মূত্র নালীর সংক্রমণ

শামীম হাসান

শনিবার , ১ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ
277

আমাদের শরীরে পেটের গভীরে, পিঠের কাছাকাছি এবং মেরুদণ্ডের দু’পাশে (কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালে সাধারণত দুটো বুড়ো আঙ্গুল যে অবস্থানে থাকে সেখানে) দুটো কিডনি বা বৃক্ক রয়েছে। আমাদের প্রতিদিনের শরীর বৃত্তিয় কাজে সৃষ্ট হওয়া সকল বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি ছাঁকনির মতো ব্যবস্থাপনায় শরীর থেকে মূত্র বা প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়াই হলো কিডনীর কাজ। কিডনী একই সাথে শরীরের পানি ও খণিজ লবণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং দেহের এসিড-ক্ষারের মাত্রাও সঠিক রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে কিডনি আমাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও অন্যতম ভূমিকা রাখে।
প্রতিটি কিডনি ইউরেটার নামক সরু নালী দ্বারা তলপেটে অবস্থিত মূত্রথলী বা ব্লাডারের সাথে সংযুক্ত থাকে। কিডনিতে তৈরি হওয়া প্রস্রাব এ দুটো নালীর মাধ্যমে মূত্রথলীতে এসে জমা হয়।প্রস্রাব জমা হয়ে মূত্রথলী পরিপূর্ণ হলেই কেবল মূত্রথলি সংকেত দেয় ও প্রস্রাবের বেগ তৈরি হয়। তখন মূত্রথলী থেকে মূত্রনালীর মাধ্যমে প্রস্রাব শরীরের বাইরে নির্গত হয়ে থাকে। কিডনি থেকে মূত্রনালী পর্যন্ত এই গঠনকে একসাথে ‘ইউরিনারি ট্র্যাক’ বলা হয়। আর সমস্ত বিষয়টিকে ‘রেচন তন্ত্র’ বলে। এই তন্ত্রের কোন অংশের সংক্রমণ্ল্ল্ল্লকে ‘ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন’ বা সংক্ষেপে ‘ইউটিআই’ বলে। অনেকে এবার একে শুধু ‘প্রস্রাবের ইনফেকশন’ বা ‘ইউরিনের ইনফেকশন’ও বলে থাকেন। ইউরিন ইনফেকশন এক বছর বয়সের আগে ছেলে মেয়ে উভয়ের সমান অনুপাতে এবং এর পর থেকে ছেলেদের চাইতে মেয়েদের ৩-৪ গুণ বেশি পরিমাণে হয়ে থাকে। ছেলেদের খৎনা করানো হলে ইনফেকশনের হার কমে যায়।
শরীরের নিম্নাঙ্গ বা ‘পেরিনিয়াম’ হলো দু’পায়ের ভাঁজে শরীরের তলদেশের অংশটুকু-এখানে অনেকগুলো অঙ্গের কাছাকাছি অবস্থান রয়েছে। ছেলেদের বেলায় এখানে অবস্থান করে পায়ু ও মূত্রনালির মুখ বা ‘ইউরেথ্রা’ এবং মেয়েদের বেলায় পায়ু, মূত্রনালির মুখ ও যোনীপথ। মেয়েদের যোনীপথ ও মূত্রনালী খুবই কাছাকাছি থাকে। আবার লিঙ্গের আকারভেদে ছেলেদের মুত্রনালির দৈর্ঘ্য মেয়েদের চেয়ে বড়। তাই পেরিনিয়ামের যে কোন জীবাণুর উপস্থিতি ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের মূত্রনালির অভ্যন্তরে প্রবেশের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা বেশী থাকে। সাধারণত ইউরিনারী-ট্র্যাকের ভিতর কোন জীবাণু থাকে না। কিন্তু যোনী পথ বা পায়ুপথে অবস্থানরত বা ওখানে নতুন করে সংক্রামিত কোন ব্যাক্টেরিয়া যদি সুযোগমতো ইউরিনারী ট্রাকে প্রবেশ করে তখনই প্রস্রাবের ইনফেকশন বা ‘ইউটিআই’ হয়ে থাকে।
ছোট শিশুদের একাধারে ডায়াপার পরিয়ে রাখলে এই সংক্রমণের মাত্রা সংগত কারণেই বেড়ে যাবে। কেননা শিশুর ত্যাগ করা মলমূত্র এখানে অনেক সময় অবস্থানের কারণে জায়গাটি স্যাঁতস্যাতে হয়ে যায় যা জীবাণুর জন্মলাভের জন্য উপযোগী। তখন একই সাথে ছত্রাকের সংক্রমণের পরিমাণও এখানে বেড়ে যায়।
