মৃণাল সেন: স্রোতের বিপরীতমুখী চলচ্চিত্রকার

শৈবাল চৌধুরী

মঙ্গলবার , ১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ
74

চলচ্চিত্র গবেষক ঈশ্বর চক্রবর্তী বলেন, ‘মৃণাল সেনের ছবি ক্রমশঃ যেন একটি একটি ক্যাপসুলের মতো হয়ে উঠেছে, যার ক্ষুদ্র পরিসরের মধ্যে ধরা পড়েছে বিশ্ব সমাজের রূপ গুণ স্বভাব চরিত্র, মানুষের অগণিত জিজ্ঞাসা। শুধু বিষয় উৎকর্ষে না, তাঁর শিল্পের প্রসাদ গুণও ক্রমশঃ শৈলী আঙ্গিক প্রতিন্যাসের অমেয় শক্তি বিকশিত করেছে। তাঁর ছবিগুলো জীবন-জগতে, চলচ্চিত্র জগতে, শিল্পের জগতে দার্শনিক পরিক্রমা- ক্রমবিন্যাসে ক্রম পরিণতিতে যেন দিশারীর মতো। শিল্পী হিসেবে যেন তিনিও ক্রমশঃ খুঁজে চলেছেন তাঁর পথ, পথ রচনাও করে চলেছেন অনুসন্ধানীদের জন্য।

শেষ ছবিটি তিনি করেছিলেন ২০০২ সালে। আমার ভুবন। এটি তাঁর অন্য ছবিগুলোর চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা। বক্তব্যে, গড়নে, চরিত্র সংগঠনে। মাত্র তিনটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে শেষের ছবিটি তিনি চিত্রায়িত করেছিলেন। এরপর সবারই প্রত্যাশা ছিল আবার তিনি ছবি করুন। সত্যজিৎ, ঋত্বিক চলে যাবার পর বাংলা সিনেমার একমাত্র অভিভাবক ছিলেন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে মাথার ওপর ছায়া দিয়ে যাচ্ছিলেন। ঋত্বিক চলে যান ৫১ বছর বয়সে। সত্যজিৎও মাত্র ৭১। তিনি শতায়ু হবেন এটাই আশা ছিল আমাদের। বাঙালি শতায়ু হয় কম। ৯৯ পর্যন্ত গেছেন কেউ কেউ। যেমন অন্নদাশংকর রায়, বিজয়া রায়, লীলা মজুমদার, নীরদচন্দ্র চৌধুরী। সেঞ্চুরি আর করা হয় না। ৯০ পার করেছেন অনেকে। সম্প্রতি (২৫ ডিসেম্বর) চলে গেলেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ৯০ পার করে। তিনি অতিক্রম করলেন ৯৫ (১৯২৩-২০১৮)।
বাংলা চলচ্চিত্রের তিন ত্রয়ীর একজন। সত্যজিৎ রায় (১৯২১-২০১২), ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬) এবং মৃণাল সেন (১৯২৩-২০১৮)। তাঁদের বলা হতো বাংলা চলচ্চিত্রের ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর। তবে কেবল বাংলা চলচ্চিত্র নয়, পুরো উপমহাদেশের চলচ্চিত্র সাবালক হয়েছে এই তিনজনের হাতে। বিশেষ করে মৃণাল সেনের ভূমিকা এক্ষেত্রে একটু অগ্রসর ভিন্ন কারণে। তিনি বাংলা ছাড়াও হিন্দি, উড়িয়া, তেলেগু ভাষায় ছবি করেছেন।
বহুভাষী ছবি করেছেন দুটি। জেনেসিস (১৯৮৬)। হিন্দি ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায়, ইচ্ছাপূরণ (১৯৬৯) বাংলা হিন্দি ও মারাঠিতে।
যে ছবিটি হিন্দি সিনেমায় নবতরঙ্গ আন্দোলনের সূচনা করে সেই ‘ভুবন সোম’ মৃণাল সেন নির্মাণ করেন ১৯৬৯ সালে। বস্তুত এরপরেই হিন্দি চলচ্চিত্রে নবজাগরণের সূচনা ঘটে। অনেকে এই ঘটনাকে প্যারালাল হিন্দি সিনেমার সূচনা বলেও উল্লেখ করেছেন। একে একে এগিয়ে আসেন শ্যাম বেনেগাল, গোবিন্দ নিহালনি, এস এম সথ্যু, মণি কাউল, সৈয়দ আখতার মির্জা এবং আরো অনেকে। হিন্দি সিনেমায় একটি বুদ্ধিভিত্তিক ধারার বিকাশ ঘটে। স্বভাবতই এরা নির্মাণগত দিক থেকে মৃণাল সেন প্রভাবিত ছিলেন না। তবে সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা এদের ছবিতে লক্ষণীয় যা মৃণাল সেনের ছবিতে দেখা যায়।
