মুছে যাবে এই গ্লানি

 জেসমিন ইসলাম 

শনিবার , ২৮ জুলাই, ২০১৮ at ৭:২২ পূর্বাহ্ণ
16

শিল্পসাহিত্য ভিত্তিক আলোচনা সভায় আমাদের একজন অগ্রজ নারী ব্যক্তিত্ব আলোচনার ধারাবাহিকতায় পারিবারিক আটপৌরে কথার সূত্র ধরে বললেন, তাঁর বয়োবৃদ্ধ শাশুড়ি অতি বার্ধক্যজনিত রোগেভুগে কষ্ট পাচ্ছেন, যেটি তাঁকে ভারাক্রান্ত করছে। তিনি আরও বললেন, মাতৃহৃদয়ের অনাবিল স্নেহ তিনি তাঁর এই শাশুড়ির কাছ থেকে পেয়েছেন, তাই কথার সাপেক্ষে ‘শাশুড়ি’ শব্দটি উচ্চারণ করছেন সেটি তাঁর প্রাণে আঘাত লাগছে। সভায় উপস্থিত সবার ভালো লেগেছে এইরকম অনুভূতি দেখে। অলিখিত সামাজিক প্রথায় আমাদের এই দেশে অধিকাংশ মেয়ের বয়স ত্রিশের নিচেই বিয়ে হয়। বিবাহিত মেয়েরা শাশুড়িকে ‘মা’ সম্বোধন করে, কিন্তু দুঃখের বিষয় অদ্ভুত এক মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়নে দেখা যায় কিছু শাশুড়ি সীমারেখা টেনে বুঝিয়ে দেন পুত্রবধূকে। তিনি মা নন। তিনি শাশুড়ি অর্থাৎ আইনগত ‘মা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হৈমন্তী’ ছোটগল্পে দেখা যায়। যতদিন পর্যন্ত হৈমন্তীর শাশুড়ি আশায় ছিলো বড় অংকের যৌতুক পাবে হৈমন্তীর বাবার কাছ থেকে ঘটকের আশ্বাসে, ততদিন মাতৃ স্নেহতুল্য ব্যবহার করেছে মাতৃহীন হৈমন্তীর সাথে। পরে যখন জানতে পারলো হৈমন্তীর বাবার সঞ্চয় নেই তখন দুর্ব্যবহার শুরু করল শাশুড়ি এবং শ্বশুর উভয়েই। বেদনাহত হৈমন্তী শয্যাশায়ী হলো, যথোপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে মারা গেলো। নারীর জীবনের অনেক অগ্রগতি হয়েছে কিন্তু এখনও কত ‘হৈমন্তী’ পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। কেবল যাদের যায় তাঁরাই জানে।

