মূকাভিনয় চর্চায় সৃজনশীল সংযোজন

মাসউদুর রহমান

মঙ্গলবার , ১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ
22

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের মূকাভিনয় চর্চার সবচেয়ে বড় এবং হাই প্রোফাইল আয়োজন মাইম ডিরেক্টরস্‌ মিট ২০১৮ অনুষ্ঠিত হলো গত বছর নভেম্বরে। দুই বাংলার স্বনামধন্য মূকাভিনয় নির্দেশকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে সংগঠিত দু’ দিন ব্যাপী এই মূকযজ্ঞের আয়োজক ছিল বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশান। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মূকাভিনয় নিয়ে স্বতন্ত্র জার্নাল ‘মাইম ডিরেক্টরস্‌ মিট ২০১৮ জার্নাল’ প্রকাশ করে বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশান, রংপুরে অনুষ্ঠিত ডিরেক্টরস্‌ মিটের প্রথম দিনে এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের সর্বমোট ২১ জন মূকাভিনয় নির্দেশক, নাট্যকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকের লিখিত প্রবন্ধে সমৃদ্ধ এই জার্নালে মূকাভিনয়ের গল্প নির্মাণ, উপস্থাপনা কৌশল, মূকাভিনয়ের বিশ্বায়ন, আঙ্গিক ভাষা, থিয়েটার ও মূকাভিনয় ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা ও অভিজ্ঞতালব্ধ লেখা প্রকাশিত হয়।
এখন পর্যন্ত বাংলাভাষায় মূকাভিনয় নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর সাথে এই জার্নালের পার্থক্যের জায়গাটি হলো এই জার্নাল নিছক ইতিহাসের চর্বিত চর্বন নয় অথবা মূকাভিনয়ের টেকনিকগুলোর বিশদ বিবরণ নিয়েও এই জার্নাল নয়। এ জার্নাল ধরেই নিয়েছে ইতিহাসের চর্চা অনেক হয়ে গেছে বা এখনো সেভাবে চর্চার পরিসর তৈরি হয়নি। আর মূকাভিনয়ের এইসব তথাকথিত কৌশল জানেন এমন মানুষের সংখ্যা এখানে নেহাত কম নয়। এখানে যে জিনিসটার অভাব তা হলো এই টেকনিকগুলো প্রয়োগ করা হবে যে গল্পে, সেই গল্পের অভাব। সেই গল্পগুলোতে কোন্‌ সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় প্রয়োগ হবে সেই চিন্তনের অভাব। এই অভাবের জায়গাটিকে পূরণ করার উদ্দেশ্যেই এই জার্নাল প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অত্র জার্নালের প্রথম প্রবন্ধের এক জায়গায় বলা হয়েছে মূকাভিনয়ের গল্পের বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে। মূকাভিনয়ের গল্প, নির্মাণ ও উপস্থাপনা শীর্ষক প্রবন্ধটি লিখেছেন পদ্মশ্রী নিরঞ্জন গোস্বামী। তাঁর ভাষায়-
নির্দেশককে গল্প বাছাই পর্বে দেখতে হয় গল্পটি চরিত্রগুলোর ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের ছোট ছোট সংলাপ কথপোকথনের মধ্য দিয়ে গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কিনা। চরিত্রগুলো নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে বা ঘটনার দীর্ঘ বর্ণনা দিয়ে চলেছে সেখানে নীরব অভিনয় অভিনয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব কিনা নির্দেশক বিবেচনা করে দেখবে। গল্পটিতে শারীরিক প্রতিক্রিয়া এবং মানসিক প্রতিক্রিয়া কতটা পরিমাণ এবং কীভাবে সেগুলো প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আছে তার অভিনেতাদের মূকাভিনয়ের মাধ্যমে।
জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলোতে মূকাভিনয়ের গল্প নির্মাণ ও উপস্থাপন কৌশল বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে। কারণ বাস্তবতা হলো- ভালো গল্পের সংকট আছে সর্বত্র। অনেকেই ভালো গল্প না থাকায় শেষ পর্যন্ত নিজেদের মূকপ্রযোজনাকে একটা ভাঁড়ামির জায়গায় নিয়ে যান। অথচ মূকাভিনয় একটি মহৎ এবং মৌলিক শিল্প। চার্লি চ্যাপলিন, মার্সেল মার্সোর মতো গুণী শিল্পীরা এর চর্চা করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ইস্রাফিল আহমেদ রঙ্গন তার মূকাভিনয়ের গল্প, নির্মাণ ও উপস্থাপনাশৈলী শীর্ষক প্রবন্ধে লেখেন-
বেশীরভাগ মূকাভিনয় শিল্পী মনে করেন মূকাভিনয় মানে দর্শককে হাসানো। এর জন্য অতিমাত্রায় স্থুল অঙ্গভঙ্গি করে থাকে। ফলে মূকাভিনয় শিল্প সম্পর্কে দর্শকের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। আবার অনেকে মনে করেন চার্লি চ্যাপলিন একজন বড় মাপের মূকাভিনেতা। তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে রয়েছে প্রাণখোলা হাসির ঝলক। সত্যিকার অর্থে এটা বাইরের আবরণমাত্র। এ অঙ্গভঙ্গির মধ্যে রয়েছে সমাজের অসঙ্গতি, মানুষের কূপমণ্ডুকতা, নির্মমতা, সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিহাস। কাজেই চার্লি চ্যাপলিনের অভিনয় শুধুমাত্র সরল চোখে দেখলে এর ভিতরকার অর্থ খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না।
একই বিষয়ে জার্নালের অন্য একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে –
সাদা রঙ মেখে দাঁড়ালে দর্শক হৈহৈ করবেই, তারপর যদি একটু ভেংচি কাটেন, আবারো হৈচৈ হবে। একটা ছেলে একটা মেয়ে খুনসুটি করছে- আমদর্শক চিৎকার দিবেই। তার মানে কিন্তু এই না যে, আপনে চমৎকার গল্প ফাঁদছেন। আপনে জাস্ট সুযোগের ফায়দা উঠাইলেন, আর কিছু না। ব্যাপারটা অনেকটা আপনে যদি জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে আপনের গল্প শেষ করেন, স্বাভাবিক কারণেই দর্শক দাঁড়ায়া হাত তালি দিবে। এটা আপনের গল্প বা পারফর্মেন্সের কেরামতি না, কেরামতিটা জাতীয় সঙ্গীতের। গল্পটা অখাদ্য হইলেও জনতা দাঁড়ায়া তালি দিতে বাধ্য। বিপরীতে, আপনের পারফর্মেন্স শেষ, তালি খুব কম পড়লো অথবা পড়লো না, তার মানে এই না যে, গল্পটা ভালো হয় নাই। হয়তো এটা তালি দেয়ার গল্প না, ভাবানোর গল্প, আপনের পারফর্মেন্স মোটে শেষ কিন্তু দর্শকের ভাবনা তো শুরু মাত্র। ওরা ভাবতে ভাবতে ঘরে যাবে। মনে রাখা উচিৎ, সব জাংক ফুডই মুখরোচক হয়। একটা ভালো গল্পের ভালো উপস্থাপনা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তালি টেনে নেয়, যেটা দর্শক মনে মনে সারাজীবনই দিতে থাকবেন, যখনই তার এর কথা মনে পড়বে। (মূকাভিনয়ের গল্প নির্মাণ: গোড়ার প্যাঁচাল ও পাঁচালি, মাসউদুর রহমান)
জার্নালটিতে আরো লিখেছেন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. তরুণ প্রধান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও মঞ্চশিল্পী সামিনা লুৎফা নিত্রা, বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের সেক্রেটারি জেনারেল রিজোয়ান রাজন প্রমুখ। মূকাভিনয় ফেডারেশানের সভাপতি জনাব জাহিদ রিপনের মতে, বাংলা ভাষায় মূকাভিনয়ের গ্রন্থের সংখ্যা হাতে গোনা। এই জার্নালটি এক্ষেত্রে একটি বিশেষ সংযোজন এবং মূকাভিনয় চর্চার পথে একটি বিরাট পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে মূকাভিনয়ের উপর গবেষণার ক্ষেত্রে এ- জার্নালটি একটি আঁকরগ্রন্থ হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি মনে করেন।

x