মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষয়রোগ

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ১ জুন, ২০১৯ at ১১:০১ পূর্বাহ্ণ
277

হাড়ের ক্ষয় রোগ বা অস্টিওপোরোসিস হলো ক্যালসিয়াম এর অভাবজনিত একটা রোগ। যা হাড়ের ক্ষয়জনিত দুর্বলতা ও ভঙ্গুরতাই হচ্ছে হাড়ের ক্ষয়রোগ বা অস্টিওপোরোসিস। ইহা এমন একটি রোগ যেখানে হাড় দুর্বল হয়ে যায় এবং হাড় ভাঙ্গার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যে হাড় সাধারণত বেশি ভাঙে, তা হলো মেরুদন্ডের মধ্যে কশেরুকার হাড়, হাতের হাড় এবং কোমড়ের হাড়। হাড় না ভাঙা পর্যন্ত সাধারণত কোন উপসর্গ দেখা দেয় না। হাড় এতোটাই দুর্বল হয়ে যেতে পারে যে সামান্য জোর দিলে বা এমনিই ভেঙ্গে যায়। হাড় ভাঙলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে পারে ও স্বাভাবিক কাজকর্ম করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এক কথায় বলতে গেলে হাড়ের ক্ষয়রোগ বা অস্টিওপোরোসিস আসলে ‘সিস্টেমেটিক স্কেলেটাল ডিজঅর্ডার’। যেখানে শরীরের হাড়ের ডেনসিটি কমে যায় ও বোন টিস্যু ক্রমশ দুর্বল হতে শুরু করে। ফলে হাড় অশক্ত হয়ে যায় এবং ভেঙে যায়। জীবন যাত্রায় স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ে। হাড়ের ক্ষয়রোগে শতকরা ১২ জন পুরুষকে এবং শতকরা ৩০ জন মহিলাকে আক্রান্ত করে। ৩০ বছর বয়সের পর থেকেই মহিলাদের হাড়ের ডেনসিটি দ্রুতগতিতে কমতে থাকে। মহিলাদের যাদের মেনোপজ হয়ে গেছে তাদের হাড় ক্ষয়ের সমস্যা দেখা দেয়। তাই অস্থির বৃদ্ধির জন্য চাই ভিটামিন ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার।

