মেনিনজাইটিস নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ২ মার্চ, ২০১৯ at ৬:২৮ পূর্বাহ্ণ
181

মস্তিস্ক ও কশেরুকা-মজ্জা তিনটি পৃথক পৃথক পর্দা দ্বারা আবৃত। এই তিনটি পর্দার সমষ্টিকে মেনিনজেস বলা হয়। এই পর্দায় ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ হলে তাকে বলা হয় মেনিনজাইটিস। মানবদেহের মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের মধ্যে এক ধরনের তরল থাকে। যা স্পাইনাল কর্ড ও মস্তিষ্ক আঘাত থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও আরো কিছু কার্যক্রমের সাথে জড়িত এটি। এ তরলে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে মেনিনজাইটিস হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ঘটে। এ রোগ মস্তিষ্কের ক্ষতি ছাড়াও শ্রবণ ক্ষমতা এবং দেখার ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে পারে। তাই দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা প্রয়োজন।
এই রোগের লক্ষণ : * জ্বর, * তীব্র ও একটানা মাথা ব্যথা, * বমি ও বমিভাব, * রোগীর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, * অস্বাভাবিক আচরণ করা, * খিঁচুনি হওয়া, * ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, * গায়ে র‌্যাশ দেখা দেওয়া, * কথা বলতে অসুবিধা বোধ, * আলোর দিকে তাকাতে না পারা ইত্যাদি।
সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ নাও থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে লক্ষণ ঠিকমতো থাকেও না। যেমন- খুব কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বর থাকে, সঙ্গে শিশু অস্থিরতা বোধ করে, খেতে চায় না, অনবরত কাঁদতে থাকে। * স্কুলগামী শিশুরা শ্বাসকষ্ঠে ভোগে, কাশি হয়, গায়ে জ্বর জ্বর বোধ হয়।
এই রোগের কারণ : প্রথমত : যে জীবাণুগুলো দিয়ে মেনিনজাইটিস হয়। তার প্রায় সবগুলোই সাধারণত মানুষের শরীরে বসবাস করে। এগুলো পরিপাকতন্ত্র, নাক-কান-গলার মধ্যে কোনো ধরনের অসুখ সৃষ্টি না করেই থাকতে পারে। কিন্তু এরাই যদি সেনিনজেসকে আক্রান্ত করে, তখন তা রোগ হিসেবে দেখা দেয়।
দ্বিতীয়ত : ভাইরাস দিয়ে সবচেয়ে বেশি মেনিনজাইটিস হয়। সাধারণত নবজাতক ও শিশুরা এতে আক্রান্ত হয়। ভাইরাসজনিত মেনিনজাইটিস অন্য জীবাণুঘটিত মেনিনজাইটিসের চেয়ে কম ভয়ংকর। ভাইরাসের মধ্যে আছে এন্টারোভাইরাস, আরবোভাইরাস, হারপিস সিমপ্লেঙ ভাইরাস, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস। এর মধ্যে হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা দিয়ে প্রাপ্ত বয়স্করাও আক্রান্ত হতে পারেন। এক্ষেত্রে রোগটি সাধারণত সাইনোসাইটিস বা আপার রেসপিরেটরি অসুখে আক্রান্ত হওয়ার পর দেখা দেয়।
তৃতীয়ত : ব্যাকটেরিয়াঘটিত মেনিনজাইটিস মারাত্মক হতে পারে। যে ধরনের ব্যাকটেরিয়া দায়ী তার মধ্যে আছে নাইসেরিয়া মেনিনজাইটিস, মেনিনজোকক্কাস, স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনি, মাইকোব্যাকটেরিয়াম, টিউবারকুলোসিস ইত্যাদি।
চতুর্থ : ফাঙ্গাস বা ছত্রাক দিয়েও মেনিসজাইটিস হতে পারে। এ ধরনের ছত্রাকের মধ্যে আছে ক্রিপ্টোকক্কাস, হিস্টোপ্লাজমা। সাধারণ বাতাসের মাধ্যমে স্পোর হিসেবে এগুলো ফুসফুসে প্রবেশ করে। যারা আগে থেকেই রোগে আক্রান্ত, বিশেষ করে ডায়াবেটিস-ক্যান্সারে, তারা সহজেই ফাঙ্গাস দিয়ে আক্রান্ত হতে পারেন।
পঞ্চমত : কিছু পরজীবীও মেনিনজাইটিস করতে পারে। এর মধ্যে আছে অ্যানজিওস্ট্রনজাইলাস ক্যানটোনেসিস। এটি সাধারণত খাদ্য, পানি ও মাটির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে।
ষষ্ঠত : মেনিনজাইটিস যে কারো হতে পারে, তবে যাদের কান পাকারোগ, গলা বা নাকে অথবা সাইনাসে ইনফেকশন থাকে তাদের বেশি হয়। এর কারণ এ ধরনের ইনফেকশন সাধারণত যে ধরনের জীবাণু দিয়ে হয়। সেগুলো আবার মেনিনজাইটিস ও করতে পারে।
