মুখের পক্ষাঘাত নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ২৭ জুলাই, ২০১৯ at ৭:৫৭ পূর্বাহ্ণ
96

হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া এটা এক ধরনের প্যারালাইসিস। যা মুখমণ্ডলে মানুষের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের মস্তিষ্কের সপ্তম ক্রেনিয়াল নার্ভটিকে ফেসিয়াল নার্ভ বলে। কোন কারণবশতঃ মস্তিষ্কের ক্রেনিয়াল বা ফেসিয়াল নার্ভ প্রদাহ হলে বা প্রতিবন্ধকতা ও আঘাত পেলে নার্ভ তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। যখন এটি আংশিক বা সম্পূর্ণ প্যারালাইজড হয়ে যায় তখন তাকে ফেসিয়াল প্যারালাইসিস বা পালসি বলা হয়। জন বেল নামের এক বিশেষজ্ঞ এই রোগটি প্রথম আবিস্কার করেন সে জন্য তার নামানুসারে একে বেলস পালসিও বলা হয়ে থাকে।
মুখের পক্ষাঘাত কাদের বেশি হয় : এটি যেকোনো বয়সসের নারী ও পুরুষ উভয়েরই হতে পারে, তবে পুরুষের তুলনায় নারীদের রোগটি বেশি দেখা যায়।
মুখের পক্ষাঘাতের কারণ : বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল * ভাইলাল ইনফেকশন * মধ্য কর্নে ইনফেকশন * ঠান্ডাজনিত কারণ * আঘাতজনিত কারণ * মস্তিষ্কের স্ট্রোকজনিত কারণ * ফেসিয়াল টিউমার * কানের অপারেশন পরবর্তী ফেসিয়াল নার্ভ ইনজুরি * গলক্ষত প্যারটিভ গ্রন্থির ইনফেকশন * সিফিলিস * ব্যাসিলারি মেনিনজাইটিস * জন্মকালে ফরসেপস প্রয়োগ * মধ্য বয়সে বিশেষত মদ্যাসক্ত ও বাত রোগাক্রান্ত ব্যক্তিগণ এই রোগে অধিক আক্রান্ত হয়।
মুখের পক্ষাঘাতের লক্ষণ : * হঠাৎ করে আক্রান্ত রোগীর মুখ একদিকে বাঁকা হয়ে যায়। * আক্রান্ত পাশের চোখ বন্ধ হয় না ও চোখ দিয়ে পানি পড়ে * কুলি করতে গেলে অন্য পাশে পানি চলে যায় * খাবার গিলতে কষ্ট হয় * কপাল ভাঁজ করতে পারে না * অনেক সময় কথা বলতে কষ্ট হয়।
মুখের পক্ষাঘাত কিভাবে নির্ণয় করবেন : এটি একজন চিকিৎসক ক্লিনিক্যালি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ও রোগীর ইতিহাস জেনে রোগ নির্ণয় করতে পারেন। তবে অনেক সময় কিছু প্যাথলজিক্যাল ও রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে। যেমন- কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট উইথ ইএসআর, এক্সরে অব টি এম (টেম্পরো মেন্ডিবুলার) জয়েন্ট, নার্ভ ক্লাকশন ভেলসিটি (এনসিভি) অব ফেসিয়াল নার্ভ ইত্যাদি।
রোগীর কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত : চিকিৎসা চলাকালীন রোগীর কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে। যেমন- ঠান্ডা আবহাওয়া থেকে দূরে থাকতে হবে। * আইসক্রিম ও ফ্রিজের ঠান্ডা খাবার খাওয়া যাবে না * বাইরে বা রোদ্রে গেলে চোখে সানগ্লাস ব্যবহার করতে হবে যেন আক্রান্ত চোখে ধুলাবালি ঢুকতে না পারে।
ব্যায়াম : এই রোগে ব্যায়াম ও ম্যাসেজ উপকারী। যেমন * জোড় করে চোখ মারার চেষ্টা করা * শিস বাজানোর চেষ্টা করা * ঠোঁট চেপে ধরে গাল ফুলানোর চেষ্টা করা * কপাল কুচকানো * ভ্রু-কুঁচকানো ইত্যাদি।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা : মুখের পক্ষাঘাত বা ফেসিয়াল প্যারালাইসিস রোগ নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে অত্যন্ত ফলদায়ক ওষুধ আছে। যা অন্যপ্যাথিতে নেই। লক্ষণভেদে নির্দিষ্ট মাত্রায় নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহারে এটি সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে। যথা-
১. একোনাইট প্রথমাবস্থায় ও হঠাৎ ঠান্ডা লেগে পীড়ার উৎপত্তি হলে। উপকার না হলে কষ্টিকাম, ক্যাডমিয়াম সালফ প্রযোজ্য।
২. কষ্টিকাম- মুখের এবং জিহ্বার অংশ উহার সহিত দৃষ্টিশক্তির ক্ষীণতা, কাঁদ কাঁদ ভাব, হতাশার ভাব, মৃত্যুভয়, আক্রান্ত অংশে টান টান ভাব। ঠান্ডা লেগে অথবা বাত জাতীয় পীড়া বা কোন চর্ম পীড়া বসে গিয়ে এই রোগ সৃষ্টি হলে উহার প্রয়োজন। হেমিপ্লিজিয়ার লক্ষণেও যথেষ্ট উপকারী।
৩. ক্যালি ফ্লোরিকাম – আক্রান্ত অংশে স্পর্শকাতরতা বেদনা প্রথম হতে হোক আর পরেই হোক থাকলে উপকার হবে।
৪. গ্রাফাইটিস : মুখফোলা এবং মুখে যেন মাকড়সার জাল রয়েছে, এই লক্ষণ থাকলে ব্যবহার্য।
৫. নাক্সভমিকা : মুখ ও হাত পায়ের অসম্পূর্ণ পক্ষাঘাত, পীড়ার সাথে মাথাঘোড়া, স্মৃতি শক্তির দুর্বলতা, চক্ষুর সম্মুখে অন্ধকার দেখা, কানে শব্দ, ক্ষুধা লোপ, পাকস্থলীতে জ্বালা, পেটফাঁপা, পানাহারের পর বমি, কোষ্টবদ্ধ ইত্যাদি।
৬. রুটা : ঠান্ডা লাগার পর মুখের অবশতা লক্ষণে ব্যবহার্য।
৭. ককুলাস ইন্ডিকা : মুখ, জিব ও ফ্যারিংসের পক্ষাঘাত। ইহার রোগী বাত প্রকৃতির বা নাভার্স প্রকৃতির। সামান্য কারণে মুর্চ্ছাভাব এবং বুক ধড়ফড় করে।
উপরোক্ত ওষুধ ছাড়াও লক্ষণভেদে ব্যারাইটা কার্ব, স্ট্যানাম, ল্যাকেসিস উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x