মেঘ রোদ্দুর

ফারজানা রহমান শিমু

মঙ্গলবার , ৬ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ
18

“লালটা পরব, না নীলটা? নাকি ফিরোজা পরলে ভালো লাগবে?”-একটানা বিড়বিড় শুনে ধমকে উঠল কলি-“অ্যাই নিশু, হয়েছে কি তোর? তখন থেকে দেখছি একবার লাল, আরেকবার নীল ঘাঁটাঘাঁটি করছিস। একটা পরে নিলেইতো হয়।” নিশু কপাল কুঁচকে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে- “না, হয় না। তোমার মত একটা পরে ফেললেই হয় না। ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি। স্মার্ট লাগতে হবে, বুঝলে?” মৃদু হেসে কলি বলে উঠল, “আচ্ছা যা যা, স্মার্ট হয়েই যা।”
গা জ্বলে যায় নিশুর। বড়াপুটা এরকম হাসিতেই দুনিয়াটাকে উড়িয়ে দেয়। মুখ ঝাপ্টা মেরে নিশু বলে, “তোমার হাসিটা দেখলে—” বাক্যটা শেষ করে কলি, “তোর গা জ্বালা করে, এইতো?” মাথা ঠাণ্ডা রাখ্‌। স্মার্ট হতে হলে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়।” ধুপধাপ পা ফেলে বাথরুমে গিয়ে ঢুকে নিশু। এম.বি.এ. পড়ার ফাঁকে টুকটাক ইন্টারভিউ দিচ্ছে সে। যদিও জানে চাকরির বাজার বড়ই মন্দা আজকাল।
ঠিক আটটায় রেডি হয়ে নিশু যখন বের হচ্ছে, কলি এসে দুইশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলে, “সিএনজি নিয়ে চলে যা। যা রোদ! বাস-টেম্পোতে উঠতে গেলে তোর স্মার্টনেস খতম হয়ে যাবে।” হাত বাড়িয়ে টাকা নেয় নিশু। হঠাৎ বড়াপুকে জড়িয়ে ধরতে মন চায় খুব। কিন্তু লজ্জা এসে ভর করে। কেমন ছেলেমানুষী হয়ে যায়। মুখটাকে অধিকতর গম্ভীর করে সে বেরিয়ে যায়।
সূর্যের এত তেজ, মনে হচ্ছে শরীরটা গলেই যাবে। হাত বাড়িয়ে সিএনজি থামায় নিশু। একশ ও একশ ত্রিশ টাকার মধ্যকার দূরত্ব কমানোর জন্য কতবার যে দরাদরি করতে হল! না জানি ঘামে ভেজা মুখটা কেমন ক্যাবলা হয়ে আছে! কেন যে নিজেদের একটা গাড়ি নেই! মনে মনে ঠিক করে নেয় নিশু, চাকরি হলে প্রথমেই একটা গাড়ি কিনে নেবে। লাল টুকটুকে একটা কার। ঠিক মালিহাদের গাড়িটার মত। আপনমনে গাড়ির কথা ভাবতে ভাবতেই গন্তব্যে পৌঁছে যায় সে। কে জানে, ইন্টারভিউ বোর্ড কত রকম উদ্ভট প্রশ্ন করে! খুব নার্ভাস লাগে নিশুর। অনেক কিছু মনে করার চেষ্টা করে সে। কিন্তু সব তালগোল পাকিয়ে যায়।
নিশু যখন ইন্টারভিউ দিতে ব্যস্ত, ক্যানভাসে তখন তুলির আঁচড় টেনে চলেছে কলি। রহস্যময়ী এক রমণীর বেণী ঠিকঠাক করছে সে। ক্রুসিয়ান ব্লু’তে তার তুলির উঠানামা দারুণ ছন্দময়। কলির প্রায় মনে হয় বেণীবন্ধ রমণীর সাথে রহস্যের যেন এক প্রাচীন গাঁটছড়া বাঁধা রয়েছে। বেণীর কাজ শেষে দু’কদম পিছিয়ে যায় সে। নাহ্‌্‌, চোখের মণিটা যেন নিষ্প্রাণ মনে হচ্ছে। আরেকটু কালো রং ছড়িয়ে দেয় সে। এরপর আউটলাইন ঠিকঠাক করে চোখ দুটো গভীর করে তোলে। নিজেও ঠিক নিশ্চিত নয়, আজন্মের রহস্য কি সত্যি জমা থাকে ঐ চোখে। এলোমেলো ভাবনার ফাঁকেই সে লাল, হলুদ ও বাদামীর মিশ্রণকে আরেকটু ঘন করে নেয়। এরপর ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেয় এদিক সেদিক। এইবার যেন কিছুটা প্রাণ পায় তার ক্যানভাস। মনে হয় চারপাশের উজ্জ্বল জীবনচিত্রকে গভীর চোখে দেখছে সেই নারী। তুলির শেষ আঁচড় টেনে ঘামে ভেজা মুখটা মুছে নেয় কলি। প্রতিবারের মতই অতৃপ্তি ছেয়ে যায় মনে। এরপর ধপ করে বসে পড়ে সে।

