মুখ ও মুখোশের বাংলা নববর্ষ

অজয় দাশগুপ্ত

শনিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৮ at ৯:০১ পূর্বাহ্ণ
136

নববর্ষের দিন সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে যেতে বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নতুন কিছুনা। আগেও বলেছিলেন। এখন থেকে হয়তো সবসময় বলবেন। কিন্তু কেন? উৎসব বা আয়োজনের দিন বা বাংলা নববর্ষের মত দিনে একটি সন্ধ্যা কি মানুষ নিরাপদ পেতে পারে না? প্রতিদিন যারা রাস্তায় বেরোয় বা যারা আমাদের দেশের মানুষ তারাইতো সেদিন ও বেরুবেন। কোন এক অজ্ঞাত কারণে এই নিয়মটি এখন পোক্ত হতে চলেছে। এই এক মুসিবত। খারাপ কিছু একবার চালু হলে সেটাই নিয়ম হয়ে যায়। আর ভালোকিছু হলে তা মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। দেশের পরিবেশ কোনদিকে খারাপ? আর খারাপ হলে সরকারে থাকা মানুষজন প্রায়ই যে বলেন দেশ এগুচ্ছে বা দেশে এখন সমস্যা নাই সেটা কি মিথ্যা? কোনটা আসলে সত্য?

বাংলাদেশে নববর্ষ উদযাপন নতুন কিছু? রমনা বটমূলে হামলা কি দিনের বেলায় সকালে হয়নি? হবার পরও কি মানুষ থেমে ছিলো? সকাল সন্ধ্যার এই ধাঁধা তাই মেলে না। ধরে নিলাম ভয়টা তারুণ্যকে নিয়ে। কোন তারুণ্য ? যে তরুণ তরুণীরা থার্টি ফার্স্ট নাইটের নামে মাতম করতে রাস্তায় নামে তারা আর বৈশাখের মানুষ এক? সেটাতো বিজাতীয় নববর্ষ। আর সেটার পালন কিংবা আচার ও বিদেশীদের কাছ থেকে ধার করা। ফলে তার সাথে থাকে পানাহার, হুল্লোড়। গায়ে গায়ে ঢলাঢলি। এটাকি তাই? আমাদের নববর্ষে যারা পান্তা ইলিশের বিরুদ্ধে আমি তাদের দলে। কারণ এটি একটি সাধারণ খাবার মাত্র। এরসাথে নববর্ষের কোন যোগ নাই। কিন্তু ধরে নিলাম এটাই দস্তুর। তো এই পান্তাভাতে কি সেই জোশ আছে? বা ইলিশ কি কামনাবর্ধক? না তা খেয়ে পুরুষ মহিলারা মাতাল হয়? তারা কি পাতার বাঁশী বা হাতপাখা দেখে কিনে উন্মাদ হয়? ভয়টা আসলে কোথায়?

এখন এটাও বলা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুখোশ ব্যবহার করা চলবে না। কেন? মুখোশের আড়ালে মুখ ঢাকা থাকলে মানুষ কি দানব হয়ে ওঠে? মন্ত্রী মহোদয় কিংবা সরকার ভালো জানেন এদেশে কারা আসলে মুখোশের আড়ালে মুখ ঢেকে রাখে। মূলত আমরা দেখি মুখোশপরা মানুষই মুখগুলো হাতে নিয়ে চলাচল করে। তাদের নতুন ভাবে মুখোশ পরতে দেয়া না দেয়ায় কিছুই যায় আসে না। তারপরও মন্ত্রী বলে কথা। আমরা সাধারণ মানুষ তাও আবার বিদেশে থাকি। আমরা শুনছি দেশ এখন মধ্য আয়ের সীমানায়। জানছি দেশ আর অনুন্নত বা গরীবও না। সেটা কি শুধুই টাকা পয়সার বেলায়? সভ্য ও উন্নত হতে হলে প্রথম তো জানমালের নিরাপত্তা বিধান করতে হয়। সে জায়গায় নিজেদের দুর্বলতা এভাবে ঢাকার কি মানে? সরকার যদি জঙ্গি দমন করতে পারে সন্ত্রাস নির্মূল করতে পারে বা করা হচ্ছে বলে সার্থকতার কথা বলে এই সামান্য কাজ পারেন না তারা?

দুষ্ট মানুষ বা অসৎ মানুষদের মানুষই প্রতিরোধ করে। করেছে করবেও। ফলে জানতে মন চায় এর পেছনে কি রাজনৈতিক কোন কারণ আছে? আছে কি মৌলবাদী নামে পরিচিত রাজনীতির ইন্ধন? এভাবে কি সর্বজনীন ও একমাত্র বাংলা উৎসবটিকে হীনবল করার চক্রান্ত চলছে? এর উত্তরহীনতা এবং সন্ধ্যার পর বাড়ি গিয়ে পরিবারকে সময় দেয়ার সদুপোদেশ আসলেই বাতুলতা। বাংলা নববর্ষ কি তার শক্তিতে জেগে উঠতে পারবে না তাকে সে সুযোগ দেয়া হবে না?

