মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের কবিতা

ড. আহমেদ মাওলা

শুক্রবার , ৮ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ
188

বাঙালির সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন; স্মৃতি ও স্বপ্ন, বাস্তবতা আবর্তিত হয়েছে গত চার দশক ধরে একটি আবেগকে ঘিরে এবং রচিত হয়েছে বাঙালির মহোত্তম কিংবদন্ত্তিমুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; যে আবেগ, বিশ্বাস, চিন্তা একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখায়, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী হতে শেখায়, ধর্মান্ধতা ও সামপ্রদায়িকতামুক্ত, ভবিষ্যৎমুখি, অভিন্ন জাতিসত্তায় প্রণোদিত করে, তা-ই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যে চেতনার একটি ধারাবাহিক ইতিহাস আছে; আছে হাজার বছরের সংগ্রাম এবং লক্ষ মানুষের রক্তে রাঙানো জীবনকাহিনী। বায়ান্ন’র একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাঙালি প্রথম নিজেদের শনাক্ত করতে পেরেছিল ‘আমরা বাঙালি’। এই আত্মপরিচয় বাঙালিকে অস্তিত্ব সচেতন করে তোলে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশত বার্ষিকী পালনে বাধাদান, ১৯৬২ সালে তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্র, ১৯৬৩ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট, ১৯৬৬ সালে ছয়দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বাঙালির জাতিসত্তার বিকাশ ও স্বাধীনতা অর্জনেরই পর্যায়ক্রমিক ধাপ। বাঙালির মুক্তিচেতনা এভাবে ধাপে ধাপে আত্মসাক্ষাৎ লাভ করে এবং বিশ্বের মানচিত্রে স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্রের গৌরবময় পতাকা উত্তোলন করতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের কবিতায় প্রগতিশীল এবং প্রগতিবিরোধী ধারার মতো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং স্বাধীনতাবিরোধী দু’টি ধারা পরিলক্ষিত হয়। এ দু’টি ধারার স্বরূপ শনাক্ত করার জন্যে প্রথমে জানা দরকার কী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর কী স্বাধীনতা বিরোধী চেতনা। আমার সামনে আছে বিগত দ্বন্দ্বদীর্ণ চল্লিশটি বছর (১৯৭১-২০১১) এবং এই সময়ে রচিত অসংখ্য কবিতা। এসময়ে স্বাধীনতার স্পপতিকে সপরিবারে হত্যা, সামরিক ক্যু, অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল, গণতন্ত্রের মৃত্যু, সামরিক স্বৈরাচারের উত্থান, গণআন্দোলন, গণতন্ত্রের মোড়কে নির্লজ্জ দলতন্ত্রের আগ্রাসন, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের উত্থান, স্বাধীনতা বিরোধীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল ইত্যাদির মতো অসংখ্য কালোজাদু প্রত্যক্ষ করেছে বাংলাদেশের মানুষ। সময়টি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ- বিপক্ষের দ্বন্দ্বে দীর্ণ। গণমানুষের আন্দোলনের প্রতিটি বিজয়ের পর সময়কে পর্যুদস্ত করে প্রতিক্রিয়াশীলরা উড়িয়েছে তাদের অন্ধকারের কালো পতাকা। এ সময়ের কী কী আবেগ, বিশ্বাস, চিন্তাকে গণ্য করবো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে ? বিষয়টি দেখা দরকার একইসঙ্গে শিল্প ও রাজনীতির প্রেক্ষিতে। কারণ একদিকে শিল্প ও জীবনের মিলিত বিন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীলদেরও রয়েছে এ বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র চেতনা। মনে রাখা দরকার দেশপ্রেম একদিনের বিষয় নয় বরং যেকোনো নাগরিকের আমৃত্যু আচরণ ও অভিব্যক্তি প্রকাশের অভিন্ন বিষয় এটি। বাংলাদেশের গত চার দশকের সমাজ, রাজনীতি, কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে গণ্য করতে চাই, যা বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও অসামপ্রদায়িক সমাজের স্বপ্ন দেখায়, তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং এর বিপরীত চিন্তাই পশ্চাৎগামীতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা। এ দু’টি ধারার মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীল ধারাটি জ্যেষ্ঠ এবং তার উদ্ভব ঘটেছে সামপ্রদায়িক দ্বিজাতিতাত্ত্বিক পাকিস্তানবাদ থেকে। দ্বিতীয় ধারাটি সমকালীন সমস্ত বেদনা ও বিক্ষোভ, উত্তাপ ও সন্তাপকে অঙ্গীকার করে গণমুখি ধারায় বিকশিত। বায়ান্ন’র একুশে ফেব্রুয়ারি জন্ম দিয়েছিলো সেই প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের কবিতার ধারা, সমকালীনতা, ইহজাগতিকতার ধারা। ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবিরাই লিখেছেন জাতীয় জীবনে সাহসের সঙ্গে বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে স্বপ্নময় কবিতা, স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় লিখেছেন বিক্ষোভ আর সংক্ষোভের কবিতা। এভাবে মুক্তিসংগ্রামের অনেক অনিবার্য অনুষঙ্গ মঞ্জুরিত হয়েছে আমাদের কবিতায়। পঁচিশে মার্চের (১৯৭১) কালোরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে গণহত্যায় নামলে, বাঙালি আপন অস্তিত্বরক্ষার প্রয়োজনে এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করার অভিপ্রায়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অংশ নেয় মুক্তিযুদ্ধে। বাংলাদেশের কবিগোষ্ঠীর কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিলো স্পষ্ট। ফলে কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটেছে নানাভাবে। কখনো সরাসরি মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে রচিত হয়েছে কবিতা, কখনো মৃত্যুশাসিত ভয়াল দিনরাত্রির কথা, হানাদারবাহিনীর নির্মম হত্যা, লুণ্ঠন, বিমানবিক নির্যাতনের চিত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ভালোবাসা, হানাদারদের প্রতি ঘৃণা উচ্চারিত হয়েছে কবিতায়। যুদ্ধকালে রচিত কবিতা এবং তার অব্যবহিত সময়ের পরের কবিতার বিষয় ও বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায় এভাবে
ক. হানাদার বাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন, নারী নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞের চালচিত্র।
খ. মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও স্বপ্নময় আকাঙ্ক্ষা।
গ. স্বজন হারানোর বেদনা, মুক্তির উল্লাস, বিজয়ের পতাকা ইত্যাদি।
যুদ্ধকালের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন আমরা প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করতাম। সবসময় মনে হতো কেউ যেন দরজায় কড়া নাড়ছে। ঘুম থেকে চিৎকার করতাম কোন কোন রাতে। বধ্যভূমির ধারে বেঁধে রাখা জীবজন্তুর মত। আমরা আতঙ্ককে জেনেছি নিত্যসঙ্গী বলে। এমন কোন দিনের কথা মনে করতে পারিনি, যে দিন হত্যা কিংবা ধরপাকড়ের কোন না কোন খবর এসেছে কানে। সেই অনুভূতির কয়েকটি পংক্তি
কখনো নিঝুম পথে হঠাৎ লুটিয়ে পড়ে কেউ গুলির আঘাতে
মনে হয় ওরা গুলি বিদ্ধ করে স্বাধীনতাকেই।
দিনদুপুরেই জীপে একজন তরুণকে কানামাছি করে নিয়ে যায় ওরা
মনে হয় চোখ বাঁধা স্বাধীনতা নিয়ে যাচ্ছে বধ্যভূমিতে।
বেয়নেট বিদ্ধ লাশ বুড়িগঙ্গা কি শীতলক্ষ্যায় ভাসে।
মনে হয় স্বাধীনতা লখিন্দর যেন
বেহুলা বিহীন
জলের ভেলায় ভাসমান।
(শামসুর রাহমান/ সন্ত্রাসবন্দী বুলেটবিদ্ধ দিনরাত্রি, সচিত্র সন্ধানী, বিজয় দিবস সংখ্যা ১৯৭৯)
শামসুর রাহমান তখন দেশের ভেতরেই ছিলেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ভয়াল সময়ের চালচিত্র। নিঝুম পথে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়া, তরুণকে কানামাছি করে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া, ভেসে থাকা বেয়নেট বিদ্ধ লাশের ছবি এসব অভিজ্ঞতার বর্ণনা মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবচিত্রকে স্মৃতিসৌধ করে তুলেছে। কবি আল মাহমুদ লিখেছেন গত কয়েক মাস আমার স্বদেশভূমি স্বাধীনতা যুদ্ধে রক্তাক্ত হয়েছে। …দেশকে স্বৈরাচারী বর্বরতার হাত থেকে মুক্ত করার এই সর্বাত্মক যুদ্ধে আমার দেশবাসী প্রতিটি তরুণ-তরুণীর সাথে আমি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি। এ ব্যাপারে অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনার কোন প্রশ্নই ওঠেনি। এছিল বাঙালির অস্তিত্বের লড়াই
(আল মাহমুদের কবিতা, কলিকাতা থেকে প্রকাশিত গ্রন্থের ভূমিকা, ১৯৮১)।
মুক্তিসংগ্রামের কবিতা: ভয়াল দিনের চিত্র
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা ছিলেন পাকিস্তানি ঘাতকদের নির্মম বর্বরতার শিকার। ভয়, আতঙ্ক, ত্রাসের মধ্যে বসবাস করেও আমাদের কবিরা সংগ্রাম-মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়ে কবিতা রচনা করেছেন। ওপার বাংলায় যাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁরাও শব্দসৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন লেখনির মাধ্যমে। সেই সময়ের অনুভূতি ও বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছেন আমাদের কবিরা যার একটি চিত্র ফুটে ওঠেছে জসীমউদ্‌দীনের ‘দগ্ধগ্রাম’ কবিতায়
এইখানে ছিলো কালো গ্রামখানি, আম কাঁঠালের ছায়া/টানিয়া আনিত শীতল বাতাস, কত যেন করি মায়া।/কিসে কি হইল, পশ্চিম হতে নরঘাতকেরা আসি/সারা গাঁও ভরি আগুন জ্বালায়ে হাসিল অট্টহাসি।
সারা গাঁওখানি দগ্ধ শ্মশান, দমকা হাওয়ার ঘায়/দীর্ঘ নিঃশ্বাসে আকাশে পাতালে ভষ্মে উড়িয়া যায়।
নরঘাতকদের আক্রমণে এভাবেই বাংলার সবুজ গ্রাম, শ্যামল প্রকৃতি দগ্ধশ্মশান হয়ে যায়। পাকিস্তানি সৈনিকদের চেনা ছিল না এদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র শহর, গ্রাম ও বিস্তীর্ণ জনপদ; দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশাম্‌সবাহিনী ও পশুরূপী দেশীয় দালালরাই তাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসতো এইসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ঘাতকরা যখন যে গ্রামে ঢুকতো, নির্বিচারে বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে এক নারকীয় উৎসবে মেতে উঠতো এবং এদের প্রথম শিকার নারী আর শিশু। একাত্তরে হানাদারদের আক্রমণে বাংলাদেশের ছায়াঘন, স্নিগ্ধ গ্রামগুলো কিভাবে দগ্ধ হয়েছে, মানুষের ওপর কিরকম অত্যাচার, নির্যাতন চালানো হয়েছে, তারই একটি বাস্তবচিত্র ফুটে ওঠেছে জসীমউদ্‌দীনের উপরোক্ত কবিতায়।
দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার।/পুড়ছে দোকান পাট, কাঠ/লোহা লক্কড়ের স্তূপ, মসজিদ এবং মন্দির/দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার।
পালাচ্ছে শহর ছেড়ে দিগ্বিদিক। নবজাতককে/বুকে নিয়ে উদ্‌ভ্রান্ত-জননী/বন-পোড়া হরিণীর মত যাচ্ছে ছুটে/অদূরে গুলির শব্দ, রাস্তা চষে জঙ্গী জীপ
তুমি বলে ছিলে/ শামসুর রাহমান।
আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি বাজারের কথা উঠে এসেছে শামসুর রাহমানের এই কবিতায়। দাউ দাউ করে পুড়ে যাওয়া বাজার, দোকান পাট, মসজিদ, মন্দির, শহর ছেড়ে পালা”েছ মানুষ, সন্তান বুকে নিয়ে উদভ্রান্ত জননীর দৌড়, গুলির শব্দ, রাস্তায় জঙ্গি জীপ, হানাদারদের আক্রমণের মুখে মানুষের অসহায়ত্বের এসব দৃশ্য পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়। আক্রান্ত মানুষের আর্তচিৎকারে সেদিন আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল। বেদনার ভার সইতে পারেনি ভূমি। আমাদের কবিরা পাকবাহিনীর নারকীয়, পৈশাচিক ও ভয়াবহ নৃশংসতার চিহ্নস্বরূপ এসব ধ্বংসস্তূপ, বুলেটবিদ্ধ লাশ, রক্তাক্ত শার্ট, বিধ্বস্ত নগরীর এলোমেলো জনপদের চিত্র অত্যন্ত বেদনাহতভাবে তুলে ধরেছেন
ক. ভোরের আলো এসে পড়েছে ধ্বংসস্তূপের ওপর।/রেস্তোরাঁ থেকে যে ছেলেটি রোজ/প্রাতঃরাশ সাজিয়ে দিতো আমার টেবিলে/তে-রাস্তার মোড়ে তাকে দেখলাম শুয়ে আছে, রক্তাপ্লুত শার্ট পরে
শহীদ কাদরী/ নিষিদ্ধ জার্নাল
খ. হঠাৎ স্তব্ধতা বিদীর্ণ হয়ে যাবার একটি শব্দ আমরা শুনতে পাই।
হঠাৎ চব্বিশটি রক্তাক্ত দেহ, রমণী, শিশু, যুবক, প্রৌঢ়/আমরা দেখতে পাই এক মুহূর্তের জন্য/ রক্তাক্ত, লুণ্ঠিত এবং প্রাণহীন
সৈয়দ শামসুল হক/ অন্তর্গত
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকসেনারা জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মানবতার কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে মেতে উঠেছিল গণহত্যায়। তাদের পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ। বেগম সুফিয়া কামালের ‘মেহেরুন্নেসা’ কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে সেরকমই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের একটি দৃশ্য
কুমারী কিশোরী শাহানা রঙে মেহেদী লাগেনি হাতে/জালিম কাফের পিশাচেরা সেই হাতে/ অসহায়া মেয়ে মোর/শাণিত ছুরিকা হানিয়া কণ্ঠে তোর/তাণ্ডবলীলা শুরু করেছিল, রক্ত বাসনা তুই/পূত পবিত্র এক মুঠি ফুল, শেফালী, চামেলী জুঁই।
সুফিয়া কামাল/ মেহেরুন্নেসা,
(মুক্তিযুদ্ধ: নির্বাচিত কবিতা,সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল সম্পাদিত, নওরোজ কিতাবিস্তান, ঢাকা ১৯৮৭।)
কবি মেহেরুন্নেসা ষাটের দশকের একটি পরিচিত নাম। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ভাইসহ তিনি পাকবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। তারই বিবরণ তুলে ধরেছেন সুফিয়া কামাল। উজাড় হয়েছে বাড়িঘর, বস্তি; মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেছে কত সাজানো সংসার, স্মৃতি ও স্বপ্ন। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের একটি কবিতায় তা উঠে এসেছে এভাবে
ঘরের মধ্যে ঢুকলো মিলেটারী/ছড়িয়ে দিলো গুঁড়ো এবং
জ্বালিয়ে দিলো আগুন/মুহূর্তে সব ভস্ম হলো
দাদার যত দলিল এবং/দাদির যত মধুর স্মৃতি
নকশী কাঁথা, তোরঙভরা পুঁথি/কোরান শরীফ
পিতার যত পত্রাবলী, আলমারীতে
বাঁধানো বই, রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন
সুপ্রিয় শেক্সপীয়ার
মায়ের শাড়ি, হাঁড়িকুঁড়ি সাজানো সংসার।
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান/ ঘৃণা-ক্রোধের বারুদ
পঁচিশে মার্চের কালোরাতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের মধুদাকে নিয়ে শামসুর রাহমানের বেদনাহত উচ্চারণ
আপনি ছিলেন প্রিয়জন আমাদের/বড়ো অন্তরঙ্গ ঘটনার
উৎসব এবং দুর্বিপাকে। বুঝি তাই আপনার রক্তে ওরা মিটিয়েছে তৃষ্ণা
আমাদের প্রিয় যা কিছু সবি তো ওরা/হত্যা করে একে একে।
শামসুর রাহমান/ মধুস্মৃতি।
শামসুর রাহমান মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে ‘বন্দি শিবির থেকে’ শিরোনামে একক গ্রন্থ’ রচনা করেন। এরকম আর কোন কবির একক গ্রন্থ’ নেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। আমার মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধ শামসুর রাহমানকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। কবির ভাষ্যমতে, বন্দি শিবির থেকে কবিতাগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের একটা তরতাজা অনুভূতির আমেজ পাওয়া যায়। এছাড়া তাঁর ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ, বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে ইত্যাদি গ্রন্থের কবিতাগুলোতেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জাগর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ‘স্বাধীনতা তুমি’ কিংবা ‘তুমি আসবে বলেই হে স্বাধীনতা’ কবিতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতির বিবেককে যুগ যুগ ধরে উজ্জীবিত করবে বলে আমার বিশ্বাস। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদারদের নির্মম অত্যাচারের শিকার হয় এদেেেশর নারী। শুধু ধর্ষণ নয়, তাদের পৈশাচিক লালসার শিকার হয়েছে এদেশের অসংখ্য নারী হাসান হাফিজুর রহমানের ‘বীরাঙ্গনা’ কবিতায় তেমনি একটি দৃশ্য/তোমার ঠোঁটে দানবের থুথু