হাড়ের ক্ষয়রোগ বা অস্টিওপোরোসিসের কারণ
দেহের খনিজ লবণ বিশেষ করে ক্যালসিয়োমের ঘাটতির কারণে এই রোগ হয়। মহিলাদের মেনোপজ হওয়ার পর হাড়ের ঘনত্ব ও পুরুত্ব কমতে থাকে। এই সময় হাড়ের ক্ষয় দ্রুততমভাবে বৃদ্ধি পায়। শরীরের হাড়ের ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ২০-৪০ বছর পর্যন্ত বাড়তে থাকে। কিন্তু এর পরে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমতে থাকে। মহিলাদের ক্ষেত্রে মাসিক বন্ধ বা মেনোপজ হওয়ার পর ইস্ট্রোজেন নামক হরমোনের অভাব হয়। যার ফলে হাড়ে ক্যালসিয়াম ক্ষয় বেশি হয়। কারও ক্ষেত্রে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমে যাওয়ার জন্য কিছু জিন দায়ী থাকে। হাড়ের বৃদ্ধির সময় নিয়মিত ব্যায়াম ও প্রচুর ক্যালসিয়াম জাতীয় খাবার খেলে শরীরের হাড় শক্ত থাকে। ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান হাড়ের ক্যালসিয়াম ক্ষয়ের অন্যতম কারণ। বয়স্ক পুরুষের ক্ষেত্রে কটিসোল এ্যালোপ্যাথিক ওষুধ খেলে ও টেস্টোস্টেরণ নামক হরমোন শরীরে তৈরি কম হলে হাড় ক্ষয় বৃদ্ধি পায়। নানা রকম অসুখ ও চিকিৎসা যথা- মাদকাসক্ত, ক্ষুধাহীনতা, থাইরয়েড গ্রন্থির অতি সক্রিয়তা, কিডনি রোগ এবং অস্ত্রোপচার করে ডিম্বাশয় অপসারণের কারণে হাড়ের ক্ষয় হতে পারে। কিছু কিছু ওষুধ যেমন কিছু খিঁচুনি নিবারক ওষুধ, ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু মিশ্র রাসায়নিক ওষুধ, পাকস্থলীর অম্ল নিবারক ওষুধ, অতিরিক্ত বিষণ্নতা কাটানোর ও ঘুমের এ্যালোপ্যাথিক ওষুধ সেবুনে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমে যায় এবং অস্থিক্ষয়ের হার বৃদ্ধি করে। কাশিংস সিন্ড্রম (এক ধরনের হারমোনাল ডিজঅর্ডার) থাকলেও হাড়ের ক্ষয়রোগ হতে পারে। যাদের হাড়ভঙ্গ বা অস্টিওপোরোসিসের পারিবারিক ইতিহাস আছে তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।
হাড়ের ক্ষয়রোগ বা অস্টিওপোরোসিসের লক্ষণ বা উপসর্গ
১. অস্থিভঙ্গুর হয়ে যায়, পুরুত্ব কমতে থাকে।
২. পেশির শক্তি কমতে থাকে।
৩. অস্থিতে ব্যথা অনুভব হয়।
৪. পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা হতে শুরু করে।
৫. পিঠ থেকে শরীরের দু’পাশে ব্যথা ছড়িতে যেতে পারে।
৬. মেরুদন্ড বেঁকে যেতে পারে।
৭. হাঁটুতে চলতে খুব কষ্ট হয়।
৮. কোমড়ে ব্যথা অনুভূত হয়।
৯. পা মর্ট হয়ে যায়।
১০. মেরুদণ্ড ভেঙে গেলে রোগীর পা প্যারালাইসিস, পায়খানা, প্রস্রাব আটকে যাওয়া, সেক্স পাওয়ার কমে যাওয়া সহ নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
ডায়াগনোসিস : অস্টিওপোরোসিস নির্ণয় করার জন্যে রোগীর মেডিক্যাল হিস্ট্রি ও শারীরিক পরীক্ষা দুই’ই জরুরি। এক্সেরে করলে বোঝা যায় যে হাড় সরু হয়ে গেছে কি না।
জীবন যাত্রায় পরিবর্তন : ওষুধ তো আছেই, তবে সবচেয়ে আগে দরকার নিজের জীবন যাত্রায় পরিবর্তন আনা। যেমন-
* সিগারেট, কফি, অ্যালকোহল খাওয়া কমিয়ে দিন।
* ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া।
* ভিটামিন ডি যাতে ভালভাবে শরীরে প্রবেশ করে, তার জন্যে সান এক্সপোজার খুবই জরুরি। সকালের সূর্যের কিরণে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ ভিটামিন ডি থাকে।
* ক্যালশিয়ামযুক্ত খাবার যেমন-দুধ, দই, ছোট মাছ, পালংশাক, বিন, ব্রকলি, ফলের রস নিজের ডায়েটে রাখুন।
যাঁদের বয়স ৬৫ বছরের নীচে এবং মেনোপজ হয়ে গেছে, তাঁদের নিয়মিত ক্যালসিয়াম খাওয়া জরুরি।
* অস্টিওপোরোসিস রুখতে এঙারসাইজ করা জরুরি। প্রতিদিন সকালে-বিকেলে হাঁটার অভ্যেস করুন।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান
হাড়ের ক্ষয়রোগ বা অস্টিওপোরোসিস প্রতিকারে হোমিওপ্যাথিতে অত্যন্ত ফলদায়ক ওষুধ আছে। নির্দিষ্ট মাত্রায় লক্ষণ সাদৃশ্যে এই রোগে নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহৃত হয়। যথা- ১. এসিড ফ্লোর, ২. এসিড নাইট্রিক, ৩. ক্যালকেরিয়া ফস, ৪. ক্যালকেরিয়া ফ্লোর, ৫. ক্যালিবাইক্রম, ৬. ক্যালি আয়োড, ৭. ইউফারবিয়াম, ৮. সিমফাইটম, ৯. থেরিডিয়াম, ১০. মেজোরিয়াম, ১১. ফসফরাস, ১২. স্ট্যাফিসেগ্রিয়া, ১৩. মার্কুরিয়াস, ১৪. টিউবারকুলিনাম, ১৫. সিফিলিনাম, ১৬. থুজা, ১৭. রুটা, ১৮. এমনিয়াম মিউর ১৯. সাইলেশিয়া উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x