আড়ম্বরহীন জীবন যাপন করতেন। চলনে-বলনে সর্বত্রই। চাঁছাছোলা কথাবার্তা বলতেন। শারীরিক গঠনটিও ছিল ঋজু দীর্ঘ দৃঢ়। যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন তারা জানেন আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ সদাচঞ্চল এক মানুষ ছিলেন মৃণাল সেন। তিনবার তাঁর সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার কলকাতা ও ঢাকায়। চট্টগ্রামে একবার আসার কথা ছিল ১৯৯৪ সালে। সেবার তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু সে সময়ের সরকার তাঁকে চট্টগ্রাম যাবার অনুমতি দেয়নি। তবে ঢাকায় ও চট্টগ্রামে তাঁর চলচ্চিত্রের সপ্তাহব্যাপী রেট্রোসপেকটিভ আয়োজিত হয়েছিল। যে তিনবার দেখা হয়েছিল, কথা বলে দেখেছিলাম নিজের কাজ ও বিশ্বাস সম্পর্কে সুস্পষ্ট আস্থা ছিল তার। বাংলাদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও এটা নিয়ে খুব একটা নস্টালজিক ছিলেন না। আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন সারাজীবন। তাঁর কথায়, ‘অত নস্টালজিয়া ভালো নয়। নস্টালজিয়া চলে যায় সেন্টিমেন্টালিজমের দিকে। সেন্টিমেন্টালিজম থেকে এসে যায় একটা মিথ্যাচারণ’।
মধ্যবিত্ত মানসিকতার মন্দ দিকের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন তাঁর চলচ্চিত্রে। তাঁর ছবিগুলোও অনেকটা চাঁছাছোলা। মেদ কম। কখনোবা নীরস মনে হয়। কমিটেড শিল্পী ছিলেন মৃণাল সেন। শৈশবে যখন বেড়ে উঠছেন ফরিদপুরে তখন ঘরেবাইরে রাজনৈতিক আবহ। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তখন। ১৯২৩ সালের ১৪ মে ফরিদপুরে জন্ম তাঁর। আইনজীবী পিতা ও গৃহিণী মা দুজনেই পরোক্ষে যুক্ত ছিলেন রাজনীতিতে। ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর কলকাতায় চলে যান। সেখানে ছাত্রাবস্থায় সরাসরি সংযুক্ত হন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। জেলও খেটেছেন সপ্তাহখানেক তখন বেআইনি কমিউনিস্ট পার্টি করার অপরাধে। আরো পরে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (আইপিটিএ) সাথেও যুক্ত হন। যদিও পার্টি কিংবা আইপিটিএ কোনোটারই সদস্যপদ নেননি। তাঁর জীবনীসূত্রে এসব জানা যায়। তবে শৈশব থেকেই যে রাজনৈতিক বীক্ষা ও দীক্ষা তার প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল তাঁর চলচ্চিত্রে। তৃতীয় ছবি বাইশে শ্রাবণ (১৯৬০) থেকে শেষ ছবি আমার ভুবন পর্যন্ত প্রতিটি ছবিতে তা কখনো প্রত্যক্ষে কখনো পরোক্ষে লক্ষণীয়। তবে মাঝেমধ্যে এই প্রয়োগ উচ্চকিতও হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কলকাতা চতুষ্টয়ে; ইন্টারভিউ (১৯৭১), কলকাতা ’৭১ (১৯৭২), পদাতিক (১৯৭৩) ও কোরাস (১৯৭৪)। তারপরেও এই আঙ্গিক হয়ে ওঠে সম্পূর্ণরূপে মৃণাল সেনীয়। বিতর্ক, সমালোচনা আর নানা প্রশ্নের বাণ নিয়েই। পরবর্তীকালে এই আঙ্গিক ভারতের বিভিন্ন প্রান্তসহ অন্য দেশেও অনুসৃত হয়েছে। আর মৃণাল সেন হয়ে উঠেছেন ক্রমশঃ পরিপূর্ণ একজন রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার।
মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র নির্মাণ পরিক্রমাকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্ব- রাত ভোর (১৯৫৫) থেকে ভুবন সোম (১৯৬৯)। দ্বিতীয় পর্ব-ইন্টারভিউ (১৯৭১) থেকে পরশুরাম (১৯৭৮)। তৃতীয় পর্ব-একদিন প্রতিদিন (১৯৭৯) থেকে আমার ভুবন (২০০২)। তিনটি পর্বে সুস্পষ্ট তিনটি ঘরানা পরিলক্ষিত হয়। আধুনিক এই নির্মাতা প্রতিটি ভাগেই কেবল নয় প্রতিটি ছবিতেই নিজের ফর্মকে ভেঙেছেন গড়েছেন। সুনির্দিষ্ট ও পূর্ব পরিকল্পিত চিত্রনাট্য যেমন করতেন না, স্যুটিং পূর্ব তৈরি করে রাখা চিত্রনাট্যকে স্যুটিং স্পটে গিয়ে প্রয়োজনমত বা ইচ্ছেমত পরিবর্তন করতেন। অভিনয় শিল্পী ও কুশলীদের ইম্প্রোভাইজেশনকে বেশ গুরুত্ব দিতেন। তাদের ভাবনা চিন্তাগুলোও স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা ছিল তাঁর। চলচ্চিত্র যে একটি সম্মিলিত প্রয়াস অর্থাৎ টিম ওয়ার্ক, পরিচালকের প্রাথমিক ভাবনা থেকে দর্শকের উপলব্ধি পর্যন্ত, এ বিষয়টি তিনি বিশ্বাস করতেন। এর সুন্দর প্রমাণ ‘আকালের সন্ধানে’ ছবির টাইটেল। ছবির শিরোনাম দেখানোর পর টাইটেলে বলা হয়, ছবির সংগঠনে: এরপর কলাকুশলীদের নাম একে একে আসতে থাকে, কিন্তু কে কি কাজ করেছেন সেটা বলা হয় না।
মৃণাল সেন বলেছেন, ‘আমি অভিনেতা অভিনেত্রীদের স্ক্রিপ্ট দেই না, পড়ে শোনাই, কারণ আমি সবসময়ই বদলাতে থাকি’। পরিবর্তনশীলতা সৃষ্টিশীলতা অন্যতম একটি শর্ত। এটা মৃণাল সেনের মধ্যে বেশি পরিমাণে ছিল।
মৃণাল সেনের প্রথম পর্বের চলচ্চিত্রগুলো ছিল সরাসরি কাহিনীভিত্তিক। অর্থাৎ ন্যারেটিভ ফর্মে ছবিগুলো নির্মাণ করতেন। দ্বিতীয় পর্বে সম্পূর্ণরূপে এই ফর্ম থেকে সরে এলেন। কাহিনীকে ভেঙেচুরে ছবির বক্তব্যকেই প্রাধান্য দিলেন। অর্থাৎ সাবজেকটিভ ফর্ম। এ-পর্বে তিনি কারিগরি কৌশলের ওপর জোর দিলেন বেশি। এবং অবশ্যই অভিনয়ের ওপর। তাঁর মতে, যে কোনো শিল্পের রীতিনীতি নির্ধারিত হয় সেই শিল্পের উপকরণগুলোর শারীরিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে। ফিল্ম হচ্ছে টুকরো টুকরো দৃশ্যের সমাবেশ, টুকরো টুকরো গতির সমাবেশ, টুকরো টুকরো ভঙ্গির সমাবেশ। এই টুকরোগুলো দিয়েই গড়ে ওঠে ফিল্ম। অপটিকস ও সাউন্ডের কতকগুলো নিয়ম থেকেই ফিল্মের চরিত্র তৈরি হয়। তদুপরি ফিল্ম হচ্ছে একটা কারিগরি ব্যাপার- টেকনলজিক্যাল পারফরমেন্স’।
অর্থাৎ তাঁর কাছে ছবির কাহিনী বা আখ্যানের চাইতে তার প্রায়োগিক দিকটাই মুখ্য। তবে এক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা প্রয়োজন। বিপদ মৃণাল সেনের বেলাতেও যে হয়নি তা নয়। তাঁর এ-পর্বের ছবিগুলো যথেষ্ট পরিমাণে রাজনৈতিকভাবে সাবজেকটিভ। কারিগরি মনোনিবেশ ও কাহিনী ভাঙার প্রবণতায় কখনো একটু বেশি মাত্রায় নিরীক্ষাধর্মী হয়ে উঠেছে। যেমন কোরাস, উড়া উড়ি কথা, পরশুরাম। এই দ্বিতীয় পর্যায় নিয়েই বিতর্ক বেশি। অনেকের মতে এই সময় তাঁর মধ্যে অতিরিক্ত রাজনৈতিক সর্বস্বতা ভর করেছিল। তিনি অন্তহীন এক অন্বেষণে ছিলেন। এসব সমালোচনায় তিনি নিজেও বিরক্ত ছিলেন বরাবর। বলতেন, ‘আমি অন্যদের মতো কাহিনী নির্ভর ছবি তৈরি করিনি। আপনাদের বুঝতে দেরি হলে আমার তো কোনো দোষ নেই। বাস্তবতার বাইরে আমি যাইনি। অন্যরা কী করেছে সেটা দেখুন। আমার সিনেমা জ্ঞান ও প্রমাণ দিয়ে বুঝতে হবে।’