রোগ নির্ণয় : রোগীর মেরুদণ্ডের ভেতর থাকা কশেরুকা থেকে সিএসএফ (এক ধরনের তরল পদার্থ, যা মস্তিষ্ক ও কশেরুকার ভেতর থাকে) বের করে তা পরীক্ষা করা হয়। সি এস এফে সেল কাউন্ট, প্রোটিন, গ্লুকোজ দেখে এবং সিএসএফের গ্রাম স্টেইন, কালচার পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা হয়। সঙ্গে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রক্তের কালচার এবং সিবিসি ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়।
সেনিনজাইটিস কি ছড়ায় : সাধারণত যে ধরনের জীবাণু দিয়ে মেনিনজাইটিস হয়, তা একজনের দেহ থেকে অন্যজনের দেহে ছড়াতে পারে।
* ব্যাকটেরিয়া ঘটিত মেনিনজাইটিস, যেমন মেনিনজোকক্কাল মেনিনজাইটিস ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি লালার মাধ্যমে অন্যজন আক্রান্ত হতে পারে। * ভাইরাসঘটিত সেনিনজাইটিসও রোগীর সংস্পর্শে ছড়াতে পারে। এক্ষেত্রে সংক্রমিত নতুন ব্যক্তির মেনিনজাইটিস না হয়ে সাধারণত জ্বর-সর্দি-কাশি-এ ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়। ভাইরাস সাধারণত শরীরে প্রবেশ করে খাবার, পানি ও ব্যবহার্য সামগ্রী থেকে।
পরিণতি : সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া গেলে অনেক ক্ষেত্রেই পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়।
* ভাইরাসঘটিত মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণেও ভালো হতে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্বাস, যথেষ্ট পানি ও তরল পান, জ্বর ও মাথা ব্যথার জন্য ওষুধ সেবন করলেই চলে।
* ব্যাকটেরিয়াজনিত মেনিনজাইটিসে বহু ক্ষেত্রে মৃত্যু হতে পারে। তবে রোগাক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ চিকিৎসা করা প্রয়োজন।
* মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুঝুঁকি বেশি নবজাতক ও শিশুর, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন ব্যক্তির, বেশি বয়স্ক ব্যক্তি, যাদের আগে থেকেই অসুখ বিসুখ আছে, মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার ২৪ ঘন্টার মধ্যে যাদের খিঁচুনি হয়, হাসপাতালে আনার আগেই শক বা কোমায় চলে গেছে এমন ব্যক্তির।
* মেনিনজাইটিস সেরে গেলেও কিছু ক্ষেত্রে কানে শুনতে না পাওয়া, চোখে দেখতে না পাওয়া, হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, স্থায়ীভাবে মানসিক বৈকল্য দেখা যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা স্থায়ীভাবে দেখা দিতে পারে।
পথ্য : দুধ, সাগু, বার্লী, আনার, কমলালেবুর রস, তরল পুষ্টিকর খাদ্য ও গ্লুকোজ যথেষ্ট পরিমানে দেওয়া উচিত। ডিম, ছোট, মুরগী ও কবুতরের সুরুয়া প্রভৃতি রোগীকে খাওয়াতে হবে।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : মেনিনজাইটিস নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে অনেক ফলদায়ক ওষুধ আছে। নির্দিষ্ট মাত্রায় লক্ষণ সাদৃশ্যে নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহৃত হয়। যথা- (১) অ্যাকোনাইট ন্যাপ, (২) এপিস মেল, (৩) আর্নিকা, (৪) অ্যাপোসাইনাম, (৫) বেলেডোনা, (৬) ব্রায়োনিয়া, (৭) এপিস, (৮) এন্টিমটার্ট, (৯) ক্যালকেবিয়া আয়োড, (১০) ক্যালকেরিয়া কার্ব, (১১) সাইকিউটা, (১২) জিংকাম মেট, (১৩) আয়োডিন, (১৪) লাইকোপোডিয়াম, (১৫) কুপ্রাম, (১৬) ওপিয়াম, (১৭) নেট্রাম সালফ, (১৭) জেলসিমিয়াম, (১৮) ইগ্নেসিয়া, (১৯) গ্লোনয়েন, (২০) হেলিবোরাস, (২১) হায়োসায়েমাস, (২২) ষ্ট্রামোনিয়াম, (২৩) ফসফরাস, (২৪) ভিরেট্রাম ভিরিডি, (২৫) ল্যাকেসিস, (২৬) সালফার উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x