মুখ খোলা নিয়ে কঠিন শপথ ছিল পাঁচ খুনির

খুলশীতে মা-মেয়ে হত্যার রহস্য উন্মোচন

সোহেল মারমা

শুক্রবার , ১৫ মার্চ, ২০১৯ at ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ
2001

নগরীর খুলশীতে অর্থ-সম্পত্তির লোভে সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও তার মাকে হত্যায় জড়িত খুনিরা ধরা পড়লে আত্মহত্যা করার মত পরিকল্পনা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া ওই খুনের ঘটনায় তাদের কেউ ধরা পড়লে সব দায় ধরা পড়া ব্যক্তি একাই বহনের পাশাপাশি শাসিত্ম ভোগ এবং কেউ যদি এ খুনে অন্যদের জড়িত থাকার বিষয়ে মুখ খোলে তাহলে তার পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলা হবে বলে সিদ্ধানত্ম নিয়েছিল তারা।
খুনিদের পরিকল্পনা ও শর্তমতে ঠিক তাই হতে যাচ্ছিল। পুলিশ এ হত্যা মামলায় জড়িত মাত্র একজনকে ধরার পর তার খুনের স্বীকারোক্তির পর চার্জশিটও দাখিল করতে যাচ্ছিল। কিন্তু্তু গোয়েন্দা পুলিশের অধিকতর তদনেত্ম বেরিয়ে আসে খুনীদের অন্যরকম পরিকল্পনার কথা।
গত ১৫ জুলাই খুলশী থানাধীন আমবাগানে ফ্লোরাপাস রোডের একটি নির্মাণাধীন বাসায় সাবেক রূপালী ব্যাংক কর্মকর্তা মেহেরুন্নেছা ও তার মা মনোয়ারা বেগম (৯৭) খুনের পেছনে মুশফিক, মুসলিম, সাহাবুদ্দিন, মাসুদ ও মুন্না নামে পাঁচজন জড়িত ছিল। এরপর ২৩ জুলাই মুশফিক গ্রেফতার হয়। বাকীদের মধ্যে গত ১২ মার্চ মুসলিমকে (২৫) এবং গত ১৩ মার্চ সাহাবুদ্দিন ও মাসুদকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এ ঘটনায় মুশফিকের স্ত্রীর বড় ভাই মুন্না পলাতক রয়েছে। এই হত্যাকা- প্রসঙ্গে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম বলেন, মা-মেয়ে খুনের পর পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় মুশফিক। এ সময় মুশফিক আমাদের কাছে খুনের দায় স্বীকার করেছিল। আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছিল। এরপর পুলিশও তার বিরুদ্ধে চার্জশিট পর্যনত্ম দাখিল করতে যাচ্ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মামলার তদনত্ম কাজ আরও চালালে তাদের এই পরিকল্পনা বেরিয়ে আসে।
আমেনা বেগম বলেন, এ হত্যা মামলায় ডিবির তদনত্ম কর্মকর্তার দূরদর্শিতার কারণে মূল বিষয়টি বেরিয়ে আসে। এ হত্যাকান্ডে একজন নয়; আরও কয়েকজন জড়িত ছিল। ইতোমধ্যে তাদের চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পলাতক বাকি আসামিকেও গ্রেফতারে অভিযান চলছে। বতর্মানে এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলাটির তদনত্ম কাজ মোটামুটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে বরে জানান আমেনা বেগম।
এদিকে মামলার তদনত্ম কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক ইলিয়াছ খান গতকাল আজাদীকে বলেন, মেহেরুন্নেছা ও তার মা মনোয়ার বেগম যে বাড়িতে থাকতেন সেটি মোটামুটি ‘সিকিউর’ ছিল। ঘটনার দিন মুশফিকই ওই বাড়িতে প্রবেশের জন্য দরজা খুলে দিয়েছিল। পরে সবাই মিলে মেহেরুন্নেছা ও তার মা মনোয়ারা বেগমকে খুন করে।
ডিবির পরিদর্শক ইলিয়াছ খান বলেন, এ খুনের ঘটনার পর খুনিরা ব্যতিক্রমী শর্তগুলো দিয়ে শপথ করেছিল। তাই খুনের ঘটনার ৮ দিনের মাথায় গ্রেফতার হওয়া মনোয়ারা বেগমের নাতনী মুশফিকুর রহমান খুনের সব দায় একাই স্বীকার করেছিল। কিন্তু তার কথা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ডিবির তদনত্ম কর্মকর্তা মামলাটির তদনত্ম আরও চালিয়ে গেছেন, শেষ পর্যনত্ম মূল রহস্য উদঘাটন হয়।