অন্যদিকে একরাশ বিরক্তি আর যন্ত্রণা নিয়ে ঘরে ফেরে নিশু। ভাবে সে, এসব ইন্টারভিউয়ের কোন মানেই হয় না। ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে রচনা লিখতে দিয়েছে ইংরেজিতে। স্বপ্ন নিয়ে এত কিছু লেখা যায়? যত্তসব! স্কুলের শিক্ষকতার সাথে স্বপ্নের সম্পর্ক কোথায়? এসব নিয়ে মনতো বিষাক্ত ছিলই, পথের মধ্যে কাকের বেয়াদবীটা আরো অসহ্য লেগেছে। ঠিক তার মাথার উপর অকাজটা করে দিয়েছে। কার না রাগ হয়! সারাটা দিন মন ভার থাকে তার।
খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই শুয়ে পড়লেও একটানা আঁকতে থাকে কলি। মেয়ের বেডরুমের দরজায় এসে দাঁড়ায় আহসান। এত নিবিড়ভাবে কাজ করছে মেয়েটি, যেন ধ্যানে ডুবে আছে। কোমল স্বরে সে বলে, “মামণি, আসবোরে?” চমকে উঠে কলি। এরপর বলে, “তুমি ঘুমাওনি বাবা?” আহসান রুমে ঢুকে সামান্য ইতস্তত করে বলে-“নারে, ঘুম আসছে না। আচ্ছা মামণি, মাসুদকে দেখিনা অনেক দিন। ছেলেটা করছে কি?” কলি খুব সহজ কণ্ঠে বলে, “ও খুব ব্যস্ত।” আহসান বলে, “ভালো ভালো। এই বয়সটাই কাজের। বলছিলাম কি, আমার সাথে একটু দেখা করতে বলিস। সব কিছুরই একটা সময় থাকে। আমি চাই শুভ কাজটা ঠিক সময়ে সেরে যাক।” কলি নিরুত্তর তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে আহসানের মনে হয়, এই মেয়ে তার মায়ের গাম্ভীর্য পেয়েছে। পাথরের মত গাম্ভীর্যকে ভয় পায় আহসান। উঠে চলেই যাচ্ছিল। হঠাৎ কলি পিছন থেকে ডাক দিয়ে বলে, “বাবা, মাসুদ আসবে না।” থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে বলল আহসান,” মানে? আসবে না মানে কি?” কলি লম্বা এক দম নিয়ে বলে, “আসবে না মানে আসবে না।” হতভম্ব আহসান বলে উঠল, “আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না।” ক্লান্তির সুর কলির কথায়, “বুঝার আর কিছু নেই, বাবা। যার যেমন খুশি, সেভাবে চলতে দেয়াই ভাল। তুমি ঘুমাতে যাও।” একপা একপা করে বেডরুমের দিকে এগিয়ে যায় শংকিত এক পিতা।
রাতভর আকাশ জুড়ে মেঘের আনাগোনা। বিদ্যুতের ঝিলিক ও বজ্রের শব্দের সাথে সাথে তুমুল তুফান কলির বুকের মধ্যে। তার সৃষ্টিশীল কাজের সাথে আপোষ করতে পারেনি মাসুদ। এমন অদ্ভুত বৈপরিত্যের কথা ভাবা যায়? যে পুরুষ দু’হাত পেতে চেয়েছে তাকে, সে তার স্বপ্নকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে। রমণী চায় সে, সৃষ্টিশীল মানুষ নয়। কি অদ্ভুত চিন্তাধারা! অথচ কলির সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে রয়েছে শিল্প। স্বপ্নের বলিদান দিয়ে সংসারে সুখ পাওয়া যায়, এমন থিওরি সে মানে না। স্বপ্ন ও স্বজন মিলেই সংসার তৈরি হয় বলে তার বিশ্বাস।
নিজের ভাবনায় ডুবে থাকার কারণে নিশুর উপস্থিতি খেয়াল করেনি কলি। নিশুর চোখেও জল। গাঢ় কণ্ঠে সে বলে উঠল, “বড়াপু, মাসুদ ভাই এমন কেন করল? কিসের জন্য?” কলি হাসতে চেষ্টা করল। তার হাসিটা চোখের জলে ভেজা মুখটাকে আরো করুণ করে তুলল। কোনমতে সে এটুকুই উচ্চারণ করল, “ঘুমুতে যা।”