স্তনে নখবের দাগ, সর্বাঙ্গে দাঁতালের ক্ষতচিহ্ন প্রাণান্ত গ্লানিকর।
লুট হয়ে গেছে তোমাদের নারীত্বের মাহর্ঘ্য মসজিদ।
উচ্ছিগদগে লঞ্ছনা তোমরা/পরিত্যক্ত পড়ে আছ জীবনের ধিক্কৃত অলিন্দে নাকচ তাড়িত/লাঞ্ছনার বেদীমূলে তোমরা সবাই/একেকটি জীবন্ত স্মৃতিচিহ্ন হয়ে গেছ আজ/সংগ্রামের খরপ্রাণকণা অনশ্বর বীরঞ্জনা।
হাসান হাফিজুর রহমান/ বীরাঙ্গনা
যুদ্ধের পুরো নয় মাস ধর্ষণ ও লাঞ্ছনার কালো সময় পার করেছে বাংলাদেশের নারীরা। আসাদ চৌধুরীর কবিতায় সেই নির্যাতন প্রত্যক্ষ করার জন্য বিশ্ব বিবেককে আহ্বান জানিয়েছেন এভাবে
টু-উইমেন ছবিটা দেখেছ বারবারা ?/গীর্জায় ধর্ষিতা সোফিয়া লোরেনকে দেখে নিশ্চয় কেঁদেছিলে/আমি কাঁদিনি, বুকটা শুধু খাঁ খাঁ করেছিলো/সোফিয়া লোরেনকে পাঠিয়ে দিয়ো, বাংলাদেশের/তিরিশ হাজার রমণীর নির্মমতার অভিজ্ঞতা শুনে/তিনি শিউরে উঠতেন।
আসাদ চৌধুরী/ বারবারা বিডলার-২,
আবুল হাসনাত সম্পাদিত, মুক্তিযুদ্ধের কবিতা, সন্ধানী প্রকাশনী, ঢাকা ১৯৯৩।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পুরো দেশ যেন মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়। শহরগুলো যেন হঠাৎ বধ্যভূমি হয়ে যায়। শকুনের মতো আকাশে উড়তো শত্রুর বিমান, মেশিনগান খই ফোটাতো যত্রতত্র। বিবাহযোগ্য বোনের রক্তে জবজব হতো ডুরেশাড়ি, যে মা ছিল আসন্ন প্রসবা শত্রুর বেয়নেটের খোঁচায় তার পেট থেকে বেরিয়ে এসেছিলো নিষ্পাপ শিশুর মাথা, কুষ্টিয়ায় বোমা পড়ল, পড়ল চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেটেও; মেঘনায় চলন্ত নৌকায় হঠাৎ মর্টারের ভয়ঙ্কর গুলির শব্দে কেঁপে ওঠল পাড়ের ভূমি। ভগ্নস্তূপে কুকুরের আর্তনাদ। কবি দিলওয়ারের কাছে পুরো দেশকে মনে হয়েছে পাবলো পিকাসোর আঁকা ‘গুয়ের্নিকা’ ছবির মতো।
আকৈশোর আমার চোখে ‘গোয়ার্নিকা’-ই বাংলাদেশ/আমি স্পেনের মতো বিশালকায় এই উপমহাদেশে/মানুষের ভালোবাসা ও শ্রমের সুগন্ধ নিতে নিতে/বারবার ফিরে আসছি প্রিয় জন্মভূমি-এই ‘গোয়ার্নিকায়’।
পাবলো পিকাসোর আঁকা বিশ্ববিখ্যাত ছবি ‘গুয়ের্নিকা’ স্পেনে গৃহযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি গ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠেছে কবি দিলওয়ারের কাছে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ। দেশমাতৃকার মতো এদেশের নারীরাও হয়েছে ছিন্ন-ভিন্ন- ধর্ষিতা, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানেই এক দুঃখময় অতীত, যন্ত্রণাদগ্ধ এক অধ্যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বাংলার নারীদের এই আত্মত্যাগ ইতিহাসে মুক্তির উজ্জ্বল প্রেরণা হিসেবে বিরাজ করবে। পাকিস্তানি সৈন্যদের বর্বরতা আর নৃশংসতা দেখে শুধু কবি নয় শিল্পীরাও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ঘাতক ইয়াহিয়ার ছবিকে জল্লাদের ছবি হিসেবে এঁকে ঘৃণা প্রকাশ করেছেন চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান। কবির লেখায় উঠে এসেছে তীব্র বিক্ষোভ/টিক্কার ইউনিফর্মে শিশুর মগজ
যুবকের পাঁজরের গুঁড়ো/নিয়াজির টুপিতে রক্তের প্রস্রবণ/ফরমান আলীর টাইয়ের নটে ঝুলন্ত তরুণী/তুমি কি তাদের কখনো করবে ক্ষমা?/শামসুর রাহমান/ রক্তসেচ
বাংলাদেশের কবিরা কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের ভয়ালদিনের চিত্র অঙ্কন করেছেন একাত্তরের ভীত-সন্ত্রস্ত অভিজ্ঞতার আলোকে। এ চিত্রের মধ্যে শৈল্পিক সুষমার চেয়ে বাস্তবতাবোধের তীব্রতা অনেক বেশি। কারণ বিশ্বের অন্যান্য দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে একযুগে যা ঘটেছে, বাংলাদেশে নয় মাসের যুদ্ধে ভয়াবহ নির্মমতার ঘটনা ঘটেছে তারচেয়েও বেশি। হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, মৃত্যু, সম্পদহানী সীমাহীন; এত অল্পসময়ের মধ্যে, এতবেশি প্রাণের সংহার আর কোনোদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কখনো ঘটেনি।
কবিতায় বিম্বিত মুক্তিসেনা
আক্রান্ত স্বদেশকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করার জন্য এদেশের আবাল বৃদ্ধা, তরুণ, যুবা দলে দলে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো। যুদ্ধে যোগদানের অনুভূতি ব্যঞ্জিত হয়েছে কবি নাসিমা সুলতানার কবিতায় যাওয়ার আগে সবকটা গ্রাম আর শহরকে জানিয়ে যাই যুদ্ধে যাচ্ছি/কাশকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলি/ যুদ্ধে যাচ্ছি/ যে ফুলগুলো এখনো ফুটেনি …তাকেও বলি/ যুদ্ধে যাচ্ছি (যুদ্ধে যাওয়ার গল্প)। আল মাহমুদের কবিতায় মুক্তিযোদ্ধাকে বলা হয়েছে
