মেজর জেনারেল পদে আপনাকে অভিনন্দন ডা. গীতি

মাধব দীপ

শনিবার , ৬ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
62

খবরটিই অন্যরকম। ভালো লাগার। মনে ধরার। সোশ্যাল মিডিয়ায় বলতে গেলে ভাইরাল হয়ে গেলো- ‘স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর সেনাবাহিনীতে প্রথম নারী মেজর জেনারেল পেল বাংলাদেশ।’ হ্যাঁ, মেজর জেনারেল পদে ডা. সুসানে গীতিকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রোববার র‌্যাংক ব্যাজ পরিয়ে দেন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. সামছুল হক। এই তথ্য জানিয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী মেজর জেনারেল।
বলতে আনন্দধারা বয় মনে যে- নারীর ক্ষমতায়নে আরও একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হল। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার, সংসদ উপনেতার দায়িত্বেও নারীরা সমাসীন। এই সরকারের আমলেই সুপ্রিম কোর্টে বিচারক হিসেবে এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নারীদের দায়িত্ব পালন শুরু হয়। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সবেেচয়ে বড় বিদ্যাপীঠ আমাদের এই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন একজন নারী।
আইএসপিআর-এর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী জানা যায়- সুসানে গীতি ১৯৮৫ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নারী চিকিৎসক হিসেবে ক্যাপ্টেন পদে যোগ দেন। তিনি ১৯৯৬ সালে প্রথম নারী হিসেবে হেমাটোলজিতে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং বিভিন্ন সামরিক হাসপাতালে প্যাথলজি বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত।
পারিবারিক জীবনে তিনি তিন সন্তানের মা। তাঁর স্বামী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুল্লাহ মো. হোসেন সাদ একজন সফল সামরিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন। আমি মনে করি, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বশান্তি ও নারীর ক্ষমতায়নের উপর ভিত্তি করে দরিদ্র, বৈষম্যহীন ও সংঘাতমুক্ত যে সমাজ গড়ে তুলতে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনের চেষ্টা করছে- সেই অগ্রগতিরই অংশ এটি। ভাবতে ভালো লাগছে যে- আমরা এমন একটি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি যেখানে নারীদের এগিয়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কয়েকমাস আগে কমনওয়েলথের সরকার প্রধানদের ২৫তম সভায় আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ২০ মিনিটের বক্তব্যে নারীর ক্ষমতায়ন এবং শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি ও তাঁর সরকারের সময় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে যথার্থই বলেছেন যে- ‘সম্ভবত বাংলাদেশের সংসদই বিশ্বের একমাত্র সংসদ যেখানে স্পিকার, সংসদ নেতা, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা চারজনই নারী।’ বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতিকে এ বক্তব্য উৎসাহিত করবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসেবে, ১৪৪টি দেশের মধ্যে নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ অবস্থান ৪৭তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ১৫৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। আমরা দেখতে পাচ্ছি- বাংলাদেশে সশস্ত্র ও আইন-শৃৃঙ্খলা বাহিনীর মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করে স্বীয় যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন সাহসিকতার সাথে। বিমান চালনা, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রাষ্ট্রদূতের মতো উচ্চ পদগুলোতেও বাংলাদেশের নারীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, এভারেস্ট জয়ের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে খেলাধুলাতেও সাফল্যের সাক্ষর রাখছে আমাদের নারীরা। এই তো কিছুদিন আগে- পাকিস্তানের নারী ফুটবলারদের জালে ১৭ গোল ঢুকিয়ে দিয়ে আকাশচুম্বী জয় ছিনিয়ে আনলেন আমাদের মেয়েরা।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আমাদের ভাষা-আন্দোলনে নারীদের ত্যাগ ও সংগ্রাম এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গঠনে নারীদের অংশগ্রহণ কোনোঅংশেই কম ছিলো না। অন্যদিকে- বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদানতো অনস্বীকার্য। পত্রিকার খবরে জানা যায়- দুই কোটি নারী কৃষি কাজে এবং পোশাক শিল্পে ৪৫ লাখ চাকুরিজীবির ৮৫ শতাংশই নারী। স্যালুট জানাই সেইসব সংগ্রামী নারীদের।
যাই হোক, মেজর জেনারেল ডা. সুসানে গীতির একটি ইন্টারভিউ দিয়েই শেষ করবো এই লেখাটি। ইন্টারভিউটি দেখলাম- মাছরাঙ্গা টেলিভিশনে। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন ডা. গীতিকে- ‘…তাহলে আমরা কি স্বপ্ন দেখতেই পারি যে আমাদের সেনাপ্রধান হচ্ছেন একজন নারী?’ তিনি হেসে উত্তর দিলেন- ‘হতেই পারে, কেননা- আমাদের আর্মির অন্যান্য কোরেও তো মহিলারা আসছে।’ তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- ‘আমাকে যেনো আদর্শ ভেবে, অন্য নারীরা এগিয়ে আসেন, সেটা আমি চাই।’
ইন্টাভিউটিতে জানলাম- ডা. সুসানের জীবনের পুরোপুরি লক্ষ্য ছিলো একজন সফল চিকিৎসক হওয়া। আমি বলবো- মেজর জেনারেল হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি তাঁকে একজন সার্থক চিকিৎসক হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিয় করিয়ে দিয়েছে। তাঁর পিতা খলিলুর রহমান ছিলেন একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা। পেশায় পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। পাকিস্তানীদের হাতে মারা যান। মেজর জেনারেল সুসানে বলেন. ‘আমরা তাঁর ডেডবডি পর্যন্ত পাইনি। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জন্য আমাদের ত্যাগটা, ফিলিংসটা অন্যরকম।’
আমরা- মেজর জেনারেল পদে আপনাকে অভিনন্দন জানাই ডা. সুসানে গীতি। এগিয়ে যান আপনি। আরও উঁচুতে যান। ঘাড় আরও উঁচিয়ে আমরা আপনাকে দেখতে চাই। যেনো- আপনার জন্য গর্বে আমাদের বুকের ছাতিটা আরও ফুলে যায়। আপনার এই উত্থানে আমাদের ফিলিংসটাও যে অন্যরকম!

কয়েকমাস আগে কমনওয়েলথের সরকার প্রধানদের ২৫তম সভায় আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ২০ মিনিটের বক্তব্যে নারীর ক্ষমতায়ন এবং শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি ও তাঁর সরকারের সময় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে যথার্থই বলেছেন যে- ‘সম্ভবত বাংলাদেশের সংসদই বিশ্বের একমাত্র সংসদ যেখানে স্পিকার, সংসদ নেতা, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা চারজনই নারী।’ বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতিকে এ বক্তব্য উৎসাহিত করবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই।

x