মূল খনন কাজ শুরু আগামী মাসে

বোরিং মেশিন প্রস্তুত, শেষ মুহূর্তে চলছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা

এম নুরুল ইসলাম, আনোয়ারা

মঙ্গলবার , ২২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:১৮ পূর্বাহ্ণ
2458

কর্ণফুলী নদীর দুই পারে পতেঙ্গা ও আনোয়ারা অংশে টানেল এলাকায় রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা চলছে কাজ। এতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। কোথাও পাইলিং, কোথাও যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানো কিংবা কোথাও চলছে খনন কাজ। ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে পতেঙ্গা প্রান্তে একটি ৩৩ কেভি ও দুটি ১১ কেভি ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারিতেই শুরু হবে নদীর তলদেশ খননের মূল কাজ।
সূত্র জানায়, আনোয়ারা প্রান্তে দুই মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ শেষ হয়েছে। দুই প্রান্তে চলছে পাইলিং, মাটি সরানো ও মাটি শক্ত করার নানা প্রক্রিয়া। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে আড়াইশ কনসালটেন্টসহ একহাজার শ্রমিক দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
সূত্র জানায়, নদীর তলদেশে বোরিং মেশিন (টিবিএম) দিয়ে খননের মূল কাজ শুরু করতে যেসব অবকাঠামো দরকার তার ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। খননের জন্য ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ২৫ মিটার গভীরতা সম্পন্ন ওয়ার্কিং শেফটের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এ ওয়ার্কিং শেফটেই বোরিং মেশিন বসিয়ে খনন কাজ করা হবে। এছাড়া ভূ-গর্ভস্থ অবকাঠামো ধরে রাখতে ১২ দশমিক ২ মিটার ডায়াফ্রাম ওয়ালের মূল অবকাঠামোর নির্মাণ কাজও প্রায় সম্পন্ন। পাশাপাশি উভয় পারে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি জেটি।
বিশেষজ্ঞরা জানান, মূল বোরিং কাজ শুরু করা হলে তা বন্ধ করা যায় না। এ কারণে প্রস্তুতিতে যাতে কোনো ঘাটতি না থাকে সেদিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। নদীর তলদেশে খননের কাজ শুরু না হলেও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো মিলিয়ে ইতোমধ্যে টানেল প্রকল্পের ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে জানান প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ কাজের যৌথভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের রাষ্ট্রপতি শিং জিনপিং। তখন থেকে দুই বছরের বেশি সময় হয়ে গেলেও মাঝখানে বিভিন্ন কারণে কাজের গতি ছিল শ্লথ। গত জুলাই মাসে খননের মূল যন্ত্র টিবিএম বাংলাদেশে আসার পর কাজের গতি বেড়েছে কয়েকগুণ। চীনের সাংহাই বন্দর থেকে জাহাজের মাধ্যমে টিবিএম মেশিনটি দেশে পৌঁছে। বিশাল এই খনন যন্ত্রটি খোলা পার্টস আকারে আনা হয়। এক বছর আগে মেশিনটির যন্ত্রাংশ আসার কথা থাকলেও বার বার তা পিছিয়ে যায়। যার ফলে মূল খনন কাজ শুরু করতে দেরি হয়ে যায়।
গত মার্চ মাসে সেতু প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চীনের জিয়াংসু প্রদেশের চাংশু শহরে টিবিএম মেশিনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে আসেন। চট্টগ্রামে এনে এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জোড়া লাগাতে লেগেছে ৪ মাসেরও বেশি সময়। ২৫০ ফুট বা ৯২ মিটার দৈর্ঘ্য এ মেশিনের ব্যাস ১২ মিটার। এটির উচ্চতা একটি চারতলা ভবনের সমান। দৈত্যাকার এই যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিদিন ছয় থেকে সর্বোচ্চ আট মিটার পর্যন্ত নদীর তলদেশে বোরিং করা যাবে।
কর্ণফুলী টানেলর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, ‘কর্ণফুলী টানেল বাংলাদেশের প্রথম টানেল। যে কারণে বেশ সতর্কতার সঙ্গে এর কারিগরি কাজগুলো করতে হচ্ছে। বোরিং মেশিন ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামোগত কাজও শেষ। আশা করি আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে নদীর তলদেশে মূল খনন কাজ শুরু করা যাবে।’
সরেজমিন দেখা যায়, নদীর উত্তর পাড়ে পতেঙ্গার বিশাল এলাকা টিন দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রবেশাধিকারও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। প্রকল্পে চারটি খননযন্ত্রের মাধ্যমে চলছে ড্রেজিং কাজ। শেষ হয়েছে ডিএপি সার কারখানা ও কাফকোর মাঝামাঝি মাঝের চর এলাকায় প্রকল্পের সাইট অফিস, আবাসস্থল ও যন্ত্রপাতি রাখার জন্য মাটি ভরাটের কাজ। একইভাবে নদীর উত্তরপাড়ে পতেঙ্গায় নির্মাণ সরঞ্জাম রাখা ও আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণে চীন থেকে এসেছে দুই জাহাজ উপকরণ।
প্রস্তাবিত টানেল চট্টগ্রাম বন্দরনগরীকে কর্ণফুলী নদীর অপর অংশের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করবে এবং পরোক্ষভাবে ঢাকা চট্টগ্রাম কঙবাজার মহাসড়কের মাধ্যমে সারাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় কাফকো পতেঙ্গা পয়েন্টে টানেলটি নির্মাণ করা হবে। এটি নদীর পশ্চিম পাশে সি বিচের নেভাল গেট পয়েন্ট থেকে নদীর ১৫০ ফুট নিচ দিয়ে অপর পাশে গিয়ে উঠবে। দক্ষিণ পার থেকে সংযোগ সড়ক দিয়ে টানেলটি বাঁশখালী সড়কে গিয়ে মিলবে। নদীর তলদেশে এর গভীরতা হবে ৩৯ ফুট (১২ মিটার) থেকে ১১৮ ফুট (৩৬ মিটার)। মোট দুটি টিউব নির্মিত হবে। এর একটি দিয়ে গাড়ি শহরপ্রান্ত থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামে প্রবেশ করবে, আরেকটি টিউব দিয়ে দক্ষিণ প্রান্ত থেকে শহরের দিকে আসবে। টানেলের প্রতিটি টিউব চওড়ায় হবে ১০ দশমিক ৮ মিটার বা ৩৫ ফুট এবং উচ্চতায় হবে ৪ দশমিক ৮ মিটার বা প্রায় ১৬ ফুট। একটি টিউবে বসানো হবে দুটি স্কেল। এর উপর দিয়ে দুই লেনে গাড়ি চলাচল করবে। পাশে হবে আরো একটি টিউব। মাঝে ফাঁকা থাকবে ১১ মিটার। যেকোনো বড় যানবাহন দ্রুত ও খুব স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারবে এই টানেল দিয়ে।
সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, ১০ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ করতে ৫ বছর সময় লাগতে পারে। তবে মূল কাজ ৪ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০২২ সালের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Advertisement