নিজেকে বাঁচাতে হলে পরে নাও হরিৎ পোশাক,/সবুজ শাড়িটি পরো ম্যাচ করে, প্রজাপতিরা যেমন/জন্ম-জন্মান্তর ধরে হয়ে থাকে পাতার মতন/প্রাণের ওপরে আজ লতাগুল্ম পত্রগুচ্ছ ধরে/তোমাকে বাঁচাতে হবে হতভম্ব সন্ততি আমার।/জেনো শত্রুরাও পরে আছে সবুজ কামিজ/শিরস্ত্রানে লতাপাতা, কামানের ওপর পল্লব
ক্যামোফ্লাজ/ আল মাহমুদ
শত্রুরা যেমন কামানের উপর লতাপাতা দিয়ে, সবুজ কামিজ পরে আছে, ঠিক তেমনি শত্রুকে মোকাবেলা করার জন্য, নিজেকে বাঁচাতে হবে, প্রাণের উপর লতাগুল্ম পত্রগুচ্ছ ধরে, হরিৎ-সবুজ কামিজ পরে গাছগাছালির আড়ালে, প্রজাপতির মতো ছদ্মবেশ ধারণ করতে হবে। যুদ্ধের সময় একটি পরিচিত শব্দ ছিলো ‘গেরিলা’। যারা মূলত ছদ্মবেশ ধারণ করে শত্রুবিনাশের কাজ করতো তাদের বলা হতো ‘গেরিলা’। কিন্তু এই গেরিলা দেখতে কেমন, কেউ কখনো দেখেনি, দেখলেও চিনতে পারেনি। ক্রমে মানুষ চিনেছে, না জটাজালধারী অপরিচিত কেউ নয়, গেরিলা, তাদেরই ভাই, তাদেরই সন্তান, গ্রামের মানুষ দেখেছে গেরিলাকে।
দেখতে কেমন তুমি? অনেকেই প্রশ্ন করে, খোঁজে/কুলুজি তোমার আঁতিপাতি। তোমার সন্ধানে ঘোরে/ঝানু গুপ্তচর, সৈন্য পাড়ায় পাড়ায়। তন্ন তন্ন করে/খোঁজে প্রতিঘর। পারলে নীলিমা চিরে বের/করতো তোমাকে ওরা, দিতো ডুব গহন পাতালে।/তুমি আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছো হাত ধরে পরস্পর।/সর্বত্র তোমার পদধ্বনি শুনি, দুঃখ তাড়ানিয়া/তুমি তো আমার ভাই, হে নতুন, সন্তান আমার।
গেরিলা/ শামসুর রহমান
এই গেরিলাকে পিতাও চিনতে পারে না। ঝানু গুপ্তচর তন্ন তন্ন করে খোঁজে, প্রয়োজনে পাতালেও ডুব দেয়, অনেকে প্রশ্ন করে, গেরিলা দেখতে কেমন? অথচ সে তো তাদেরই ভাই, তাদেরই সন্তান, সে আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছে হাত ধরাধরি করে সামনে। দু’দিনেই তাকে অচেনা মনে হয়/ সন্ধ্যায় পড়ার ঘরে একা বসতে ভয় পেতো। নিজেই নিজের ছায়া দেখে কেঁপে উঠতো/ …তাকে যেন দু’দিনেই অচেনা মনে হয়/ কোথায় বেরিয়ে যায় একা একা ব্যস্ত পায়ে/একা একা/ (আমার সন্তান/ আহসান হাবীব) গেরিলা তো এরকমই। সৈয়দ শামসুল হকও তাঁর ‘গেরিলা’ কবিতায় বলেছেন সতর্ক নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে যাও সারাদিন সারারাত যখন গ্রামগুলো/ জনশূন্য চাতাল চিড় খাওয়া আর উপাসনা চত্বরগুলো ঝরাপাতায়/ অনবরত ঢেকে যায় …দাউ দাউ/ নাপামের/ মধ্যে তুমি/ হেঁটে যাওয়া/ উদ্যত/ একাকী জনশূন্য জনপদে/ উজ্জ্বল এক চিতা। মুক্তিযোদ্ধাকে কবিতার অক্ষরে শব্দায়িত করেছেন আমাদের কবিরা বিভিন্নভাবে। হুমায়ুন কবির মুক্তিযোদ্ধাকে চিত্রিত করেছেন আপন ছোটভাইয়ের চিত্রকল্পে যে ভালবাসতো স্বাধীনতা; জননীর নিষেধ সে মানেনি, পিতার অবাধ্য হয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল সে/স্টেনগানের প্রতিটি ঝলকে বাজাল উজ্জ্বল সুর/শৈশবের বল ছুড়লো গ্রেনেডে, অকম্পিত সঙ্গীন/বিঁধলো শত্রু দেহ। আমার নিজের ভাই/বড় বেশি ভালো সে বাসতো স্বাধীনতা/জননীর নিষেধ মানেনি, পিতার অবাধ্য হয়েছিল
পতাকার রক্তিম সাহস তাকে ডাক দিল/স্বদেশের ছবি রক্তে, ঝাঁপ দিল স্বদেশের নামে
আমার ভাই/ হুমায়ুন কবির
কখনো কবিতার পঙ্‌্‌ক্তিতে মুক্তিযোদ্ধার অসীম শৌর্যবীর্য ও সাহসের কথা ধ্বনিত হয়েছে। কখনো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা দিয়ে কবিরা শব্দগুচ্ছ উচ্চারণ করেছেন। কখনো কবি নিজেই শব্দসৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। প্রাণের বিপুল প্রবাহ মুক্তির নেশায় সমস্ত বাঁধন ছিঁড়ে সূর্যের মতো দীপ্ত হয়েছেন। সমস্ত অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সে প্রবাহ হয়েছে খড়গের মতো উদ্যত। এই বিপুল প্রবাহ রুখবে কে? দিকে দিকে তাই তখন তার জয়যাত্রা। এ জয়যাত্রা মানুষের চিরকালের ইতিহাসে সূর্যের আলোয় লেখা হয়ে থাকবে। মুক্তিযোদ্ধার রাইফেল থেকে বেরিয়ে আসছে ভালোবাসা। আর তার আক্রমণের ফলে উঁচু দালানের শির থেকে ছিঁড়ে পড়ে চাঁনতারা মার্কা বেঈমান পতাকা/তোমার রাইফেল থেকে বেরিয়ে আসছে গোলাপ/তোমার মেশিনগানের ম্যাগজিনে ৪৫টি গোলাপের কুঁড়ি/তুমি ক্যামোফ্লেজ করলেই মরা ঝোঁপে ফোটে লাল ফুল বস্তুত/দস্যুর…………
তুমি পা রাখতেই/প্রেমিকার কোমল দেহের মত যশোর কুমিল্লা ঢাকা
অত্যন্ত সহজে আসে তোমার বলিষ্ঠ করতলে/আর তোমাকে দেখলেই উঁচু দালানের শির থেকে/ছিঁড়ে পড়ে চানতারা মার্কা বেঈমান পতাকা।
মুক্তিবাহিনীর জন্যে/ হুমায়ুন আজাদ
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলার ঘরে ঘরে প্রত্যাশার একটিই নাম ছিল স্বাধীনতা। স্বাধীনতা শব্দটিকে আমাদের কবিরা সর্বোত্তম ব্যবহার করেছেন। ‘স্বাধীনতা’ এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো, সেই বর্ণনা নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় মঞ্জুরিত হয়েছে এভাবে
একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে/লক্ষ লক্ষ উন্মক্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে/ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে কখন আসবে কবি?
………………
শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মত দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন
………………………..
