মুখপোড়া কাল্লুচোরা

সৌরভ শাখাওয়াত

বুধবার , ৪ জুলাই, ২০১৮ at ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ
52

কালু ।

চুরি করে বলে লোকে ডাকে কাল্লুচোরা।

চুরিবিদ্যার ঢালাও ব্যবহারে গেহস্তের বাড়ির হেন কোন পণ্য নেই যা ওর হাতে হাফিস হয়নি। রান্নাঘরের বাসনকোসন, গোয়ালঘরের গরুছাগল, মা বোনের শড়িগহনা, বাবার শার্ট পাজামা, উঠেনের ডাবনারকেল, ক্ষেতের শাক সবজি কী চুরি করেনি কালু। কালুর ওস্তাদ দুই ’চোর চক্কোত্তি’ মানে পাকা চোর আন্দু চোর ও তার শিষ্য গেন্দু চোর। এই দুই ওস্তাদের শিক্ষার মূলমন্ত্র ছিলো– ’চুরি বিদ্যা বড়ো বিদ্যা যদি ধরা না পড়ে’। কতো বিদ্যা শিখিয়েছিলো তার ওস্তাদযুগল হস্তলাঘব, বায়ুনিয়ন্ত্রক, কুম্ভক আরো কতো কী! এত বিদ্যা রপ্ত করে অস্থির কালু এ বিদ্যা প্রয়োগ করার জন্য প্রথম রাতে একাই হানা দিতে গিয়েছিলো ব্যানার্জী বাবুর ছেলের বিয়ে বাড়িতে । বিয়ে বাড়ির পেছনের ভিটে খুঁড়ে সিঁদ কেটে ঢুকতে চেয়েছিলো ঘরের ভিতর। কিন্তু বিধি ছিলো বাম লগ্নের অপেক্ষায় জেগেছিলো বাড়ির লোকজন । কালুর সিঁধ কাটার শব্দ টের পেয়ে মশালের আগুন নিয়ে ওঁত পেতে বসেছিলো বাড়ির লোকজন। সিঁেধর মূখে কালু মাথা ঢোকাতেই ঝলসে দিয়েছিলো তার মুখ। তারপর ধরে বেঁধে থানায় দারোগার হাতে সোপর্দ করেছিলো। সেই থেকে তার নাম রটে গিয়েছিলো মূখপোড়া কাল্লুচোরা।

জেলের ভেতর হাজার হাজার চোর গাঁটকাটার আসরে কালুর জীবনের গল্প বলতে বলতে বুড়ো গিট্টুচোর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো

হ্যাঁ , আজ ও চোর । মানুষ নয়। আজ ওকে আর কেউ ডাকে না, বসতে বলে না, দেখা হলে চেঁচায় ’ ওরে কে কোথায় আছিস , সাবধান কাল্লুচোরা আসছে। ’

অথচ ওকে নিয়ে কতো স্বপ্নছিলো ওর বাবার

কালু ছিলো পলাশডাঙ্গা গাঁয়ের লালু কুমারের ছেলে।

অমাবস্যার ঘুটঘুটে লগ্নে বিশ্বকাপ ফুটবল মৌসুমে কালুর জন্ম। ব্রাজিল সমর্থক কালুর বাবা ব্রাজিলের স্বনামধন্য ফুটবলার কালো মানিক পেলের নামের সাথে মিলিয়ে তার নবজাতকের নাম রাখে কালু । বিশ্বকাপ খেলার তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে বেধড়ক মার খেয়ে প্রাণ হারায় কালুর বাবা লালু। শেকে দু:খে হৃদ যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে লালুর মাও চলে যান ওপারে। এ জগতে লালুর আপন বলে কেউ না থাকায় চাচার আশ্রয়ে থাকা ছাড়া তার আর কোন পথ থাকেনা । লালু আশ্রয় নেয় চাচার বাড়িতে । চাচার গরু চড়ায়, ঘাস কাটে, মাঠে ধান গাছ লাগায় , পাকা ধান কাটে ,গরুর দুধ বাজারে নিয়ে বিক্রয় করে আর গরুকে ঘাস ও খৈল খাওয়ায় । এত্তসব কাজ করতে করতে বেলা শেষ হয়ে যায়। বিনিময়ে কালু পেটে জোটে দু’মুঠো ভাত।

কালুর বাবার স্বপ্ন ছিলো কালু স্কুলে যাবে । মানুষের মতো মানুষ হবে হেসে খেলে। ব্রাজিলের স্বনামধন্য ফুটবলার কালো মানিক পেলের মতো একদিন অনেক বড়ো ফুটবলার হবে। বড়ো গৌরবে মাথা উঁচু করে বিশ্ববাসীর কাছে দেশের নাম তুলে ধরবে। কাজের চাপে ওসব স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।