তবে তৃতীয় পর্বই হচ্ছে মৃণাল সেনের শ্রেষ্ঠ সময়। এ-পর্যায়ে তিনি নির্মাণ করেন একদিন প্রতিদিন, আকালের সন্ধানে, খারিজ, খণ্ড হর, জেনেসিস- এর মতো স্মরণীয় চলচ্চিত্র। এই পর্বে দেখা যায় তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের সংমিশ্রণে নতুন একটি নির্মাণধারা। যেখানে ন্যারেটিভ ও সাবজেকটিভ উভয় ফর্মের সংমিশ্রণে চমৎকার একটি অভিনব ফর্ম। আর এ-পর্বেই তিনি পুরো চলচ্চিত্র বিশ্বে আরো বেশি সমাদৃত হয়ে ওঠেন।
মৃণাল সেন তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘নীল আকাশের নিচে’ (১৯৫৯)-এর মধ্য দিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন। হিন্দি কথা সাহিত্যিক মহাদেবী ভার্মার উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি ভারত চীন মৈত্রী সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। এ সময়ে দেশ দুটি সীমান্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সময়োপযোগী ছবি সাধারণ দর্শকদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সরকারি পর্যায়েও ছবিটি অত্যন্ত প্রশংসিত হয়। এ ছবির প্রযোজক ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। প্রথম ছবি ‘রাত ভোর’ (১৯৫৫)-এর ব্যর্থতায় মৃণাল তখন অনেকটাই বিপর্যস্ত। এ সময় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর যোগাযোগ হয় এবং তিনিই তাঁকে আবার চলচ্চিত্রে নিয়ে আসেন।
তবে তৃতীয় ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ (১৯৬০)-এর মধ্য দিয়েই মৃণাল সেনের প্রকৃত যাত্রা শুরু। এ ছবি দেশে বিদেশে সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মৃণাল সেনও বলতে গেলে বাইশে শ্রাবণেই স্বমহিমায় আবির্ভূত ও প্রতিষ্ঠিত হন।
মৃণাল সেন স্নাতক পর্যায়ে পদার্থ বিদ্যার ছাত্র ছিলেন। ফিজিঙ পড়তে গিয়েই সাউন্ডের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ক্রমশঃ ফিল্ম সাউন্ডে। পড়াশোনার শেষে কলকাতার অরোরা ফিল্ম কোম্পানিতে সাউন্ড রেকর্ডিং শিখতে যান। দু’মাস ছিলেন সেখানে। আর যেতেন ইমপিরিয়াল লাইব্রেরিতে। সেখানে সাউন্ড নিয়ে যত বই ছিল সব পড়েছেন। কিছুদিন ধীরেন্দ্র নাথ গাঙুলির (ডিজি) সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন। বন্ধু বংশী চন্দ্রগুপ্তের সূত্রে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বিশ্বসেরা ছবিগুলো দেখেছেন। কলকাতার উপকণ্ঠে একটি ভাঙাচোরা চা দোকান, যার নাম ছিল প্যারেডাইস ক্যাফে, সেখানে আড্ডা দিতেন তিনি, ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরী, হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়, তাপস সেন, বংশী চন্দ্রগুপ্ত। পরবর্তীকালে যাঁরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে মহীরূহ। ১৯৪৮ সালের কথা। তাঁরা ঠিক করলেন সবাই মিলে একটি ছবি করবেন সুন্দরবনের বাকদ্বীপে গিয়ে। সলিল গল্প লিখলেন, ঋত্বিক ভাঙা একটা ক্যামেরা যোগাড় করলেন, চিত্রনাট্য লিখলেন মৃণাল, কথা হলো আলো করবেন তাপস আর সম্পাদনা করবেন হৃষিকেশ। জমির লড়াই নামের সে ছবিটা আর করা হয়নি বটে, তবে সে চিন্তা ভাবনার বীজ পরবর্তীকালে অঙ্কুরিত হয়ে বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
