মোরগ ডাকা ভোরেই শুরু হয় ম্রোদের নিত্য দিনের কর্মযজ্ঞ

মো.তানফিজুর রহমান : লামা

সোমবার , ৭ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:২৭ পূর্বাহ্ণ
60

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে ম্রো (মুরুং) উপজাতি অন্যতম। ম্রো বা মুরুং পার্বত্য জনপদের সর্বপ্রাচীন উপজাতি। সহজ-সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত ম্রোদের বৈচিত্রময় কৃষ্টি-সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন জীবন-যাপন অন্য জাতি গোষ্ঠীর তুলনায় বৈচিত্রপূর্ণ।
বান্দরবানের লামা উপজেলা সদর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে মরিঞ্জা “পুইত্যা পাড়া”। চকরিয়া- লামা সড়ক ধরে ৬ কিলোমিটার গেলে মিরিঞ্জা এলাকা। তারপর ২৪৩ টি পাকা সিঁড়ি বেয়ে সোজা পাহাড় চূড়ায়। সেখান থেকে আঁকা-বাঁকা আর উচু-নীচু পাহাড়ি পথ আনুমানিক ৩ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে পৌঁছাতে হয় এ পাড়ায়। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে আনুমানিক ১৩শ’ ফুট উচ্চতায় সবুজ পাহাড়ের বেষ্টনির মাঝে গড়ে উঠা পুইত্যা পাড়ায় প্রায় ৪০ টি ম্রো পরিবারের বসবাস। এখানে শত বছর ধরে বংশ পরম্পরায় বসবাস করছেন অংচা ম্রো (৬০)। ওই পাড়ারই অইবত ম্রোর পুত্র তিনি। অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রথম স্ত্রী কাইচুন ম্রো মারা যাওয়ার পর তিনি নুনপাও ম্রোকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। উভয় সংসারে তার মোট ৬ পুত্র সন্তান। ছোট মাচাং ঘরের আঙিনায় কাঠের পিঁড়িতে বসে তার সাথে কথা হয় ম্রোদের দৈনন্দিন কর্মযজ্ঞ নিয়ে। অংচা ম্রো জানান-
মোরগ ডাকা ভোরেই শুরু হয় ম্রোদের নিত্যদিনের কর্মযজ্ঞ। ঘুম থেকে জেগেই ম্রো নারীরা রান্না-বান্না শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে উঠতে শুরু করে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। রান্না শেষ হতেই ম্রো রমনীরা বুদুং (জুমে উৎপাদিত এক ধরনের লাউয়ের খোসা) নিয়ে বেরিয়ে পড়েন পানি সংগ্রহে। প্রকৃতিতে তখনো ভোরের আলো-আঁধারির খেলা। পাহাড়ের গা বেয়ে ম্রো রমনীরা ২/৩ শ’ ফুট নীচে পাহাড়ি ঝিরি থেকে পানি সংগ্রহ করে ফিরে আসেন সবুজ পাহাড় চূড়ার ছোট্ট মাচাং ঘরে। যাকে তাদের ভাষায় ”কিম” বলে। ততক্ষনে খাবারের জন্য প্রস্তুত পরিবারের সকল সদস্য। ভোরের সূর্য উকি দেয়া আগেই খেয়ে-দেয়ে দুপুরের খাবার কলা পাতা দিয়ে মোচা বেঁধে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন দুর পাহাড়ে জুম চাষের উদ্দেশ্যে। পরিবারের একেবারে বৃদ্ধ ও শিশু সদস্য ব্যতিত সকলেই দল বেধে রওয়ানা হয় ৫/৬ কিলোমিটার কিংবা তারও বেশি দূরে কোন এক পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। যে পাহাড়টিকে পূর্ব থেকে জুম চাষের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিলো। ম্রোরা সাধারনত- ধান, ভূট্টা, কাউন, তিল, শসা, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, আদা, মরিচ, হলুদ, কলা, মারফা (শসা জাতীয়) এবং তুলার বীজ বপন করে থাকে।
বাঁ হাতে দা এর মাথা দিয়ে মাটি ফাঁক করে তাতে একসাথে মিশানো বীজ পরিমান মত দেয়া হয়। তারপর দা তুলে নিলে মাটিতে আপনা আপনিই বীজগুলো ঢেকে যায়। এ আদিম পদ্ধতিতে বীজ বুনতে বুনতে বৃদ্ধি পেতে থাকে রোদের প্রখরতা। একসময় সূর্য মাথার উপর চলে আসে। কিছুটা পরিশ্রান্ত আর ক্ষুধার্ত ম্রো পরিবারের সদস্যরা। কর্ম বিরতি দিয়ে জুম ঘরে কিংবা পাহাড়ি ঝিরির ঢালুতে লতা-গুল্মের ছায়ায় বসে কলা পাতার মোচায় বেধে নিয়ে আসা খাবার খেয়ে নেয়। বিশ্রাম শেষে আবারো শুরু হয় পাহাড়ের রুক্ষ মাটিতে হরেক রকম ফসল ফলানোর সংগ্রাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই পরিবারের কোন এক নারী সদস্য পাহাড়ের ঝিরি কিংবা ঝর্ণায় গোসল শেষে ফিরে আসেন নিজ মাচাং ঘরে। তারপর শুরু হয় রাতের রান্না। ততক্ষনে পরিবারের অপর সদস্যরা পাহাড়ি ঝিরিতে গোসল সেরে ক্লান্ত শরীরে ফিরেন আপন নীড়ে। সূর্য ডোবার সাথে সাথেই শেষ হয় রাতের খাবার।