একদিন সকাল বেলা বানির হাটে দুধ বিক্রয় করে ফেরার পথে কালু দেখা পায় তার বন্ধু শুভ, শুভ্র মণি ও সোমার সাথে । ওরা কী সুন্দর ছড়া কেটে কেটে স্কুলে যায়

তাই তাই তাই

মিলে মিশে হেসে খেলে

ইশ্‌কুলে যাই ।

তাই তাই তাই

আঁধারের বুক চিরে

আলো জ্বেলে যাই।

তাই তাই তাই

লিখে পড়ে মাথা তুলে

বড়ো হতে চাই। ”

কালুর বুকের ভেতর চিন চিন করে । তার ঘুমন্ত স্বপ্ন জেগে কন্ঠে বেজে ওঠে ছড়ার সুর ু

তাই তাই তাই

লিখে পড়ে মাথা তুলে

বড়ো হতে চাই..’

কালু বন্ধুদের সাথে ছুটে যায় স্কুলে । স্কুলের গেইটে দারোয়ানের বাধা পেয়ে সু্কলে ঢ়ুকতে পারে না কালুস্কুলে ভর্তি না হলে যে স্কুলের করিডোরে যাওয়া যায় না। কালু থমকে যায় । তার দু’চোখ বেযে টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ে জল । অলস পা ফেলে ফিরে যায় ঘরে। ঘরে পা দিতেই চাচীর বাজখাই গলা বাজার থেকে ফিরতে দেরী করার কফিয়ত । স্কুলের কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে চাচী । খামার থেকে ডেকে আনে কালুর চাচাকে । কালুর কান্ড শোনায় অদ্যপান্ত । চাচা শুনেই কালুর পিঠে লাগায় উত্তম মধ্যম ।অবশেষে অর্ধচন্দ্র দিয়ে বের করে দেয় ঘর থেকে । লালুর চোখে জল টলমল । কষ্টে পাথর কালু আনমনে হাঁটতে থাকে গাঁয়ের মেঠোপথ আর ধানক্ষেতের আঁকা বাঁকা আলপথে ধরে অজানার পথে। হাঁটতে হাঁটতে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা আসে নামে অন্ধকার । ক্লান্ত কালুর পথচলা থেমে যায় পোড়াবাড়ি দেখে। পোড়াবাড়ির সামনে অর্ধভগ্ন বড় বড় থাম। বট অশ্বথের শেকড় জড়িয়ে আছে আষ্টেপৃষ্ঠে । চিলেকোঠায় সবুজ ঘাস , আগাছা উদ্ভিদ।বাড়িটার সামনে বড় বড় থাম আর বটগাছ। মানুষ থাকেনা বলে ওটা এখন ইঁদুর ছুঁচোর দখলে। কালু রাতটা কাটাতে চায় এইখানে। ধপাস করে বসে পড়ে বটগাছটার নীচে। তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে তার অঘোর ঘুম নেমে আসে।

রাত বাড়ে । আকাশে পুর্ণিমার চাঁদ আর তারার মেলা। চঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে মহুয়া পাতায়। চেউর বাঁশ আর খাগড়ার বনে বাতাসের উলুঝুলু। বটগাছ থেকে একটা হুতুম পেচা আছড়ে পড়ে আঁকপাঁক করে। কালুর ঘুম ভেঙ্গে যায়। কালু চোখ মেলে ফের ভয়ে চোখ বোঝে। চোখ বুঝতেই কালুর কানে আসে ফিস ফিস শব্দ।শব্দটা আরো সপষ্ট হয় পোড়াবাড়ি হতে । কালু চোখ মেলে দেখে দুটি ছায়া পা টিপে টিপে পোড়াবড়ি হতে বের হচ্ছে । কালু ভয়ে আবার চোখ বন্ধ করে।

গহীন রাত। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর শেয়ালের হুক্কাহুয়ায় মুখরিত পরিবেশ।পোড়াবাড়িটার চিলেকোঠায় সবুজ ঘাস, আগাছা উদ্ভিদ।বাড়িটার সামনে বড় বড় থাম আর বটগাছ । মানুষ থাকেনা বলে ওটা এখন ইঁদুর ছুঁচোর দখলে। এই বাড়িতে থাকে চোর চক্কোত্তি মানে পাকা চোর আন্দু চেরি ও তার শিষ্য গেন্দু চোর। চুরিতে চারিদিকে ওদের বেশ নাম ডাক। পাঁচ গাঁয়ের মানুষজন ওদের দেখা পেলেই হাতের কাছে যা কিছু জিনিস তা সামলায়। রাত ঘনিয়ে এলে চুরির যাবতীয় প্রস্তুতি শেষে গেহস্তের বাড়িতে হানা দেয় এই দুই চোর। হাতে মাশাল রাখে। গেরস্থের বাড়ির লোকজন ‘চোর’ ‘চোর’ করে তাড়া করলে ভাব বুঝে ওরাও মশাল জ্বালিয়ে ওদের দলে ঢুকে পড়ে।