চলচ্চিত্র সাহিত্যেও মৃণাল সেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন। লিখেছেন চলচ্চিত্র বিষয়ক বেশ কয়েকটি গ্রন্থ। চার্লি চ্যাপলিন, আমার চ্যাপলিন, সিনেমা আধুনিকতা, আমি এবং চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্র ভূত বর্তমান, ভবিষ্যৎ, ভিউজ অন সিনেমা, আমি ও আমার সিনেমা যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। লিখেছেন আত্মজীবনী- অলওয়েজ বিইং বর্ন। অন্যদের জন্যে চিত্রনাট্য লিখেছেন, কাঁচ কাটা হীরে (অজয় কর), জোড়াদীঘির চৌধুরী পরিবার (অজিত লাহিড়ী)। টেলিভিশনের জন্যেও কাজ করেছেন। ১৯৮৪ সালে নির্মাণ করেন টেলিফিল্ম ‘তসবির আপনি আপনি’ (হিন্দি) এবং ১৯৮৬ থেকে ৮৭ পর্যন্ত নির্মাণ করেন ‘কভি দূর কভি পাস’ নামের একটি টেলিফিল্ম সিরিয়াল যাতে ১৩টি ২৩ মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ছিল হিন্দিতে। টেলিভিশনে তাঁর পুরো কাজটাই অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছিল।
আবিষ্কার করেছেন অনেক শিল্পী কলাকুশলী, যাদের মধ্যে মাধবী মুখোপাধ্যায়, রণজিৎ মল্লিক, মমতা শংকর, মিঠুন চক্রবর্তী, দেবরাজ রায়, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় অন্যতম।
ডকুমেন্টরি করেছেন চারটি; মুভিং পারসপেকটিভ (১৯৬৭), ত্রিপুরা প্রসঙ্গ (১৯৮২), ক্যালকাটা, মাই এলডোরাডো (১৯৮৯) এবং অ্যান্ড দ্য শো গোজ অন (১৯৯৭)। শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন রবীন্দ্রনাথের কাহিনীতে ‘ইচ্ছাপূরণ’ (১৯৭০)।
১৯৬৬ সালে ওড়িয়া ছবি ‘মাটির মনিষ’- এর সূত্রে তাঁর আন্তর্জাতিক সংযোগের সূচনা। এক সময় নামকরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর অনেকটা অপরিহার্য জুরিতে পরিণত হয়েছিলেন। কান, বার্লিন, ভেনিস, মস্কো, মন্ট্রিয়ল, লোকার্নো, শিকাগো, টোকিওে, তেহরানসহ অনেক উৎসবের বিচারক হয়েছেন একাধিকবার। নিজের ছবি নিয়ে সারা বিশ্বে ভ্রমণ করেছেন। তাঁকে নিয়ে জার্মান চলচ্চিত্রকার রাইনহার্ড হউফ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন ‘টেন ডেজ ইন ক্যালকাটা’ নামে।
মৃণাল সেনের ১৬টি চলচ্চিত্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় পদ পদ্মশ্রী, পদ্মবিভুষণসহ পেয়েছেন চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান লাইভটাইম অ্যাচিভমেন্ট ‘দাদাসাহেব ফালকে অ্যাওয়ার্ড।’ ফ্রান্স থেকে পেয়েছেন ‘কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস’ এবং রাশিয়া থেকে ‘অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ’। নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গও তাকে নানাভাবে সম্মানিত করেছে।
