মোটরযানের তৃতীয় পক্ষ বীমা শুধু কোম্পানির লাভ, আইডিআরএ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করুক

রবিবার , ২ জুন, ২০১৯ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
91

মোটরযান বীমার জন্য দুই ধরনের পলিসি রেখেছে বীমা কোম্পানিগুলো। একটি হচ্ছে প্রথম পক্ষ পলিসি, অন্যটি তৃতীয় পক্ষ। প্রিমিয়াম কম হওয়ায় এক্ষেত্রে অধিকাংশ মোটরযান মালিকই তৃতীয় পক্ষ পলিসি করে বীমার বাধ্যবাধকতা সারেন। যদিও এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় বীমা কোম্পানিগুলো। প্রথম পক্ষ পলিসির আওতায় মোটরযান দুর্ঘটনায় পড়লে চুরি কিংবা ছিনতাই হলে ভেঙে গেলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে রাস্তায় চলতে গিয়ে কোনো মোটরযান যদি অন্য মোটরযানের ক্ষতিসাধন করে, সেক্ষেত্রে তৃতীয়পক্ষ পলিসির আওতায় কেবল ক্ষতিগ্রস্ত মোটরযানের মালিককে ক্ষতিপূরণ দেবে বীমা কোম্পানি। বীমা কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের জন্য তৃতীয় পক্ষ বীমা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সেটি চান না। যদিও ক্ষতিপূরণ চাইলে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানি সেটি দিতে বাধ্য। অন্যদিকে পরিবহন মালিকরা বলছেন ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়ার ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের নানাভাবে হয়রানি করে। কখনোই তারা দাবিকৃত টাকার পুরোটা পরিশোধ করে না। এ কারণে পরিবহন মালিকরা প্রথম পক্ষ বীমা পলিসিতে যেতে চান না। এরা দায়সারাভাবে তৃতীয় পক্ষ বীমা করেই কাজ চালিয়ে যান। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এখবর প্রকাশিত হয়েছে। যে কোনো যান্ত্রিক যানবাহন রাস্তায় নামাতে হলে ট্রাফিক আইন অনুযায়ী ইন্স্যুরেন্স করতে হয়। তা না হলে ট্রাফিক পুলিশ সংশ্লিষ্ট যানের বিরুদ্ধে নির্বিচারে জরিমানা ও মামলা করে। যে কোনো দেশেই এই আইন রয়েছে। ইন্স্যুরেন্স না করে রাস্তায় যানবাহন নামালে প্রতিবারই প্রায় বীমার চেয়ে বেশি টাকা জরিমানা হিসেবে দিতে হয়। অথচ এ বীমার বিপরীতে দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিকে (তৃতীয় পক্ষ) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোন নজির নেই আমাদের দেশে। যদিও তৃতীয় পক্ষ বীমাকৃত গাড়িতে সংঘটিত দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত ব্যক্তিকে নির্ধারিত অংকের নিয়ম রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কার স্বার্থে এ ধরনের বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অধিকাংশ বীমা কোম্পানি কোনো কারণ ছাড়াই প্রথম পক্ষ বীমা করতে চায় না। করপোরেট কিছু প্রতিষ্ঠানকে প্রথম পক্ষ বীমাসেবা দিলেও ব্যক্তিগত কোনো মোটরযান, বিশেষ করে মোটর সাইকেলের প্রথম পক্ষ বীমা করতে চায় না। এতে বীমা কোম্পানিগুলো ট্রাফিক আইনের সুবিধা নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। বীমা কোম্পানির কোনো দায়িত্বই পালন করছে না।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রকৃত পক্ষে তৃতীয় পক্ষ ইন্স্যুরেন্সের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। শুধু বীমা কোম্পানিগুলোকে আর্থিকভাবে লাভবান করতে এটি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এর কোনো অর্থ হতে পারে না। জনগণকে হয়রানি করলেও এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইডিআরএ নিশ্চুপ রয়েছে বছরের পর বছর। তৃতীয় পক্ষ ইন্স্যুরেন্স করা গাড়ির সঙ্গে সংঘটিত দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত ব্যক্তির জন্য যে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে তা এতই সামান্য যে অতি গম্ভীর ব্যক্তিত্ব না হেসে পারবেন না। তৃতীয় পক্ষ বীমায় সংশ্লিষ্ট গাড়ির ফিটনেস আছে কিনা, তাও বীমা কোম্পানিগুলো কোনোভাবে বিবেচনায় নেয় না। না নেয়ার কারণ, এ ধরনের বীমায় ক্ষতিপূরণের কোন দায় নেই, নজিরও নেই। ক্ষতিপূরণ দাবির হারও নেই বললেই চলে। তৃতীয় পক্ষ ইন্স্যুরেন্স হলো রাস্তায় গাড়ি নামানোর জন্য একটি আইনি স্বীকৃতি। শুধু বীমা কোম্পানির লাভ হয় এতে। এখানে কোন দাবি পূরণ হয় না। ফলে এ ধরনের বীমার কোন ভিত্তি নেই। বিশ্বে বীমা খাতের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে বীমা খাতের প্রতি মানুষের এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এর বড় কারণ বীমা কোম্পানিগুলো শুধু প্রিমিয়াম নিতে অভ্যস্ত। কিন্তু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি ও অজুহাতের শেষ নেই। এ সংকট কাটানোর দায়িত্ব এখাতের উদ্যোক্তাদের। এ জন্য একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থাও রয়েছে কোন অনিয়ম হলে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে যথোচিত ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের বীমা নেই। কারণ যারা সচেতন, তারাই এটা উঠিয়ে নিচ্ছেন। ভারতে যানবাহনের তৃতীয় পক্ষ ইন্স্যুরেন্স চালু থাকলেও এ পলিসি করার সময় সংশ্লিষ্ট যানবাহনের ফিটনেস থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে যান্ত্রিক ত্রুটিসহ মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কর ঝক্কর যানবাহন তৃতীয় পক্ষ ইন্স্যুরেন্স করতে পারছে না। ফলে সেখানকার সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া ভারতের বীমাকোম্পানিগুলো সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করছে বলে জানা গেছে। এদিকে আইনি দুর্বলতার সুযোগে প্রতিবছর বীমা কোম্পানিগুলো তৃতীয় পক্ষ ইন্স্যুরেন্স বাবদ কী পরিমাণ অর্থ আয় করছে এবং দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের তারা ক্ষতিপূরণের কত টাকা থেকে বঞ্চিত করছে, তার কোন হিসাব নেই। এক্ষেত্রে বীমাকোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং তদারকি আরও জোরদার করার বিকল্প নেই। আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইডিআরএ ত্বরিত কার্যকর ব্যবস্থা নিক।

x