মুঠোফোনে ব্যস্ত রাখার নাম জীবন নয়

জয়ন্ত ভট্টাচার্য্য

শুক্রবার , ৪ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ
105

খুব ছোটবেলা থেকেই বাসায় এই ‘আজাদী’ পত্রিকাটি রোজ রাখা হতো। সকালে ঘুম থেকে উঠেই কাজ ছিল দরজা খুলে আগে বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ব। একদিন বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ নেওয়ার পর ভাবলাম একটু আধুনিক হই। এখন থেকে পত্রিকা ইন্টারনেটেই পড়ব। কিন্তু সকালে উঠেই মনে হতে লাগল কি যেন নেই। বুঝতে একটুও সময় লাগল না যে পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়ার অনুভূতিকে কখনোই মুঠোফোন দিয়ে মেটানো যায় না। পরদিন থেকে সেই পুরানো অভ্যাসেই ফিরে গেলাম যা আজ পর্যন্ত একই ভাবে আছে। কথাগুলোর অর্থ কিন্তু এই নয় যে প্রযুক্তিকে আমরা অস্বীকার করব। প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত সহজ হয়ে গিয়েছে। মুঠোফোনের কয়েকটি স্পর্শেই নিমেষেই কঠিন থেকে কঠিনতর কাজ সম্পাদন হচ্ছে। কিন্তু এই মুঠোফোনকে কি আমরা বাস্তবিক ভাবে সঠিক অর্থে ব্যবহার করছি? মুঠোফোন নামক বস্তুটি জীবনকে সহজ করেছে বলে তার অর্থ এই নয় যে এটিকে নিয়েই সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হবে, অর্থ এটিও নয় যে পরিবারের যে সময়টাতে আপনার সবার সাথে সময় কাটানো দরকার ছিল সেই সময়টাতে আপনি আপনার চক্ষু জোড়া বস্তুটির দিকে তাক করে রাখবেন। বন্ধুদের আড্ডায় নিজেকে মুঠোফোনে ব্যস্ত রাখার নাম জীবন নয়। অনেক কিছুই হয়ত আপনি হারিয়ে ফেলছেন এই সময়টাতে যা একদিন হয়ত আপনাকে ভাবাবে। আপনার পাশের বন্ধুটিই হয়ত আপনাকে তার দুঃখের কথাটি বলতে চাইছে যখন আপনি ব্যস্ত সেই বস্তুটিকে ঘিরে। সারাদিন নিজেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখার অর্থ জীবন নয়। এই আপেক্ষিক সামাজিকতা করতে করতে নিজের সমাজ থেকে যে আপনি দূরে সরে যাচ্ছেন সেটি হয়তো আপনার অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। বর্তমানে স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় সবার হাতেই মোবাইল ফোন দেখা যায়। সন্তানদের নিরাপত্তার জন্যই হয়ত অভিভাবকদের তাদের হাতে মোবাইল ফোন দিতে হয়। কিন্তু এই নিরাপত্তার খাতিরে আপনার সন্তান কি এতে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে কিনা তা খেয়াল রাখতে হবে। এই বয়সী অধিকাংশ ছেলেমেয়েদের দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নিজেদের ব্যস্ত থাকতে। নিজের ছবি পোস্ট করে কতগুলো লাইক, কমেন্ট পাওয়া যায় সেদিকেই তাদের মনোযোগ যতটা না লক্ষ্য থাকে আজ সারাদিন কি পড়লাম তার দিকে। বরং নিজের সব তথ্য বিলিয়ে দিয়ে নিজেরই নিরাপত্তার অভাব তৈরি হচ্ছে। সদ্যজাত বাচ্চাদের হাতেও তুলে দেওয়া হয় মোবাইল ফোন। তাদের মন ভোলানোর জন্য কিংবা তাৎক্ষণিক আবদার রাখার জন্য দেখা যায় মোবাইল ফোন তুলে দেয়। কিন্তু এর পরিণাম যে কিছুদিনের মধ্যেই ভয়াবহ আকারে রূপ নেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শিশুরা ইদানীং বইপড়া থেকেও মুঠোফোনের প্রতি আগ্রহী বেশি হয়ে থাকে। আমি মনে করি এর দোষ সম্পূর্ণভাবেই অভিভাবকদের। আপনি যদি সেদিনের তার ক্ষণিকের আবদার না মিটিয়ে তাকে বুঝিয়ে বা শাসন করে অভ্যাস গড়ে না তুলতেন তবে আপনার সন্তানটির হাতে অবসর সময়ে মুঠোফোনের বদলে হাতে একটি গল্পের বই থাকত কিংবা হাতে ব্যাট বল নিয়ে মাঠে ছুটোছুটি করত। আপনাকে দেখেই আপনার সন্তান শিখবে। প্রযুক্তির ভালো দিকগুলো আমাদের গ্রহণ করতে হবে। এই মুঠোফোনের অপব্যবহারের ফাঁদে পড়ে অনেক মেধা আমরা হারাচ্ছি। সেইদিনের অপেক্ষায় আছি যেদিন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্যক্তির সাফল্যের চেয়ে বাংলাদেশের সন্তানদের সাফল্যের কাহিনী দেখে পুরো বিশ্ব বাংলাদেশকে চিনবে।

x