মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সন্দ্বীপ চ্যানেল পাড়ি

ঈদে নৌ যাতায়াত

অপু ইব্রাহিম, সন্দ্বীপ

শনিবার , ১০ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ
196

সন্দ্বীপ চ্যানেল উত্তাল। এ আবহাওয়ায় নৌপথ পাড়ি না দেওয়াই ভালো। আমি অনেকটা মৃত্যুর পথ থেকে ফিরে এসেছি। একেক ঢেউ ছিল মৃত্যুর চোখ রাঙানি। খুব ভয়ের মাঝে সাগর পাড়ি দিয়েছি তা বলে বুঝাতে পারব না। জীবনের মূল্য অনেক। বেঁচে থাকলে নিকটজনদের সাথে অনেক ঈদ করা যাবে। আবহাওয়া এমন থাকলে সন্দ্বীপ আসবেন না।
গত ৭ আগস্ট মালের বোটে ২ ঘণ্টায় তীব্র ঢেউয়ে সন্দ্বীপ পৌঁছার তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও বার্তায় এভাবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন মোস্তফা জাবেদ ইসা।
তিনি আজাদীকে বলেন, উত্তাল সন্দ্বীপ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে চ্যানেল পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু এমন বিভীষিকা কখনো দেখিনি। আল্লাহ জীবন রেখেছেন বিধায় আমরা ৫০ জন যাত্রী বেঁচে ফিরেছি। সন্দ্বীপ চ্যানেল এত বেশি উত্তাল ছিল যে, বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। শুধুমাত্র একটি অত্যাধুনিক জাহাজের অভাবে এত দুর্ভোগ। বর্ষাকালে নিরাপদ নৌ যাতায়াত আমাদের প্রাণের দাবি।
সন্দ্বীপের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। নৌপথে যাতায়াত করতে গিয়ে যাত্রীদের এরূপ নানা দুর্ভোগ ও ভোগান্তি নিত্যদিনের। জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল সন্দ্বীপ চ্যানেলের ১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন এখানকার হাজার হাজার মানুষ। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে অল্প দূরত্বের এ চ্যানেল পাড়ি দিতে যাত্রীরা, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা অবর্ণনীয় কষ্টের সম্মুখীন হন।
গুপ্তছড়া-কুমিরা রুটে বিআইডব্লিউটিসির নিয়মিত কোনো জাহাজ নেই। বর্তমানে এমভি আবদুল মতিন নামে একটি জাহাজ লোক পারাপার করলেও তাও লক্কড়-ঝক্কড়। বর্ষাকালে প্রতিকূল আবহাওয়ায় উত্তাল ঢেউয়ে চলাচলের সক্ষমতার প্রশ্ন তুলেছেন যাত্রীরা। ঈদুল ফিতরে স্পেশাল যাত্রী পারপারের জন্য আনা হলেও দফায় দফায় মাঝ নদীতে এর ইঞ্জিন বিকল হয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, এ জাহাজ ফিটনেসবিহীন। ফলে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সন্দ্বীপ রুটের নৌ যাতায়াত বন্ধ থাকে। আবার অন্যান্য নৌযানের তুলনায় সময় বেশি লাগা ও ওঠানামার অসুবিধার কারণে জাহাজে যাত্রীরা উঠে না। প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো জাহাজটি মাঝ নদীতে নিয়মিত ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় এটি যাত্রীসেবায় কাজে আসছে না। ফলে যাতায়াতের বাহন হিসাবে নদী পারাপার করতে ব্যবহৃত হয় স্পিডবোট ও কাঠের তৈরি সার্ভিস বোট।
তবে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামলাতে জেলা পরিষদ ইজারাদারদের প্রায় সময় অবৈধ মালবাহী বোট ও লালবোটে করে যাত্রীদের পারাপার করতে দেখা যায়।
অন্যদিকে যাত্রীদের চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ নৌযান নেই ইজারাদারদের হাতে।
কাছিয়াপাড় টু বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাটে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে মাত্র দুটি স্পিডবোট দিয়ে। বিভিন্ন মৌসুমে সন্দ্বীপের অন্যতম প্রধান ঘাট হিসাবে প্রচলিত কুমিরা গুপ্তছড়া রুটেও যাত্রীদের চাপ সামলানোর মতো নৌযান নেই ইজারাদারের হাতে। বেশিরভাগ কাঠের বোট মান্ধাতার আমলের। এগুলো নিয়মিত রিপেয়ার করে নদীতে চলাচল করে। সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডগুলোতে কাটতে আনা মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজগুলো থেকে সংগ্রহ করা লালবোটগুলো। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এসব নৌযান দিয়ে যাত্রী পারাপারে প্রতি বছর দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ যাত্রীরা।
২০১৭ সালের ২ এপ্রিল লালবোট দুর্ঘটনায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাই সন্দ্বীপের সাথে দেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে সার্বক্ষণিক যাতায়াতের জন্য নিরাপদ নৌযানের দাবি দীর্ঘদিনের।
মুছাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের নাদিম বলেন, সন্দ্বীপের মানুষ জিম্মি হয়ে আছি। আমাদের একমাত্র দাবি, একটি নিরাপদ নৌযান চালু হওয়া।
গুপ্তছড়া কুমিরা ঘাটের ইজারাদার এস এম আনোয়ার হোসেন চেয়ারম্যান দৈনিক আজাদীকে বলেন, আবহাওয়া প্রতিকূল থাকলে স্পিডবোটসহ নৌযান চালাতে নিষেধ করি। অনেক সময় মাঝ নদীতে গেলে হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায়। ফেরিঘাটগুলো এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। তাই যাত্রী সুবিধার জন্য কোনো বড় উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় না।
বিআইডব্লিউটিসির ডিজিএম (কমার্স) গোপাল চন্দ্র মজুমদার আজাদীকে বলেন, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আবদুল মতিন ডকে ছিল। ৯ আগস্ট থেকে যাত্রী পারাপার করার কথা রয়েছে। তার প্রশ্ন, জাহাজ দিয়েও কী হবে? সন্দ্বীপের মানুষ তো উঠতে চায় না।
সন্দ্বীপের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা আজাদীকে বলেন, গুপ্তছড়া-কুমিরা রুটে সার্ভিস দিতে এফ এম ডকে ৫০০ আসনের একটি জাহাজ তৈরি হচ্ছে।
এছাড়া নারী-শিশুসহ যাত্রীদের ওঠানামায় যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে গুপ্তছড়া ঘাটে একটি আধুনিক জেটি নির্মাণাধীন রয়েছে। জেটি নির্মাণ হলে ওঠানামার কষ্ট লাঘব হবে।

x