বাংলা নববর্ষ এখন দেশের বাইরেও জনপ্রিয়। আমি যখন সিডনি আসি ধারণা ছিলো এখানে আর যাই হোক বাংলা নববর্ষ পাবো না। এসেই দেখি আছে। বঙ্গবন্ধু পরিষদের ব্যানারে সেই নববর্ষের আয়োজন তখন একটি স্কুলের ময়দানে ছোট আকারে হলেও আজ তার ব্যাপ্তি বিশাল। সেই বিশালতার দায়িত্ব এখন বঙ্গবন্ধু কাউন্সিলের হাতে। এই সংগঠনটি বঙ্গবন্ধু পরিষদেরই নতুন নাম। সিডনি তথা দেশেবিদেশে আমাদের ভাঙন আর অনৈক্য বিশেষত নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার মানসিকতায় তার নাম পাল্টাতে বাধ্য হয়েছেন তারা। গোড়া থেকে তাদের সাথে থাকার কারণে এর বিশালত্ব আরো বড় হয়ে ওঠা দেখেছি আমি। শুধু দেখেছি বললে ভুল হবে এর ব্যপ্তি ও প্রবল হবার কালে নানাকারণে গালমন্দো শুনতে হয়েছে। সেগুলো এখানে আলোচনা করার প্রয়োজন নাই। তারচেয়ে বড় কথা আজ এটি দেশবিদেশে বাঙালির অহংকার। এতবড় মেলা দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আর কোথাও হয়না। এক সময় তার প্রয়োজন এত বাড়লো যে সে আজ চলে গিয়েছে এদেশের সম্মানজনক ভেন্যু সবার ওপরে থাকা বিশাল স্টেডিয়ামে। যেখানে খোদ অজিরাই কোন অনুষ্ঠান করতে দু বার ভাবেন।

এই প্রাণশক্তির পেছনে আছে এখানকার বাঙালি জনগোষ্ঠী। তারা একের পর এক বাধা পেরিয়ে এর সাথে ছিলো বলেই একেকবারে জনস্রোত বিশ পঁচিশ হাজারে পৌঁছে মেলাটিকে করে তুলেছে অপ্রতিরোধ্য। এখন যিনি দায়িত্বে সেই শেখ শামীমুল হক ঠান্ডা মাথার মানুষ।তাঁকে কাবু করা সহজ কিছু না। সাথে থাকা তরুণ তূর্কীর দল ড: আবদুর রাজ্জাক আর শামীমূল হকের মেলাটিকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে যেখানে প্রত্যাশা আর প্রত্যাশাই ডানা মেলছে শুধু। আমি দেখেছি এর বহিরাঙ্গিকেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বাকী অনেক মেলায় লোকসমাগম নেহাৎ মন্দ হয়না। পার্থক্য এই এটির জন্য এখন সবাই কাতর হয়ে থাকে। মেলা মানে যে কিছু দোকান পাট খাবার দাবার বা আড্ডা শুধু না সেটাই হচ্ছে এই বৈশাখী মেলার মূল বিষয়।

আজকে এর সাথে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিকতা। বেশ ক বছর

ধরে তাঁরা নানাদেশের মানুষ ও তাদের অনুষ্ঠান যুক্ত করায় নতুন ব্যঞ্জনা পেয়েছে এটি। আমাদের ভাষার সংগ্রাম ছিলো দেশমুক্তির প্রথম ধাপ। ভাষাহীন মানুষের আবেগ আমাদের চাইতে ভালো কারা জানবে? এইদেশ উন্নত সভ্য আগুয়ান হলেও এর আদিবাসীদের ভাষা বিলুপ্তপ্রায়। সেই আদিবাসীদের নাচ গানে অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশের মেলা। এর চেয়ে প্রাপ্তি আর কি হতে পারে? এখানে বৃটিশ স্কটিশ থেকে ভারতীয় বা আদিবাসী এবরজিনালদের অনুষ্ঠান ই বলে দেয় আমাদের ব্যপ্তি আজ বিশ্বজনীন। ভেতরের শক্তিকে কাজে লাগানোর বিষয়টা বিদেশের বাঙালি জানলেও নানা কারণে পারেনা। যার মূল কারণ অনৈক্য আর ভাঙ্গণ। বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল সেই জায়গাটা পার হয়ে এসেছে বলে মনে হয়। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বা ইমেজ কথায় বাড়ানো যায়না। সে চেষ্টা বৃথা। এই মেলায় যেভাবে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কর্ম ভেসে ওঠে তাতে ইতিহাসের শুদ্ধতাও নতুন রুপ পায় বৈকি। যে কারণে খালি মেলা বা লোকসমাগম নয় এর কাহিনী ও বিস্তার একদিন কিংবদন্তী হবে।

দেশের সাথে বিদেশে বাংলা নববর্ষের একটা তফাৎ কিন্তু নীরবে রচনা করে ফেলছে মুক্তিযুদ্ধের দাবীদার সরকার। দেশে এখন মুখ আর মুখোশ একাকার আর বিদেশে মুখ ও মুখোশ সহজেই নির্নয় করা যায়। জয়তু পহেলা বৈশাখ।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামলেখক

x