রোদের হাসিতে ঝলমল করে চারদিক। অফিসে যাওয়ার আগে আহসান এসে দাঁড়ায় মেয়ের বিছানার পাশে। কলিকে জড়িয়ে ধরে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে নিশু। কলির মুখটা ফুলে আছে। রাতভর কেঁদেছে বুঝি মেয়েটা। মায়ের মৃত্যুর পর থেকে যেন রাশভারী হয়ে উঠেছে। এত বেশি নিজের মধ্যে থাকে, তার তল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। মেয়ের মাথায় হাত রাখার প্রবল ইচ্ছেটা কষ্টে দমন করে চলে যায় আহসান। বুয়াকে বলে দিয়ে যায় কলিকে যেন ঘুম থেকে না তোলে।
সকাল এগারোটার দিকে ঘুম ভাঙে নিশুর। কি আশ্চর্য! বড়াপু আজ ডাকাডাকি করেনি মোটেই। মোবাইলে চোখ বুলিয়ে দেখে একই নম্বর থেকে কল এসেছে তিনবার। সাইলেন্ট থাকায় শুনতে পায়নি সে। রিং ব্যাক করে জানতে পারে, মাল্টি ফ্রেশনার কোম্পানির কল ছিল ওটা। অ্যাকাউন্টেন্টের চাকরিটা পেয়ে গেছে সে। প্রিয় বান্ধবী সোনিয়ার বাবা হলেন ঐ কোম্পানির জিএম। সোনিয়াই বলেছিল অ্যাপ্লাই করতে। দুর্মূল্যের বাজারে চাকরি পেয়েই খুশি হয় নিশু, অন্য কিছু ভেবে মাথা ভারী করার প্রয়োজন বোধ করে না সে। ফোনের কথা শেষ হতেই চিৎকার দেয় সে-“হিপ হিপ হুররে। ইয়াহু! বড়াপু, এদিকে আসো। ও বড়াপু—“কলি পাশের রুম থেকে জবাব দেয়, “চেঁচাচ্ছিস কেন? কি হয়েছে?” নিশু ছুটে গিয়ে কলিকে জড়িয়ে ধরে দু’চারটা চুমুও দিয়ে দেয়। এরপর উত্তেজিত কণ্ঠে বলে-“আমার চাকরি হয়ে গেছে। এবার আমি লাল একটা কার কিনে নেব।” কলি বোনকে কনগ্রাচুলেশন জানায়। আবেগের বাড়তি প্রকাশ ওর কখনো ছিল না। আনন্দের সময় কেবল চোখ দুটো উজ্জ্বলতর হয়ে উঠে। নিশু তড়িঘড়ি করে বাবাকে ফোন দিতে উদ্যত হয়। কলি মৃদুস্বরে বলে-“জানিস, বড় একটা কাজ পেয়েছি। এক লাখ টাকার অর্ডার। ছবি ভালো হলে অর্ডার কনটিনিউ হবে।” এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে যায় নিশু। এরপর গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “কনগ্রাচুলেশনস। এই খবরটা তুমি হজম করে আছ? ওয়াও, আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। চল, আমরা বাবার অফিসে চলে যাই। তিনজনে মিলে বাইরে লাঞ্চ করব। উফ, আমি ভাবতেই পারছি না।” বোনকে আরেকবার চুমু খায় নিশু।
আজ আর জামা বেছে নেয়না নিশু। লাল টুকটুকে একটি কারের স্বপ্নে বিভোর সে। আর কলি? মাসুদের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠে তার। মনের মধ্যে অভিমানী স্বর গুনগুন করে, “কেন তুমি এমন করলে? একদিন আমার আর্ট তোমাকে কাছে এনেছিল। শিল্প ভালবেসেই তুমি শিল্পীর হাত ছুঁয়েছ, মন ছুঁয়েছ। তবে কেন?” জবাবটা সে পেয়ে যায় অন্যদিনের আচরণে। এইতো সেদিন বড্ড বিরক্ত কণ্ঠে বলেছিল, “সারাক্ষণ আর্ট আর আর্ট। আচ্ছা, তুমি এসব নিয়ে পড়ে থাকলে আমার কি হবে বলতো। আমার খেয়াল কে রাখবে? না, না, বিয়ের পর কিন্তু এসব একদম বাদ।”
নিজের অজান্তে কঠিন হয়ে ওঠে কলির মুখ। স্বপ্নের চিতায় নিজ হাতে আগুন দেয়ার চেয়ে নিঃসঙ্গতাই ঢের ভাল। মনকে শক্ত করে নেয় কলি। এরপর চোখের কোণটা মুছে নিয়ে সে পা বাড়ায় উন্মুক্ত পৃথিবীর পানে, যেখানে সোনালী চিল পাখা মেলে আকাশে উড়তে থাকে অবিরাম।

x