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর কবিতাখানি,
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’/সেই থেকে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আমাদের।
স্বাধীনতা এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো/ নির্মলেন্দু গুণ
শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় মুক্তযুদ্ধকে বিম্বিত করেছেন মর্মস্পর্শীভাবে। সে সময় তিনি ছিলেন দেশের ভেতরে; মৃত্যুশাসিত দিন আর বুলেটবিদ্ধ জীবনকে প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। তাঁর অবলোকন ও অভিজ্ঞতায় কবিতায় এসেছে শিল্পিতভাবে, একাত্তরের হৃদপিণ্ড যেন উঠানামা করছে তার কবিতায়। তাঁকে গ্রাস করেছে বাস্তব নৈঃসঙ্গ্য, একমাত্র স্বপ্নের স্বাধীনতা ছাড়া যেন কেউ নেই তাঁর আশেপাশে; আর তিনি তা সঞ্চারিত করে দিয়েছেন তাঁর কবিতার মধ্যে। কবিতায় তিনি বারবার সুস্মিতস্বরে সম্বোধন করেন তাঁর অধরা প্রিয় স্বাধীনতাকে। স্বাধীনতা-সম্বোধনের পৌনঃপুনিক ব্যবহার দেখা যায় তাঁর ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ এবং ‘স্বাধীনতা তুমি’ নামক দুটি কবিতায়। কবিতা দুটোর অভ্যন্তরে রয়েছে স্লোগানের স্রোত, কিন্তু শামসুর রাহমান স্লোগানস্রোতকে শাসন করেছেন নরম আবেদনে। ফলত যা কোলাহল হয়ে উঠার আশঙ্কা ছিল, তা হয়ে উঠেছে অশ্রুসজল সম্বোধন তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা/ তোমাকে পাওয়ার জন্য/ আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়? আবেদন, সম্বোধন, প্রশ্নাকুলতা মিলেছে নরমভাবে ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’য়। কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবকে তিনি স্বাধীনতা আসার পথ তৈরির যে সব ছবি সাজান, সে সব ছবি প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্রের সীমা অতিক্রম করে, শোভাময়তা পেরিয়ে হয়ে ওঠে সময়াতিক্রম্য ও মর্মবিদারক। দুটি চিত্র
(ক) তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা/শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাংক এলো/ দানবের মত চিৎকার করতে করতে (খ) তুমি আসবে বলেই হে স্বাধীনতা/ অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতা মাতার লাশের ওপর।
খুব সরলভাবে বিবৃত হয়েছে দুটি ঘটনা জলপাই রঙের ট্যাংক আসার ও পিতামাতার লাশের ওপর অবুজ শিশুর হামাগুড়ি দেয়া যেন এরা স্বাধীনতাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য জড়ো হয়েছে রঙিন পতাকা দুলিয়ে রাজপথে। কিন্তু এ মর্মপীড়ক সারল্যের ভেতর শামসুর রাহমান ঢুকিয়ে দিয়েছেন বাংলার স্বাধীনতা সম্ভাষণের ভয়াবহতা। ভয়াবহ, মর্মপীড়ক তাঁর ওই পংক্তিগুচ্ছ, কেননা তিনি যে ঘটনারাশিকে স্বাধীনতার অচ্ছেদ্য অংশরূপে আশ্চর্য সরলতায় বর্ণনা করেছেন, সেগুলো বাঙালির জীবনের কালো অভিজ্ঞতা। স্বাধীনতা-সম্বোধন ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় প্রায় গানে পরিণত হয়েছে, যদিও সম্ভাবনা ছিলো স্লোগানে পরিণত হওয়ার। কবিতাটি যে স্লোগান শিহরিত না হয়ে সুরমুখরিত হয়েছে, এর মূলে রয়েছে শামসুর রাহমানের নৈঃসঙ্গ্য পাশে কেউ নেই, রৌদ্রখচিত রাস্তায় নামার উপায় নেই; তাই সম্ভব শুধু একান্তআন্তরিক, রূপময়, অতিশয়োক্তি উজ্জ্বল, প্রিয় সম্বোধন স্বাধীনতা। স্বাধীনতাকে তিনি সাজিয়েছেন, নানা রঙে-রূপে-সুরে, আর সেই রঙ-রূপ-সুর তিনি সংগ্রহ করেছেন বাংলার স্বপ্ন-নিসর্গ-জীবন থেকে; তাই স্বাধীনতা কখনো অভিন্ন হয়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের গানের সাথে, কখনো বাবরি দোলানো কবির সাথে, বোনের হাতের পাতায় মেহেদির রঙের সাথে মজুরের বাহুর পেশির সাথে (শামসুর রাহমান:নিঃসঙ্গ শেরপা/ হুমায়ুন আজাদ, বাংলা একাডেমি, ১৯৮৩ পৃষ্ঠা: ৮৩/৮৪)। কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা শব্দটি কি করে আমাদের হলো’ কবিতায় যেমন রয়েছে স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের মহান আহ্বানের কথা। শেখ মুজিবের এই ঐতিহাসিক ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের মুক্তিসেনাদের প্রেরণা জুগিয়েছিল শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। কবিতায় যেমন এই ঐতিহাসিক ভাষণের অমোঘ-অব্যর্থ মর্মবাণী এবং আহ্বানের চিত্র উঠে এসেছে, তেমনি শেখ মুজিবের প্রতি নিবেদিত হয়েছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। অকালমৃত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে সেই অমর বজ্রকণ্ঠের স্মরণীয় পংক্তি
মনে কি পড়েনা ঘন বটমূল, রেসকোর্স উদ্যান?/একটি কণ্ঠে বেজে উঠেছিল জাতির কণ্ঠস্বর/শত বছরের কারাগার থেকে শত পরাধীন ভাষা
একটি প্রতীক কণ্ঠে সেদিন বেজেছিল স্বাধীনতা।
হাড়েরও ঘরখানি/ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
ষাটের সবচেয়ে নিরীক্ষাপ্রবণ কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ। সুররিয়ালিষ্টিক চেতনায় তাঁর কবিতা কিছুটা দুর্বোধ্য বলে কবিতার ভেতরভুবনে অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করলেও শেষপর্যন্ত সনেটের গোনাগুনতি কর্মেই তিনি আত্মসাক্ষাৎ লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাঁর কবিতাকেও আরক্ত করেছে। অধিক শিল্পনিষ্ঠ হয়েও কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ স্বদেশভাবনায় সমুজ্জ্বল। যৌনতাকে শিল্পমাত্রায় দীপিত করে কবিতায় ব্যবহার করেছেন তিনি। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে মান্নান সৈয়দ বেশ কয়েকটি কবিতা লিখেছেন এবং সেগুলো তথাকথিত মায়াকান্নায় পর্যবসিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনিবার্য অনুষঙ্গ তাঁর কবিতায়ও ধ্বনিত হয়েছে নানাভাবে।
স্বাধীনতা: বিজয় ও গৌরবের পংক্তিমালা
মুক্তিযুদ্ধের সময়েই শুধু নয়, যুদ্ধোত্তর সময়েও আমাদের সমস্ত নবীন প্রবীণ কবিদেরকে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি বড়বেশি আলোড়িত করেছে। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিকে নিয়ে, স্বাধীনতাকে উপলক্ষ্য করে গত চার দশকে অসংখ্য কবিতা রচনা করেছেন কবিরা। এসব কবিতায় কবিদের শুধু আবেগই ধ্বনিত হয়নি, কবিতার পংক্তিতে মঞ্জুরিত হয়েছে বিজয় ও গৌরবের অহংকার। দীর্ঘ সংগ্রামের পর তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ষোলই ডিসেম্বর বাংলার স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য উদিত হলো, অর্জিত হলো স্বাধীনতা। পুনর্জন্ম হলো যেন বাঙালি জাতির; শহীদদের উদ্দেশ্য করে কবি বলছেন
তোমাদের হাড়গুলো বাংলার হৃদপিণ্ডে অবিনাশী ঝড়/বাঙালির জন্মতিথি, রক্তে লেখা ষোল ডিসেম্বর।
বাঙালির জন্মতিথি/ মুহম্মদ নুরুল হুদা
শহীদদের হাড়গুলো বাংলার হৃৎপিণ্ডে অবিনাশী ঝড়, আর রক্তে লেখা ষোলই ডিসেম্বর বাঙালির জন্মতিথি; এ যেন বাঙালির প্রদীপ্ত অহংকার, যে অহংকার শুধু রক্তের বিনিময়েই অর্জন করা সম্ভব। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতির মুক্তি বা স্বাধীনতার ইতিহাস মূলত রক্তক্ষয়ের ইতিহাস। অর্জিত স্বাধীনতা তাই যুদ্ধত্তোর কবিতার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হিসাবে কাজ করেছে কবি ও কবিতাকর্মীদের চৈতন্যে। শামসুর রাহমানের কবিতায় যেমন স্বাধীনতা শব্দটির সর্বোচ্চ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় তেমনি এসময়ের সমস্ত কবির কবিতায়ও মুক্তিসংগ্রামের গৌরব, সাহস, উল্লাস উচ্চারিত হয়েছে বারবার। সত্তরের কবি ময়ুখ চৌধুরীর কবিতায় স্বাধীনতাকে আহ্বান জানানো হয়েছে এভাবে
হে আমার প্রিয় স্বাধীনতা, তুমি এসো।
তোমার মুখোশ পরে স্বপ্নে আর জাগরণে বারবার কারা আসে যায়
তোমার মুখশ্রী আমি চিনি, হে আমার স্বাধীনতা, তুমি এসো।
দূরে, আরো দূরে কোনো নির্জন দুপুরে, কোন ছোটখাটো রেল-ইস্টিশনে
ইঞ্জিনের আর্ত হুইশেলে/কেঁপে উঠে কাশবন। সে-রকম/শীতের মতন, শাদা মায়ের মতন কোনো নারী/বাসন-কোশন মাজা হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে চেয়ে থাকে
………………………………..
