছে কত তরুণ-তরুণী। নেশার রঙিন ফাঁদে জড়িয়ে বিপন্ন হচ্ছে তারুণ্যের সম্ভাবনাময় জীবন। চোরা গলি উপন্যাসে তেমনি হতভাগ্য ইথা এবং তার প্রেমিক তন্ময়। এদু’জনকে ঘিরে কাহিনি অগ্রসর হলেও পাঠক বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন। দু’জনের মধ্যে গভীর সম্পর্কের একপর্যায়ে ইথা বুঝতে পারে তার প্রিয় মানুষটি মাদকাসক্ত। কাহিনি ভিন্নদিকে মোড় নেয়। তন্ময়কে হাতেনাতে ধরার জন্য ইথা অভিজাত এলাকায় তন্ময়ের আড্ডায় গিয়ে হাজির হয়। ভেতরে ঢুকতেই গার্ড প্রশ্ন করে-‘ডাল না বাবা ? বাবা। তাহলে সোজা দোতলায় চলে যান।’ খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে ইথা দেখে, কার্পেটে একদল ছেলেমেয়ে বসে কয়েনের ওপর থেকে পোড়া ধোঁয়া নাকে টেনে নিচ্ছে। তন্ময়ের কোল ঘেঁষে বসা একটা মেয়ে। মৃদুভাবে আঙুল দিয়ে তন্ময়ের উরুতে তবলা বাজাচ্ছে। ইথাও সে স্বাদ নেয়,একটু টানতেই তার চোখ জ্বালা করতে থাকে,মাথাটায় চক্কর দেয়, বমি বমি ভাব লাগে। ইথাকে এঅবস্থায় দেখে তন্ময় চড়াগলায় বলে-‘ইথা, তুমি এখানে কি করছ ? কেন, তুমি যা করতে এসেছ,আমিও তাই করতে এসেছি।’ এখান থেকে কাহিনিতে নাটকীয় দ্বন্দ্বের শুরু হয়। সবাই ইথাকে টিকটিকি বা র‌্যাবের সোর্স বলে সন্দেহ করে। অন্যরা পালিয়ে গেলেও পুলিশ ইথাকে থানায় ধরে নিয়ে যায়। খবর শুনে মায়ের অধিক মা ফুফু জিনাত আরা ছুটে গিয়ে ইথাকে ছাড়িয়ে আনে। দুই বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় ইথার বাবা মারা যায়,অল্পবয়সী মা আবার বিয়ে করে পরবাসি হয়। জিনাত আরাই ইথাকে মায়ের স্নেহ-মমতা দিয়ে বড় করেছে। চাচা হাসমত উল্লাহ বাবার স্নেহ দিয়ে মানুষ করেছে ইথাকে। ইথার প্রেমিক তন্ময় মাদকসেবি এবং মাদক ব্যবসায়ী চক্রের সদস্য, এসব জানার পর ওই চক্র মারমুখি হয়ে উঠে। তারা ইথার বন্ধু পুনমকে আঘাত করে,হাসপাতালের লবিতে গাড়ি থেকে নামার সময় এক বখাটে ইথাকে লক্ষ করে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারে,ঠেলে ইথাকে বাঁচাতে গিয়ে জিনাত আরার দু’টি চোখ চিরতরে অন্ধ হয়ে যায়। ধরা পড়ে সে বখাটে ও নেপথ্যে থাকা রাকিব। দু’চোখের দৃষ্টি হারিয়ে জিনাত আরা ওসিকে উদ্দেশ্য করে হৃদয়ভাঙা আর্তনাদে বলে-‘আমি চাই চোরা গলির সমস্ত চিহ্ন মুছে যাক। আমাদের সন্তানদের চলার পথের মরণ ফাঁদগুলো উপড়ে ফেলে দিন।..আমি ইথা ও পৃথার চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখবো।’ জিনাত আরা এবং ইথার গগনবিদারী আর্তনাদের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের সমাপ্তি হলেও পাঠককে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। কারণ,মাদক কারবারিদের বিষবৃক্ষ সমাজে থেকেই যায়। এখানেই যত ভয় আর আশঙ্ক্ষা। মোহিত কামাল চোরা গলি উপন্যাসে সমকালীন সমাজের বিশাল এক্ষত চিহ্নকে উন্মোচিত করেছেন। লেখকের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মোহিত কামাল এ উপন্যাস লিখে শুধু সংকটের স্বরূপই তুলে ধরেননি,পাঠকের কাছে একটা সতর্ক বার্তাও পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন। তবে আখ্যান বয়ানের ক্ষেত্রে তার কোনো শিল্পকৌশল চোখে পড়েনা। প্রত্যেকটি লেখকের একটা জীবনদর্শন থাকা জরুরি। লেখক কোন দৃষ্টিতে সমাজকে দেখেন, ট্রিটমেন্ট করেন, শৈল্পিক পরিচর্যা করেন, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাহিনি বর্ণনায় তিনি প্রথাগত। আঙ্গিক, প্রকরণ পরিচর্যা বা জীবনদর্শনের অভাব তার উপন্যাসের শিল্পমানকে অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে আমার মনে হয়।

x