মেনি বিড়ালের ছা

দীনা মরিয়ম

বুধবার , ১৭ এপ্রিল, ২০১৯ at ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
11

আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকায় বাস করে এক বিড়াল পরিবার। বাবা বিড়াল হুলো একটা মাল্টি ন্যাশনাল বিড়াল কোম্পানীর সিইও এবং মা বিড়াল মেনি বিড়ালছানাদের একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষিকা। এই বিড়াল দম্পতির দু’পাল ছানা। প্রথম পালের মধ্যে একটি ছেলে একটি মেয়ে, দ্বিতীয় পালের মধ্যে দু’টোই ছেলে- বিড়াল সম্প্রদায়ে যাকে বলে সুখি পরিবার। ঘরের কাজ-কর্মের জন্য গৃহকর্মী আছে পুশি আর বাচ্চাদের আদব কায়দা শেখানোর জন্য একজন পার্ট টাইম গভর্ণেস আছে তার নাম কিটি। কিটি বেশ গুণী মেয়ে বিড়াল – বাচ্চা লালন পালনের উপর তার বিদেশী ট্রেনিং আছে। তাছাড়া ও একটা নামী বিউটি পার্লারে কাজও শিখেছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হোম সার্ভিস দিয়ে থাকে। এতে একটা সুবিধা হয়েছে মেনিকে কষ্ট করে আর বিউটি পার্লারে যেতে হয় না-কিটিই ওকে হোম সার্ভিস দেয়। আসলে মর্নিং শিফট স্কুলে বিড়াল ছানাদের পড়িয়ে বাসায় ফেরার পর ভীষণ টায়ার্ড হয়ে পড়ে মেনি। কিছু খেয়ে খানিকটা ঘুমিয়ে নেয়। বাচ্চারা ততক্ষণে স্কুল থেকে ফিরে খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ওদের এই ব্যাপারগুলোও কিটির দায়িত্বে পড়ে। ওদের ঘুম পাড়িয়ে কিটি অবসর হয়। তখন মেনি ঘুম থেকে উঠে কিটির কাছে একটা বডি ম্যাসাজ নেয়। বডি ম্যাসাজের সাথে একটা ফেসপ্যাক আর অয়েল ট্রিটমেন্ট ফ্রি দেয় কিটি। এরপর একটা শাওয়ার নিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে টেলিভিশনে স্টার জলসা দেখে। কোন কোন দিন সিরিয়াল দেখতে দেখতে সেখানেই আরেকবার ঘুমিয়ে পড়ে মেনি। এরমধ্যে বাচ্চাদের প্রাইভেট টিউটর মুছো সাহেব চলে আসেন। বাচ্চাদের তিনি ড্রয়িংরুমে বসেই পড়ান তাই বাধ্য হয়ে টিভি বন্ধ করে উঠে যেতে হয়। বাচ্চাদের পড়ার ফাঁকে পাশের ফ্ল্যাটের ভাবির সাথে টেলিফোনে খানিকটা আড্ডা দিয়ে নেয় মেনি। মাঝে মাঝে পাশের শপিং মলে এক চক্কর লাগিয়ে আসে। বাচ্চাদের পড়ার টিচার যেতে যেতে গানের টিচার আসে। ঘড়ি ধরে একঘন্টা গলা সাধে বাচ্চারা। গানের টিচার যাবার পর বাচ্চাদের গরম গরম স্যূপ খেতে দেয় মেনি। এই সময়টা সে বাচ্চাদের সাথে কাটায়। স্যূপটাও সে নিজেই তৈরি করে কারণ এটা বানানো খুব সহজ । আজকাল ইন্সট্যান্ট স্যূপের প্যাকেট পাওয়া যায়, গরম পানিতে স্যূপ পাউডার ঢেলে দিয়ে একটু ফুটিয়ে একটা ডিম মিক্স করে নিলেও হলো। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে গেলেই ইন্সট্যান্ট নুডুলস, স্যূপ আর কফির প্যাকেট বেশি করে কিনে আনে মেনি,খুব কাজের জিনিস। হুলো হঠাৎ যেদিন সন্ধ্যায় এসে পড়ে চট করে গরম পানিতে এক প্যাকেট নুডুলস আর একটা ডিম ছেড়ে দিয়ে চটপট নাস্তা তৈরি করে দেয়। ওর নুডুলস খাওয়া হতে হতে একমগ গরম পানিতে ইন্সট্যান্ট কফি ঢেলে দিয়ে দেয়। হুলোর কথা মনে হলেই খারাপ লাগে মেনির। বেচারা সেই যে সকালে অফিসে যায় ফিরতে ফিরতে রাত। প্রায়ই রাতের খাবার বাইরে খেয়েই ফেরে। বাসায় ফিরে টিভি চালিয়ে কিছুক্ষণ রিমোট টিপে এ চ্যানেল সে চ্যানেল ঘুরে বেড়ায়। তারপর মোবাইলে ফেসবুক চালায়। সারাদিন কাজের পর বাচ্চাদের মিয়াও মিয়াও নাকি তার ভালো লাগে না। কাজেই পুশিকে পাঠিয়ে ওদের ঘুম পাড়িয়ে দেয় নয়তো কাম্পিউটারে গেম বা ল্যাপটপে কার্টুন চালিয়ে বসিয়ে রাখে। মেনি নিজেও ইউটিউবে কোন কিছু দেখে সময় কাটায়। ইদানিং ইউটিউবে মেনির একটা চ্যানেল আছে মিউটিউব-সময়টা ভালোই কেটে যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে হুলোর উপর খুব অভিমান হয়। তখন নিজেকে বোঝায় হুলো যা করছে তা তো তাদের সবার ভালো থাকার জন্যই করছে। দিনরাত পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করছে বলেই তো ওরা এতো ‘লাক্সারিয়াস’ একটা ‘লাইফ’ পেয়েছে। টাকা ছাড়া আজকাল কেউ কাউকে ‘সোসাইটিতে এ্যালাও’ করে না।তবুও মেনি মাঝে মাঝে ভাবে জীবনটা খুব যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। এই ভাবনা অবশ্য তার নিজের মাথা থেকে আসেনি। গত সপ্তাহে মেনির শ্বশুর এসেছিলেন। দু’দিন থেকেই বিরক্ত হয়ে চলে গেছেন। যাবার আগে বিশাল এক ভাষণ দিয়েছিলেন। ভাষণের কথাগুলো পুরোপুরি মনেও নেই মেনির । কথাগুলো কিছুটা এরকম:- ‘… তোমাগো সংসার মা আমি কিছু বুজি না। এইডারে তোমরা সংসার কও? বাপের সাথে বাচ্চাগো দেখা নাই, স্বামীর সাথে স্ত্রীর সাক্ষাত নাই- কেউ ব্যস্ত টাকা-পয়সা রোজগার লইয়া আবার কেউ ব্যস্ত শিক্ষা-দীক্ষা লইয়া! কারো কথা কওনের লোক নাই ,তো কারো কথা শোনোনের সময় নাই। তোমরা এক বাড়িতে থাকো ক্যান? যে যার মতো স্কুল না হয় অফিসে থাইক্যা গেলেই পারো। এক বাড়িতে থাইক্যা যদি একসাথে খাওনের সময় না থাকে তাইলে আর পরিবার কিসের! আমাগো সংসারে কত আন্তরিকতা আছিলো আর অহন..!

x