অংচা ম্রো জানান, কৃষিই তাদের একমাত্র পেশা। ইতিপূর্বে এক হারি (১০ কেজি) ধান বপন করলে কমপক্ষে ৫০ হারি ধান পাওয়া যেত। তখন কোন সার প্রয়োগ করতে হতনা। বর্তমানে পাহাড়ের উর্বরতা আগের মত নেই। প্রচুর আগাছা জন্মায়। দিতে হয় সার। তারপরও আগের তুলনায় অর্ধেক ধান পাওয়া যায়। ঘরের গৃহপালিত মোরগ, শুকুর আর জুমে উৎপাদিত বিভিন্ন ফসল বিক্রি করেই চলে তাদের জীবন-জিবিকা। অংচা ম্রো আরো বলেন – ম্রো পল্লীতেও এখন সভ্যতার ছোয়া লাগতে শুরু করেছে। ছেলে-মেয়েরা পাহাড় ডিঙিয়ে কয়েক মাইল দূরের স্কুলে যাচ্ছে। রাতের ম্রো পল্লী সোলারের আলোয় আলোকিত হচ্ছে। ইতিপূর্বে ম্রো রমনীরা “ওয়াংক্লাই” আর পুরুষরা ডং কিংবা লেংটি নামের এক ধরনের ছোট কাপড় পরলেও এখন অনেকে এ ধরনের কাপড় পরা ছেড়ে দিয়েছে। তিনি জানান, পূর্ব পুরুষদের তুলনায় এখনকার ম্রোরা অনেক বেশি সচেতন। ক্রামা ধর্মাবলম্বী অংচা ম্রো সপ্তাহের বৃহস্পতিবার কোন পশু পাখি কিংবা মাছ শিকার করেন না। রবিবারে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী উপাসনা করেন।
দিনব্যাপী অনেকটা জনশূণ্য ম্রো পাড়ায় সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে ফিরে আসে প্রাণ চাঞ্চল্য। রাতের খাবার শেষে কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ বিভিন্ন বয়সী ম্রো পুরুষ মহিলারা দল বেধে টং ঘরে ( বাঁশ ও বাঁশ পাতা দিয়ে তৈরি) মেতে উঠেন আড্ডা আর গল্প গুজবে। এক ধরনের তামাক পাতা দিয়ে বানানো বিড়ি আর রং চা পানের মধ্য দিয়ে জমে উঠে রাতের এ আড্ডার আসর। চলে গভীর রাত পর্যন্ত। এক সময় যে যার মত ফিরে যায় নিজ মাচাং ঘরে। পরের দিন আবারো মোরগ ডাকা ভোরে জেগে উঠার প্রত্যাশায়। তারপর আঁধারের কালো চাদর পরিহিত পাহাড়ের মৌন নিস্তব্দতায় ঘুমিয়ে পড়ে প্রকৃতির নিবিড় সানিধ্যে।

x