বহুদিন পরে গাঁয়ে ফেরা সন্তানের পথ চেয়ে থাকে/সে রকম উত্তরাধিকার হে আমার প্রিয় স্বাধীনতা।
স্বাধীনতা, প্রিয় স্বাধীনতা/ ময়ুখ চৌধুরী
নির্জন দুপুরে ছোট খাট কোনো রেল-ইস্টিশনে হুইশেল বাজিয়ে আসা রেলের মতো, সেই রেলে বহুদিন পরে সস্তানের গাঁয়ে ফিরে আসার মতো, পুকুরঘাটে বাসনকোশন মাজা হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা মায়ের মতো স্বাধীনতাকে প্রত্যাশা করেছেন কবি। হাসান হাফিজুর রহমান বলেছেন আমার নিঃশ্বাসের নাম স্বাধীনতা (এখন সকল শব্দই)। রফিক আজাদ তাঁর কবিতায় স্বাধীনতাকে প্রিয়তম নারীর হাতে তুলে দিতে চেয়েছেন এভাবে
নেবে স্বাধীনতা? নাও, তোমার দু’হাতে তুলে দিচ্ছি/পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের ভেতরে যা কিছু-/জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে সবকিছুই তোমার, তোমার;/এই দেশ স্বাধীন করেছি আমি আমার দু’হাত/এ আমার একমাত্র অহংকার আর কিছু নেই;/আমার দেশটি আমি প্রিয়তম নারীর দু’হাতে/দ্রুত তুলে দিতে চাই………… নাও, তুমি নাও।
নেবে স্বাধীনতা/ রফিক আজাদ
এই দীর্ঘ কবিতায় রফিক আজাদ তুলে এনেছেন বাঙালির সমস্ত অবয়ব, একুশের মায়া, দ্বাদশ মাসের ষোল, মার্চের ছাব্বিশ, সারি সারি গাছপালা, জ্যোৎস্না, কুয়াশার আস্তরণ, গ্রামের হরিৎ পত্রালি, বাঁশঝাড়, শিউলিঝরা ভোর, শীতসকালের রোদ, শিমূলতুলোর ওড়াওড়ি, সুন্দরবনের চিত্রল হরিণ, বঙ্গোপসাগরের ঢেউ, কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত তথা বাংলার অগণিত নিসর্গরূপ ও যুদ্ধকালীন বহু ঐতিহাসিক দিনকে। সিকদার আমিনুল হক স্বাধীনতাকে দেখেছেন তাঁর সমস্ত অস্তিত্বের মধ্যে, নির্দোষ চুম্বনে, বাউলের গানে, নৈশকীর্তনে, মেঘনা-পদ্মার ধারে; যেখানে ঊষর মাটিতে বৃষ্টি পড়ে, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাটে, বিস্তীর্ণ প্রান্তরব্যাপী
স্বাধীনতা আমি তোমার জন্যে/এই জতুগৃহে, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট আর
খাকিদের প্রকাশ্য দৌরাত্মের নিচে/গেরিলার আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছি।
কোন এক দগ্ধ দিনে/ সিকদার আমিনুল হক
জতুগৃহ, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট আর খাকিদের প্রকাশ্য দৌরাত্ম্যের নিচে সিকদার আমিনুল হক যেমন গেরিলার আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছেন, তেমনি রুবী রহমান তাঁর কবিতায় স্বাধীনতাকে স্মরণ করেছেন শহীদের আত্মদানের কথা তোমার জন্য লক্ষ তরুণ রক্তের বীজ বুনে রেখে গেছে/ স্বাধীনতা তুমি ভুলেছ সে কথা/ একটি যুবক বুকের পাঁজরে স্বপ্নের মতো রেখেছে গ্রেনেড/ স্বাধীনতা তুমি ভুলেছ সে কথা (স্মৃতিজাগানিয়া পদ্য)। খালেদা এদিব চৌধুরীর কবিতায় স্বাধীনতাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে
তোমার জন্যেই হিরোশিমার কুমারী-শরীর বেয়ে/ঝরে গেছে রক্তের দাহ। তোমার জন্যেই নাগাসাকি/মাইলাই; তোমার জন্যেই ‘জয়বাংলা’ অমর শ্লোগান,/হায় কী অমৃত লুকিয়ে রাখলে তুমি স্বাধীনতা
চিরকাল স্বাধীনতা/ খালেদা এদিব চৌধুরী
আবুল হাসান তাঁর কবিতায় স্বাধীনতাকে দীপান্বিত করেছেন এভাবে ছোটো ভাইটিকে আমি কোথাও দেখিনা/ নরোম নোলক পরা বোনটিকে আজ আর কোথাও দেখিনা/ কেবল পতাকা দেখি/ কেবল পতাকা দেখি/ স্বাধীনতা দেখি/ তবে কি আমার ভাই আজ ঐ স্বাধীন পতাকা?/ তবে কি আমার বোন, তিমিরের বেদীতে উৎসব ? (উচ্চারণগুলি শোকের/ আবুল হাসান)।
যুদ্ধের শেষে মুক্তিযোদ্ধারা ঘরে ফিরেছে। শত্রুমুক্ত স্বদেশের মাটিতে পা রেখে আনন্দিত বীরসন্তানেরা। পরীক্ষা শেষে পাশ করে ঘরে ফেরার আনন্দের মতো, যুদ্ধজয়ের পর গৌরবের দর্পিত অহংকারে উল্লসিত মুক্তিসেনাদের চোখে মুখে উতলে পড়ছে হাসি। এই আনন্দ বাঙালির জীবনে মাত্র একবারই এসেছিল। ১৯৭১ সালে ষোলই ডিসেম্বর। হানাদারমুক্ত স্বদেশের ঘরে ঘরে ছিল অপার আনন্দের ধারা। মা তার সস্তানের অপেক্ষায় ছিল, যুদ্ধশেষে সন্তান তার ঘরে আসবে, বাবা তার ছেলের মুখের দিকে চেয়ে ভুলে যাবে অত্যাচারের সমস্ত গ্লানি, বিজয়ের গৌরব নিয়ে ছেলে ঘুরে ফিরবে সারাটি পাড়া। গঞ্জে, গ্রামে, নদীর ঘাটে অপেক্ষা করছে মানুষ, দেশের সূর্যসন্তানেরা আসছে
যুদ্ধজয়ের পর
মুক্তিযোদ্ধারা নৌকা থেকে নামতে শুরু করেছে/ওরা কেউ পরেছে লুঙ্গি, কেউ ফুলপ্যান্ট,/কেউ বা হাফপ্যান্ট।
…………………
গ্রামবাসীরা দৌড়ে গিয়ে ওদের জড়িয়ে ধরলো/ওদের অস্ত্রগুলো ধরে ধরে দেখতে লাগলো/কেউ বা স্টেনগান নাকের কাছে তুলে ধরলো/যেন চামেলির গন্ধ বুক ভরে টেনে নেবে।