পোড়াবাড়ি হতে পা টিপে টিপে বের হতেই পুরানো বটগাছটার নীচে ওরা কালুর ছায়া দেখে। গেন্দু বুকে থুথু দিয়ে মন্ত্র পড়ে বিড় বিড় করে। আন্দুর কোলে লাফিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরে কাঁপতে থাকে ’ভূত’ বলে। গেন্দুকে কোল থেকে নামিয়ে আন্দু ভয় না পাওয়ার ভাব দেখায়

: হুম! হতে পারে ভুত ।

ব্যাটা মানুষের রুপ ধারণ করে আমাদের যাত্রাপথে বাধা দিতে এসেছে ।

: এখন উপায় কি ওস্তাদ?

: ভয় নাই, মশালে আগুন জ্ব্বালা । ভুত হলে আগুন দেখে ভয় পেয়ে পালাবে।

: আগুন জ্বেলেছি ওস্তাদ।

: এবার এগিয়ে চলো সামনের দিকে।

কালুর দিকে ছুটে আসতেই আঁতকে ওঠে কালু

: কে? কে? কে তোমরা ?

: আমরা চোর

: চো

: হ্যাঁ চোর । আমি আন্দু ও গেন্দু ।

তা তুমি কে? এতো রাতে এইখানে কেন?

: আমি কালু মা বাবাহারা এক অসহায় মানুষ ।

গেন্দু তড়াক করে লাফিয়ে বুকে থু থু দেয়

: ধুর ছাই মিছেমিছি ভয় পাই

ওস্তাদ মানুষ,মানুষ ভয় নাই !

: হুম। তা এতোরাতে এইখানে কেন?

কালু খুলে বলে তার সব ঘটনা। কালুর চোখভরা ছল ছল জল গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। চোখের জল মুছে আন্দু ও গেন্দু ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে।আন্দু ও গেন্দু কালুকে চুরি বিদ্যায় পারদর্শী করে মাথা তুলে দাঁড়াবার সাহস দেয়। প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ আর প্রতিরাতে চুরিবিদ্যার চর্চায় কালু হয়ে ওঠে পাকা চোর । প্রথমদিন অবশ্য অতি উৎসাহী হয়ে ব্যানার্জী বাড়িতে একাই হানা দিতে গিয়ে মশালের আগুনে মুখটা ঝলসে জেলের ভাত খেতে হয়েছিলো। ছিঁচকে চোর ভেবে থানার দারোগা বাবুর দয়ায় ছাড়া পেয়ে সে এখন সাবধানে পা ফেলে।

সর্ষের তেল মাখা লিকলিকে প্যাঁকাটি শরীরে কালু বেরিয়ে পড়ে রাতে এ বাড়ি ও বাড়ি খোঁজ নেয় । সুযোগ বুঝে হানা দেয় ওস্তাদদের নিয়ে। আজ অমামাবস্যার ঘুটঘুটে লগ্ন । কালুর চোখে পড়ে কালুর বাপের ভিটেএই বাড়ি এখন চাচার দখলে। এ বাড়িতে ও জন্মেছে । এ বাড়িতেই ওর মা বাবার কবর । কালুর ভেতরের মানুষটা হঠাৎ জ্বলে ওঠে । ও হয়ে ওঠে দুধর্ষ চোর।আন্দু , গেন্দু ও কাল্লু চোরা নামে চুরির অভিযানে। রাতেই হানা দেয় ও বাড়িতে। হাতিয়ে নেয় চাচীর গহনা ,টাকা আর গোয়ালের গরু। ভিনগাঁয়ে পাড়ি দেয় রাতে। বিলিয়ে দেয় টাকা, কড়ি, সোনা গয়না কালুর মতো গরীব অসহায় শিশুদের মাঝে। লিখে পড়ে বড়ো গৌরবে মাথা উঁচু করো মানুষ হবার স্বপ্ন দেখায় ওদের। কালুর মতো অসহায়, সহজ ,সরল মানুষ আজ পাকা চোর– ’মুখপোড়া কাল্লুচোরা’। সেদিন কেউ যদি ওর পাশে দাঁড়াত , একটু ওকে ভালবাসতো , দ’মুঠো ভাত খেতে দিতো আপন ভেবে ,তাহলে সেইদিনের অসহায় ছেলেটা আজ আর ’চোর চেক্কোত্তি’ হতোনা।

x