ডিবি পরিদর্শক ইলিয়াছ খান আজাদীকে আরও বলেন, জায়গা সম্পত্তি ও টাকা-পয়সার লোভেই মূলত এ খুনের ঘটনা ঘটে। সম্পত্তি পাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল সাহাবুদ্দিন ও মাসুদের। পরিকল্পনা মতো ওদের সম্পত্তি মুশফিকের কাছ থেকে কিনে নিতেন তারা। আর মুশফিকের দরকার ছিল টাকা। বাকীদেরও টাকার প্রয়োজন ছিল।
সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা মেহেরুন্নেছার কাছে অনত্মত ৭ কোটি টাকার মতো সম্পদ থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তদনত্ম কর্মকর্তা।
জানা যায়, মুশফিকুরকে ছোটবেলা থেকেই লালন-পালন করেছেন এ মামলার বাদী মোসত্মাফিজুর রহমান। তিনি নিহত ব্যাংক কর্মকর্তার ভাই। মুশফিকের বাবা ছোটবেলায় মারা যাওয়ার পর তার মা নাজমুন নাহারকে বিয়ে করেছিলেন মোসত্মাফিজুর রহমান। ফলে তাদের সম্পত্তিগুলোর একপর্যায়ে উত্তরাধিকার সূত্রে মুশফিকুরের কাছে আসার কথা বলে জানান ডিবির পরিদর্শক ইলিয়াছ খান।
এদিকে গত বুধবার সাহাবুদ্দিন ও মাসুদকে গ্রেফতারের পর দুদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এছাড়া মুশফিকুরকে আবারো আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার জন্য হাজির করা হবে বলে জানায় পুলিশ।
এর আগে আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে সে বলেছিল, সাহাবউদ্দিনের নির্দেশে ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে সে ওই বাসায় যায়। মুসলিম ভবনে ঢুকে মূল দরজা খুলে দেয়। এরপর সেখানে মেহেরুন্নেছার ভাইপো মুশফিক, তার স্ত্রীর বড় ভাই মুন্না, মাসুদ ও সাহাবউদ্দিন বাসায় প্রবেশ করে। এসময় মুসলিম, সাহাবউদ্দিন ও মাসুদ বাসায় ঢুকে অন্য একটি রুমে অবস্থান নিলেও মুশফিক মুন্নাকে নিয়ে তার ফুপু মেহেরুন্নেছার রুমে প্রবেশ করে। চেক বইতে স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য রুমে মেহেরুন্নেছার সাথে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটির পর মুশফিক তার তার ফুপুকে গামছা দিয়ে হাত ও মুখ বেঁধে সিঁড়িঘরে নিয়ে আসে। সেখানে দলিল ও কাগজে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ সৃষ্টি করলেও মেহেরুন্নেসা রাজি হননি। এ সময় মুশফিক বসার পিড়ি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। ওই অবস্থায় হাতে গস্নাভস পড়ে মুশফিক মেহেরুন্নেসার গলা চিপে ধরেম অন্যরাও কাপড় দিয়ে গলা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে হাত, পা বাঁধা অবস্থায় লাশটি পানির ট্যাংকে ফেলে দেয়।
পরে মনোয়ারা বেগমকে সবাই মিলে কোলে করে রুম থেকে বের করে নিয়ে আসে। এ সময় মনোয়ারাকেও দলিল ও চেক বইয়ে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দিলে তিনি রাজি হননি। পরে মাসুদের নির্দেশে গলা টিপে মনোয়ারা বেগমের মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশটি পানির ট্যাংকে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর মুসলিম মেঝেতে পড়া রক্ত পরিষ্কার করে দেয়। হত্যার পর তারা শপথ করিয়েছিলেন বলে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উলেস্নখ করে মুসলিম। শপথ নেওয়ার পর সবাই মূল দরজা দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলে মুসলিম ঘরের ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে পেছনের দেয়াল টপকে বেরিয়ে যায় বলে আদালতকে জানায়।

x