মৃতদের জন্য প্রার্থনা সঙ্গীত

শাফিনূর শাফিন

শনিবার , ৩ আগস্ট, ২০১৯ at ৪:২৯ পূর্বাহ্ণ
29

‘কোন অচেনা আকাশের নিচে নয়
কোন অচেনা ডানায় মুখ ঢেকে নয়-
স্বজাতির সাথে আমি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে
যেখানে আমার দেশ, কোথায় যে হারালো’

(আনা আখমাতোভার ‘মৃতদের জন্য প্রার্থনা সঙ্গীত’এর অংশবিশেষ )

১৯৩০ সালে আনা আখমাতোভা যখন ‘মৃতদের জন্য প্রার্থনা সঙ্গীত’ নামের দীর্ঘ কবিতাটি লেখা শুরু করেছিলেন, তিনি খুব ভালো করেই জানতেন সোভিয়েত রাশিয়ায় এই কবিতা প্রকাশ করতে দেয়া হবে না। কারণ এর বহু আগে থেকেই আনা পরিচিত ছিলেন স্ট্যালিনবিরোধী হিসেবে এবং তাঁর লেখালেখির কার্যক্রমকে সন্দেহ করা হতো শুরু থেকেই। সন্দেহভাজন তালিকায় তাঁর নাম আছে জানার পর আনা বুঝতে পারছিলেন স্ট্যালিনের গুপ্ত পুলিশ যে কোনো সময় বাড়িতে খানতল্লাশী চালাতে পারে। স্ট্যালিনের রোষানল এড়াতে আনা আখমাতোভা তাঁর সমস্ত লেখাপত্র পুড়িয়ে ফেলেন। কিন্তু তারপরেও যদি তিনি গ্রেফতার হন বা তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়ে যায়, লেখাগুলো তো সব হারিয়ে যাবে! কী করা যায়! নিজের কবিতা বাঁচিয়ে রাখার এক অভিনব উপায় বের করলেন আনা। ঘনিষ্ঠ মেয়েবন্ধুদের নিজের কবিতা মুখস্থ করান যাতে তাঁর মৃত্যুর পরেও এই কবিতা মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে বেঁচে থাকে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে তখন গুলাগ নামের একটা প্রক্রিয়া চালু ছিল। ইচ্ছার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে কাজ করতে বাধ্য করা হতো, আর এই ক্যাম্পে শ্রমিকরা পরিবারবিচ্ছিন্ন থাকতো দিনের পর দিন। এমন পরিস্থিতিকে আনা আখ্যা দিয়েছিলেন, স্ট্যালিন সমস্ত সোভিয়েত ইউনিয়নকে জেলখানা বানিয়ে ছেড়েছেন! প্রেমিককে এক নজর দেখতে বা প্রিয়জনের মুক্তির সুখবর পাবার আশায় ক্যাম্প নামের কারাগারের বাইরে আরও বহু হতাশাগ্রস্ত নারীর সাথে দাঁড়িয়ে যা যা দেখেছিলেন নিজের সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে কবিতাটি লিখেন আনা। তিনি এই পরিস্থিতিটিকে ‘প্রাক-গুটেনবার্গ’ বলেছিলেন কারণ তৎকালীন সরকার আনার মতো আরও লেখকদের গা ঢাকা দিতে বাধ্য করেছিল। স্ট্যালিন যেহেতু সরকারি যেকোন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিলেন, আখমাতোভা ও তার বন্ধুরা তাই নিজেদের কবিতা বাঁচিয়ে রাখার জন্য লিখতেন না। না লিখে মুখস্থ করিয়ে তা সংরক্ষণের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। স্মৃতি থেকে তাই পরবর্তীতে কবিতার বহু শব্দ এদিক ওদিক বা কবিতার কাঠামো বদলে যেত। তাই আনা খুব সতর্ক ছিলেন বন্ধুদের কবিতাটি শেখানোর সময়। প্রতিটি দাঁড়ি-কমা নিয়ে তিনি খুব সতর্ক ছিলেন যেন মুখে মুখে ফেরার সময় কোনভাবে যেন একটি কমাও না বদলায়। ফলে বন্ধুদের মনই হয়ে উঠেছিল একটা সাদা কাগজের মতো যেখানে কবিতাটি গাঁথা হয়েছিল বেশ শক্তপোক্তভাবে। তৎকালীন লেখক-কবিদের ব্যাপারে স্ট্যালিনের চিন্তিত হবার যথেষ্ট কারণ ছিল। কারণ স্ট্যালিন জানতেন সাহিত্য খুব মারাত্মক ভূমিকা রাখতে পারে তাঁর বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে। আনা আখমাতোভাকে বলা হতো রাশিয়ান স্যাফো। স্যাফো গ্রীক ক্ল্যাসিক কবি, যিনি কবিতার জন্য নির্বাসিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্ট্যালিন যখন যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত- তখন আনার মতো আন্ডারগ্রাউন্ড কবিরা বেরিয়ে আসেন, পরিস্থিতি তাঁদের জন্য কিছুটা স্বাভাবিক হয়। কিন্তু আনা একটি ভুল করে বসেন। ব্রিটিশ বুদ্ধিজীবি ইসায়াহ বার্লিনের সাথে দেখা করেন যা জানাজানির পরে তাকে ব্রিটিশ গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করা হয়। তাকে নজরবন্দী করে রাখা হয় এবং কবিতা প্রকাশে একরকম নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। ১৯৫৩ সালে স্ট্যালিন মারা যাওয়ার পর আনার কবিতা জনসাধারণের জন্য ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হতে শুরু করে। আনার কবিতাটি তাঁর জীবদ্দশাতেই বিদেশে প্রকাশিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার এক বছর আগে আনা আখমাতোভা এবং তাঁর কবিতাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হয়। আর এভাবে আনা রাষ্ট্রের একনায়কতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা লিখেই জিতে গিয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে আনা এই কবিতা লিখেন।
সূত্রঃ বিবিসি

x