আবদ্ধ ওই স্থানটিতে জীবাণুরা অনায়াসে তখন মুত্রনালী বেয়ে শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ও প্রস্রাবের ইনফেকশন ঘটায়। একই কারণে শিশুর মলদ্বার লাল হয়ে জ্বলুনি-চুলকানি, ছেলে শিশুর বেলায় লিঙ্গের সম্মুখ ভাগের চামড়ায় প্রদাহ বা ফাইমোসিস হয়ে প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া, লিঙ্গ ফুলে যাওয়া এবং মেয়ে শিশুর যোনিপথ লাল হয়ে যাওয়া-চুলকানী ডায়াপার ব্যবহার থেকে ঘটে থাকে। বেশী টাইট পেন্টি/প্যান্ট পরলেও একই সমস্যা হতে পারে।
ইউরিনারি ট্র্যাকে প্রবাহমান প্রস্রাবের চেয়ে স্থির (stagnant/ static) প্রস্রাবে ইনফেকশনের হার বেশি হয়ে থাকে। মূত্রথলির মুখের নিয়ন্ত্রণ স্নায়ুর (নার্ভ) সমস্যার কারণে বাধাগ্রস্ত হলে ব্লাডার পুরোপুরি খালি হতে পারে না। এই স্নায়ুজনিত সমস্যাগুলো হলো-নিউরোজেনিক ব্লাডার, এটনিক ব্লাডার, মেনিঙ্গোসিল (জন্মকালে মেরুদন্ডে স্নায়ুর অংশ শরীরের বাইরে চলে আসা), হাইড্রোকেফালাস (মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সার্বক্ষণিক প্রবাহমান জলীয় অংশ বা ‘সিএসএফ’ সঞ্চালনের কোন স্থানে ব্লক হওয়ার কারণে মাথার আয়তন বেড়ে যাওয়া)।
কোন জন্মগত ত্রুটি বা ব্লকের জন্য প্রস্রাব জমে গেলে ব্যাকটেরিয়া সহজে ইনফেকশন ঘটাতে পারে। খৎনা না করা ছেলে শিশুদের লিঙ্গের চামড়ায় ইনফেকশন হলে (ফাইমোসিস, প্যারাফাইমোসিস) অথবা তা ব্লক (‘পিন হোল মিয়েটাস’) হলেও একই সমস্যা হয়। জন্মগত ত্রুটির মধ্যে রয়েছে ‘পিইউজে-অবসট্রাকশন’, ‘ইউরেথ্রাল ভাল্ব’, ‘ভেসিকো-ইউরেটাল-রিফ্লাক্স’ জাতীয় নানা সমস্যা। আবার দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখলে বিশেষত যে কোন দীর্ঘ যাত্রায় বা প্রস্রাব করার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকলে বা আব্রুর অভাবে মেয়েদের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক প্রস্রাব করার সমস্যা হলে এই ইউরিন ইনফেকশনের মাত্রা বেড়ে যায়।
কিডনি থেকে তৈরি হওয়া প্রস্রাবের প্রবাহ সবসময় নীচের দিকে অর্থাৎ “কিডনি-ইউরেটার-ব্লাডার-ইউরেথ্রা” হয়ে বাইরে নির্গমন হয়ে থাকে। ইউরেটার ব্লাডারে প্রবেশ করার মুখে একধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকে। ফলে প্রস্রাব উপর থেকে ব্লাডারে প্রবেশ করতে পারে কিন্তু উলটা পথে ব্লাডার থেকে উপরের দিকে ফেরত যেতে পারে না। কিন্তু এই গঠনের ব্যত্যয় ঘটলে প্রস্রাব ব্লাডার থেকে উল্টো পথে ইউরেটারে প্রবেশ করে ও ক্রমে কিডনিতে ফেরত যায়। এই সমস্যাকে ‘ভেসিকোইউরেটাল রিফ্লাক্স’ বলে। এক্ষেত্রে প্রস্রাবের ইনফেকশন, কিডনির ক্ষতসহ নানা সমস্যা হতে পারে।
বাচ্চা যদি কখনো টয়লেটে যেতে অনীহা প্রকাশ করে, বাথরুম পছন্দ না হওয়ার কারণে যদি সে প্রস্রাব চেপে রাখে এবং প্রস্রাব/পায়খানার পর যদি ঠিকমতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজটি না হয় তাহলেও প্রস্রাবের ইনফেকশন হতে পারে। আবার ঘন ঘন বাবল বাথ (বাথটাবে সাবানের ফেনা তৈরি করে দীর্ঘক্ষণ তাতে গা ডুবিয়ে বসে থাকা) করলে এই ইউরিনের ইনফেকশন হয়ে থাকে। যদিও বাবল বাথের প্রচলন এখনো আমাদের দেশে এখনো ভালোভাবে শুরু হয় নি।