মৃণাল সেন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের আখ্যান তৈরির জন্যে গেছেন সাহিত্যের কাছে। বিভিন্ন ভাষার কথা সাহিত্যি তাঁর চলচ্চিত্রে মূর্ত হয়ে উঠেছে। উর্দু, হিন্দি গল্প নিয়ে ছবি করেছেন বাংলা, তেলেগুতে। তেমনি বাংলা গল্পে ছবি করেছেন হিন্দি, মারাঠি, ইংরেজি ও ফরাসিতে। বৈশ্বিকতায় বিশ্বাসী এই শিল্পী ঘর এবং বাহিরকে একাকার করতে চেয়েছেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে। তাঁর কলাকুশলীদের দিকে তাকালেও তা পরিলক্ষিত হয়।
চলচ্চিত্র গবেষক ঈশ্বর চক্রবর্তী বলেন, ‘মৃণাল সেনের ছবি ক্রমশঃ যেন একটি একটি ক্যাপসুলের মতো হয়ে উঠেছে, যার ক্ষুদ্র পরিসরের মধ্যে ধরা পড়েছে বিশ্ব সমাজের রূপ গুণ স্বভাব চরিত্র, মানুষের অগণিত জিজ্ঞাসা। শুধু বিষয় উৎকর্ষে না, তাঁর শিল্পের প্রসাদ গুণও ক্রমশঃ শৈলী আঙ্গিক প্রতিন্যাসের অমেয় শক্তি বিকশিত করেছে। তাঁর ছবিগুলো জীবন-জগতে, চলচ্চিত্র জগতে, শিল্পের জগতে যেন দার্শনিক পরিক্রমা- ক্রমবিন্যাসে ক্রম পরিণতিতে যেন দিশারীর মতো। শিল্পী হিসেবে যেন তিনিও ক্রমশঃ খুঁজে চলেছেন তাঁর পথ, পথ রচনাও করে চলেছেন অনুসন্ধানীদের জন্য’।
দীর্ঘ বিরতিতে ছিলেন মৃণাল সেন ২০০২ সালের পর থেকে। একবার ‘ভুবনেশ্বরী’ নামের একটি ছবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দিলীপ কুমারকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে নির্বাচন করে। কিন্তু কাজ শুরু করেননি। অনেক অনুরোধ উপরোধেও চলচ্চিত্র নির্মাণে আর উদ্যোগী হলেন না। শেষদিকে লেখালেখি করেছেন। লিখেছেন আত্মজীবনী।
২০১৭ সালে তিনি হারান স্ত্রী গীতা সেনকে। যিনি ছিলেন তাঁর প্রেমিকা, কর্ম ও চিন্তার নিত্য সঙ্গী যৌবনের শুরু থেকে। সর্বার্থেই সহধর্মিনী। গীতা সেন উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের একজন প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী। মৃণাল সেনের ছবির আগে ঋত্বিক ঘটকের নাগরিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। একদিন প্রতিদিন, চালচিত্র, আকালের সন্ধানে, খণ্ডহর, খারিজ গীতা সেনের অসাধারণ অভিনয়ের স্মারক হয়ে রয়েছে। মৃণাল সেনের ছবির কস্টিউম ও প্রপসের দিকটিও দেখতেন তিনি। গীতার প্রয়াণের পর মৃণাল সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। একমাত্র পুত্র কুনাল দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন দেশে প্রবাসী। শেষদিকে স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বিদায় নিলেন ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮-এর সকালে কলকাতার ভবানীপুরের বাসভবনে দীর্ঘজীবন ও কর্মের পরিভ্রমণের শেষে যার সূচনা ফরিদপুরে। আজীবন আড়ম্বরহীন জীবন যাপনের শেষে তাঁর শেষকৃত্যটিও (১ জানুয়ারি ২০১৯) ছিল অত্যন্ত সাদামাটা, একজন সাধারণ মানুষের মতো, তাঁরই নির্দেশানুসারে। আর এই সঙ্গে অবসান হলো বাংলা চলচ্চিত্রের তিন মহীরূহের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক মহাযুগের।

x