মেঘের বসতি : জুরাছড়ির পাংখোয়া পল্লী

সমির মল্লিক : খাগড়াছড়ি

সোমবার , ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ
41

জুরাছড়ি’র কুকিমনের চূড়ায় পাংখোয়া পল্লী বহুদিনের চেনা নাম। সেই পথেই এবার যাত্রা। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে চাঁন্দের গাড়িতে লংগদু পৌঁছাই। লংগদু থেকে লঞ্চে বৃষ্টি উপেক্ষা করে শুভলংয়ের পথে যাত্রা। বর্ষার শেষ হলেও কাপ্তাই লেককে দেখে সমুদ্র বলে মনে হয়। পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তৃত জলরাশির ঢেউ আছড়ে পড়ছে। শুভলং বাজারে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকাল ৩ টার লঞ্চে রওনা হলাম জুরাছড়ির পথে। জলের স্রোত কেটে লঞ্চ চলেছে সবুজে ঘেরা জলাভূমির পথ ধরে। কাপ্তাই লেকের একটা অংশ জুরাছড়িতে এসে শেষ হয়ে গেছে। পানি আর পাহাড় ঘেরা স্বর্গভূমি, উঁচু সেই গ্রাম উপভোগ করতে যেতে হবে রাঙামাটির শুভলংয়ে।

শরতের আকাশে নীল রঙের দারুণ ছটা। এখানে জলরাশির সাথে মেঘের চিরন্তন সখ্যতা । কাপ্তাই লেকে চলাচলকারী কাঠের দোতলা লঞ্চগুলো রৌদবৃষ্টিতে বেশ উপভোগ্য। লঞ্চের পেছনের ছাদে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখাটা মায়াবী অনুভূতির জন্ম দেয়!

লংগদু থেকে দুপুর নাগাদ লঞ্চ শুভলং বাজারে পৌঁছলো। এখানের বাজারে কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি, শুভলং বাজার রাঙামাটির প্রধানতম নৌরুট। জেলার বেশিরভাগ উপজেলায় যাতায়াত এই শুভলং বাজার হয়ে। তবে এবারে আমাদের যাত্রাপথ জুরাছড়ির কুকিমন পাহাড়ের পাংখোয়া পল্লী’র যাওয়ার লঞ্চও এখান থেকে ধরতে হবে। শুভলং থেকে যাত্রীবাহী লঞ্চে জুরাছড়ির পথে রওনা হলাম। লেকের নীলজল, রয়েছে ঘন শ্যাওলা। লেকের পাড়ে পাহাড়ের ডানায় বসবাস করা পাহাড়ের আদিবাসীদের বসতি আর জুম ফসলের আবাদ। বিকালের রঙিন আকাশের ছায়া পড়েছে গেরুয়া পাহাড়ের গায়ে। নীল জলের নিচে সবুজের বাগান। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা ছোট্ট কুটিরগুলোও ঢেকে আছে ঘন মেঘের চাদরে। মেঘের কারণে সবুজ বর্ণগুলো মুহূর্তে সাদা হয়ে যাচ্ছিল। বিকাল নাগাদ জুরাছড়ির ঘাটে পৌঁছলাম। এখান থেকে দেশি নৌকায় রওনা হলাম। নিঃশব্দের জলাভূমি থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জুরাছড়ির কুকিমন পাহাড়ের চূড়াগুলো ঢেকে গেছে সাদা মেঘের আচ্ছাদনে। জুরাছড়ি থেকে কিছুটা গেলেই বনযোগীছড়া বাজার। চারপাশে অথৈ পানি। তাই ইঞ্জিন চালিত নৌকাই একমাত্র ভরসা। বনযোগীছড়া বাজার থেকে কিছুটা মোটর বাইকে যাওয়ার পর বাকি পথ ঝিরির। পাথুরে ঝিরিতে পাহাড় থেকে বয়ে আসা পানির স্রোত। সবুজে ঢাকা বুনো ট্রেইল! ঝিরির পথ বয়ে নেমে গেছে কুকিমন পাদদেশ ঘেঁষে। ঝিরি পথে জলের বাঁক পেরিয়ে কুকিমন পথে পা ফেললাম। কুকিমনের পাংখোয়া পল্লীতে যাওয়ার একমাত্র পথে হাঁটা শুরু হল। পুরোটায় খাড়া পথ।

পাহাড়ে উঠতে মেঘের দল এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, পথের দুপাশের ঘন বন। কোথাও কোনো বসতি চোখে পড়ছে না। মেঘবৃষ্টিরৌদ্দুর পেরিয়ে পাংখোয়া পল্লীতে পৌঁছতে দিন প্রায় শেষ হয়ে গেল। পাড়ার সীমানায় ঢুকতেই লালসবুজের পতাকা স্বাগত জানাল। সমতল ভূমি থেকে এত উপরে এই বুনো পরিবেশে ঘেরা পাহাড়ের চূড়োয় একটি স্কুলে উড়ছে দেশের পতাকা। পাংখোয়া ছেলেমেয়েরা এই স্কুলের শিক্ষার্থী, ৪৫জন পাংখোয়া ছাত্রছাত্রী এই স্কুলে। পাড়াটিতে শুধুমাত্র পাংখোয়া আদিবাসীদের বসবাস। যেন ছবির মতো সুন্দর।

পাড়াটি যেন পাংখোয়াদের স্বর্গ পল্লী। কুকিমন পাহাড় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতায় প্রায় ১৬১০ ফুট উপরে। পাহাড়ের উপর থেকে যতটুকু চোখ যায় কেবল সুনীল পাহাড়ের বন্ধনী। নিচের পৃথিবীটা জলের দখলে। সুনীল আকাশ আর সাদা জলের দেশে সুউচ্চ পাহাড়ে সুদীর্ঘ কালের বসতি পাংখোয়া পল্লী। ২৫টি পাংখোয়া বসতি আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাথলিক এবং ব্যাপিস্ট দুটি গির্জা আছে পাড়ার শুরু আর শেষ প্রান্তে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে দৃশ্যমান দোতলা মাচাং ঘরগুলো, সহসাই সেখানে ধরা দেয় মেঘের দল। যতক্ষণ পাড়ায় ছিলাম পুরো সময় মেঘবৃষ্টিবাতাসের অবগাহন। পাংখোয়া পাড়ার চারপাশে তেঁতুল, বট ও নারিকেল গাছের প্রাকৃতিক বেষ্টনী। ধবধবে জোছনায় এমন একটি পাড়ায় একটি রাত যাপনটা স্বপ্নের মতোই সুন্দর।

x