একজন বাবার একমাত্র চিকিৎসক কন্যা সন্তানকে শ্বশুর বাড়িতে দেখতে গিয়েছে। শাশুড়ি মেয়েটির বাবাকে অভিযোগ করলো তাঁর মেয়ে ভালোভাবে হাত রুটি বানাতে কেন পারে না। হতভম্ব পিতা অনুধাবন করলেন, তাঁর সাথে এই জাতীয় ব্যবহার করতে কুণ্ঠাবোধ করলো না যে মহিলা, তাহলে তাঁর মেয়ের সাথে দুর্ব্যবহারের মাত্রা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তিনি অনুমান করে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে ফিরে এসেছেন।পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের কবিতার ভাষায় ‘হাতেতে যদিও মারিত তারে। শত যে মারিত ঠোঁটে। সুপরিচিত লেখিকা ‘ফাহমিদা আমিন’ আমেরিকা ভ্রমণের দর্শনীয় স্থানের বর্ণনায় লিখেছিলেন। তিনি একটি পর্যটন দর্শনীয় গুহা দেখতে গিয়েছিলেন। গুহাটির দেয়ালে সূচালো আকারের কিছু গেঁথে ছিলো। গাইড দর্শনার্থীদেরকে সাবধান করে দিলে এই বলে, সূচালো জিনিসগুলোর শরীরে খোঁচা কিংবা আঁচড় কাটতে পারে এবং তার সাথে গাইড হেসে বললো, এই সূচালো জিনিসগুলোকে বলা হয় ‘মাদার ইন লজ টাংগ’ কিছু তরুণী দর্শনার্থী সেটি শুনে জোরে হেসে উঠলো। তিনি তাঁর রম্য রচনায় সেটিকে লিখেছিলেন, ‘ঘুটে পুড়ে গোবর হাসে।’ যে তরুণী আজকে হাসছে, জীবনের পরিক্রমায় সেও একদিন শাশুড়ি হতে পারে। যুগের পর যুগ পৃথিবীর পরিক্রমায় শাশুড়ি আর পুত্রবধূর মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়নের নেতিবাচকতাকে স্থ্থূল উপজীব্য করা হয়েছে। হলিউডে জেনিফার লোপেজ অভিনীত একটি চলচ্চিত্র রয়েছে ‘মনস্টার ই ল’ নামে। আমাদের একজন নারীবাদী লেখিকা লিখেছিলেন, শাশুড়ি যেহেতু পুরুষ পক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী। সেই শক্তিসত্তার অহংবোধ অপশক্তি প্রদর্শনে তাঁকে তাড়িত করে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, কিছু মানুষের মধ্যে প্রভুত্বের অর্থাৎ অন্যকে অবদমিত করে আনন্দ খুঁজে পায়, যাকে বলা হয় কুৎসিত আনন্দ। দৃশ্যত মনে হতে পারে আমি একপেশে শাশুড়ির নেতিবাচক ভূমিকার কথাই বলছি, পুত্রবধূদেরকে নিরপেক্ষ রেখে। একটি কথা আছে সম্মানের সাথে দায়িত্ব জড়িত। শাশুড়ি ব্যক্তিত্বটি যেহেতু একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সম্মানিত ব্যক্তিত্ব, নির্মল সম্পর্কের জন্য তাঁকে এগিয়ে থাকতে হবে। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে ভুলত্রুটি দেখে তাঁর বড়ত্বের পরিচয় দিতে হবে এবং আমাদের সমাজে বড়ত্বের পরিচয় দেয়া অগণিত শাশুড়ি রয়েছেন। আমাদের একজন বয়োবৃদ্ধ খালাম্মার পুত্রবধূ ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া ভঙ্গুর চরিত্রের ছেলে অন্যত্র বিয়ে করে ফেলতে পারে এই আশংকায় ছেলেকে সর্বশক্তি দিয়ে অনুরোধ করেছিল অসুস্থ মরণাপন্ন পুত্রবধূ বেঁচে থাকতে ছেলে যেন বিয়ে না করে। অসহিষ্ণু ছেলে মায়ের সেই কথা রাখেনি। দীর্ঘ রোগ শয্যায় খালাম্মাই ছিলেন পুত্রবধূর ভরসার স্থান আমৃত্যু।

প্রশ্ন হতে পারে, পারিবারিক এই মানবিক সম্পর্কের উত্থানপতন নিজ বলয়ের মধ্যেই থাকলেই হয়, এটি লেখার উপজীব্য করার কি প্রয়োজনীয়তা। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ডা. অরূপ রতন চৌধুরীর উপস্থাপনায় দেখলাম একজন মাদক আসক্ত পুরুষের সাক্ষাৎকার। আক্রান্ত লোকটি বললো, তাঁর পরিবারে স্ত্রী এবং মায়ের সৃষ্ট ঝগড়া অশান্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে তিনি মাদক আসক্ত হয়েছেন। তিনি মা এবং স্ত্রী উভয়কেই অনেক ভালোবাসেন। তাঁর পক্ষে এই দুইজন নারীর কোনো জনকে পরিত্যাগ করা সম্ভব না। তাঁকে রিহেবিলেটেশন সেন্টারে যখন দেয়া হলো তখন তিনি দেখলেন মা এবং তাঁর স্ত্রীর মাঝে সুসম্পর্ক স্থাপন হয়েছে। সুস্থ হয়ে লোকটি যখন বাসায় ফিরে এলো কিছুদিন পর আবার আগের নারকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করলো মা এবং স্ত্রী। লোকটি পুনরায় মাদকাসক্ত হলো।

মানব সভ্যতার ক্রমবর্ধমানতায় পরিবার অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। পারিবারিক বন্ধন, মূল্যবোধ গ্রহণযোগ্য অনুষঙ্গ সর্বত্র। পরিবারে নারী সদস্যদের নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মূল্যায়িত হয়, সেক্ষেত্রে যদি এই জাতীয় বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করে সেটি নারীর অবস্থানকে, অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করবে।

x