উপসর্গ : প্রস্রাবের ইনফেকশন নানা উপসর্গ নিয়ে দেখা দিতে পারে। শিশুরা যেহেতু সব কথা বলতে পারেনা তাই ইউরিন ইনফেকশন হলে অস্বস্তির জন্য তার আচরনগত সমস্যা হতে পারে-সে অস্থির ও খিটখিটে হতে পারে। ইউরিন ইনফেকশন হলে রেচনতন্ত্রের অংশগুলোতে মৃদু যন্ত্রণা হতে পারে। তাই শুধুমাত্র অস্বস্তি বা অস্থিরতা নিয়ে শিশু হাজির হতে পারে। আবার কেবল মাত্র অল্পমাত্রায় বমি বা বমি বমিভাব নিয়ে শিশু উপস্থাপন করতে পারে। তখন রোগ নির্ণয় বেশ ঝামেলার হয়ে থাকে। শুধুমাত্র প্রস্রাবের তীব্র ও ঝাঁজালো গন্ধ (শিশু বাথরুমে গেলে এই তীব্র গন্ধের জন্য অন্যদের সেখানে যেতে অস্বস্তি প্রকাশ পায়) নিয়ে শিশু হাজির হতে পারে। বারবার প্রস্রাব করা, ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব, একটু একটু কাপড় ভিজিয়ে ফেলা, প্রস্রাবের রাস্তায় বারবার হাত দেয়া, প্রস্রাব করতে ব্যথা বা জ্বালা-পোড়া করা, বিছানায় প্রস্রাব করা ইউরিন ইনফেকশনের অন্যতম লক্ষণ। কখনো কখনো প্রস্রাবের সাথে রক্তও দেখা দিতে পারে। শিশুর ক্ষুধা মন্দা, মাথা ঘোরা, জ্বর জ্বর ভাবসহ কাঁপুনি হতে পারে। সাধারণত শুধুমাত্র প্রস্রাবের ইনফেকশনের কারণে শিশুদের খুব কমই জ্বর হয়ে থাকে, তবে ইনফেকশন কিডনী পর্যন্ত ছড়ালে তীব্র জ্বরসহ পেটে, পাঁজরে ও কোমরে ব্যথা হতে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রস্রাবের ইনফেকশন থেকে কিডনীর নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে, কিডনী নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
রোগ নির্ণয় : সারারাত ধরে ঘুমের মধ্যে জমানো ‘সকাল বেলার প্রথম প্রস্রাব’ পরীক্ষা করলে সবচেয়ে ভালো হয়। সে ক্ষেত্রে প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, ‘কালচার-সেন্সিটিভিটি-কলোনী কাউন্ট’ পরীক্ষা করানো সবার আগে প্রয়োজন। প্রস্রাব সংগ্রহ করার পদ্ধতিতে ভুল হলে রিপোর্টে তার প্রভাব পড়বে। তাই বাসা থেকে সংগ্রহ না করে পরীক্ষাগারে তা প্রদান করলে রিপোর্ট ভালো হবে। তাছাড়া কিছু সংগ্রহ পদ্ধতি মেনে চললে এই পরীক্ষায় ভুলের সম্ভাবনা কমে যায়। এ ছাড়া বাকী সব পরীক্ষা লক্ষণভেদে করা হয়ে থাকে। যেমন রেচনতন্ত্রের আলট্রাসনোগ্রাফী, প্রস্রাব করারত অবস্থায় বিশেষ ধরনের এক্সরে (Micturating Cystourethrogram), রেনাল স্কেন, রেনাল ফাংশন টেস্ট এবং এ ছাড়াও মূল কারণ নির্ণয়ের জন্য আরো নানাবিধ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
সাধারণত কালচার রিপোর্ট দেখে ঔষধ দেয়া ভালো। মোট দশদিন ওষুধ সেবনের আরো দু’সপ্তাহ পর পুনরায় কালচার করা হয়ে থাকে। কখনো কখনো ‘ক্রনিক ইনফেকশন’ আবার কখনো ‘রিকারেন্ট ইনফেকশন’ (বারবার ইনফেকশন হওয়া) দেখা দিতে পারে। তখন চিকিৎসা জটিল আকার ধারণ করতে পারে। কখনো হাসপাতালে ভর্তি করে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি পান করলে, নিয়ম মাফিক বেগ হলে ধরে না রেখে প্রস্রাব করলে ইনফেকশনের মাত্রা কমে যায়। শিশুরা খেলার সময় পার হয়ে যাবে এ আশংকায় তাড়াহুড়া করে সম্পূর্ণ শেষ না করে প্রস্রাব করে থাকে। তাই শিশুকে প্রস্রাব করার সময় অধিকক্ষণ বসিয়ে রেখে প্রস্রাব শেষ করতে বলার নির্দেশ দিতে হবে, দশ মিনিট পর পুনরায় প্রস্রাব করতে বসাতে হবে (টয়লেট ট্রেনিং)। ঢিলা পোশাক পরিধান করা, কোষ্টকাঠিন্য হতে না দেয়া, সুতাক্রিমি হলে সাথে সাথে চিকিৎসা করা, মল পরিষ্কারের সময় পিছন থেকে তা পরিষ্কার করা (বিশেষত মেয়েদের বেলায়), প্রতিবার প্রস্রাব করার পর ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করার পর শুকনো করে মুছে দেয়া খুব জরুরি। তাহলে প্রস্রাবের সংক্রমণ রোধ করা যাবে।

লেখক : চিকিৎসক; প্রফেসর, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

x