অষ্টগ্রামে সমবেত মুক্তিযোদ্ধা ও জনতা/ আলতাফ হোসেন
বস্তুত ষোলই ডিসেম্বর বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধারা এরকমই কাঙ্ক্ষিত ছিলো। দারুন আবেগে লোকেরা তাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই তাদের অস্ত্রগুলো বারবার হাত বুলিয়ে দেখেছে, যেন থ্রি নট থ্রি বন্দুকের হিমশীতল নলের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল স্বাধীনতা নামের সেই পরশপাথর। মুক্তিযোদ্ধারা ঘরে ফিরছে, তাদের বুকভরা বিজয়ের আনন্দ এমনি অনুভূত হয়েছে কবি মাহমুদ আল জামানের কবিতায়
যখন ফিরছি/ইউটিবির পাশে/সমস্ত কিছু ভরে কানায় কানায়
যুদ্ধ জয় করা/একটি বুক।
যখন ফিরছি/ মাহমুদ আল জামান
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণা অনুযায়ী দলে দলে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্রসমর্পণ করেছে। সমর্পণ করতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, যদি আবার কখনো দেশের প্রয়োজন হয় তবে আবার তুলে নিবে অস্ত্র। কেননা, এই অস্ত্রের সাথেই তাদের সখ্যতা। নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় সেই অনুভব এসেছে এভাবে
পুলিশ স্টেশনে ভিড়, আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিচ্ছে শহরের/সন্ধিগ্ধ সৈনিক। সামরিক নির্দেশে ভীত মানুষের/শটগান, রাইফেল, পিস্তল এবং কার্তুজ যেন দরগায়/স্বীকৃত মানৎ-টেবিলে ফুলের মতো মাস্তানের হাত!
আগ্নেয়াস্ত্র/ নির্মলেন্দু গুণ
নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে অস্ত্রসমর্পণের আনুষ্ঠানিক চিত্রটি। পুলিশ স্টেশনে ভিড়, অস্ত্র জমা নিচ্ছে। শটগান, রাইফেল, পিস্তল, দরগায় মানতের বস্তুর মতো টেবিলে স্তূপাকার অস্ত্র। কিছু অস্ত্র জমা দিলেই কি সব শেষ হয়ে যায়? না, যায় না, বুকের ভেতর সযত্নে জমা থাকে ট্রেনিং। তাই দেশের যে কোনো দুর্যোগে আবার তুলে নেবে হাতে সেই অস্ত্র। মুক্তিযোদ্ধার সেই প্রত্যয় উচ্চারিত হয়েছে কবি হেলাল হাফিজের শব্দগুচ্ছে
মারণাস্ত্র মনে রেখো ভালোবাসা তোমার আমার/নয় মাস বন্ধু বলে জেনেছি তোমাকে কেবল তোমাকে/বিরোধী নিধন শেষে কতদিন অকারণে/তাঁবুর ভেতর ঢুকে দেখেছি তোমাকে, বারবার কতবার।
………………….
অথচ তোমাকে আজ সেই আমি কারাগারে/সমর্পণ করে, ফিরে যাচ্ছি ঘরে
…………………
যদি কোনোদিন আসে আবার দুর্দিন/ভেঙ্গে সেই কারাগার/আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার।
অস্ত্র সমর্পণ/ হেলাল হাফিজ
মুক্তিযুদ্ধসংলগ্ন দশক হচ্ছে সত্তরের দশক। স্বাধীনতা-উত্তর সত্তর দশকের কবিদের অগ্নিময় অভিব্যক্তি কবিতার পঙ্‌্‌ক্তিতে পঙ্‌্‌ক্তিতে ঘূর্ণির মতো পাক খেয়েছে। কারণ তাঁরা ছিলেন স্বাধীনতার প্রথম প্রজন্মের কবি। তাঁরা উত্তাল যৌবনে দেখেছেন তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ দেশমাতৃকার আন্দোলন, সংগ্রাম। তাঁদের মানসে স্বাধিকার-চেতনা স্থায়িত্ব লাভ করেছিল তখন থেকেই। এই সত্তর দশকের প্রধান কবি আবিদ আজাদ। আবিদ আজাদ মানেই সত্তর দশক, সত্তর দশক মানেই আবিদ আজাদ এরকম অভীধায় কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ অভিষিক্ত করেছিলেন আবিদ আজাদকে। আবিদ আজাদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটু ব্যতিক্রমী মাত্রা লক্ষ্য করা যায়। তিনি শুধু ভূখণ্ডগত স্বাধীনতা পেয়েই তুষ্ট থাকেননি। অনেকাংশে মানবিক মুক্তির প্রত্যাশাও তাঁর কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। আসলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও তা-ই। স্বাধীনতা শুধু ভূখণ্ডগত স্বাধীনতা নয়, মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র বিদেশী শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তি নয়। এ যুদ্ধ ছিলো বাঙালি জাতির সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক স্বাধীনতার যুদ্ধ। তাঁর বিভিন্ন কবিতায় এই চেতনার উজ্জ্বল উপস্থিতি রয়েছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ’ ঘাসের ঘটনা (১৯৭৬) নামকরণের মধ্যেও আবহমান সবুজ বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে নির্মিত কহ্লারে যেন পাই আবক্ষ বাংলাদেশ’ আবিদ আজাদের এই বিখ্যাত কবিতায় তাঁর চেতনা ধরা পড়েছে এভাবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে ফুটে উঠলো এক শাদা কহ্লার
আমাদের লোককাথার হংসগুচ্ছের মতো/রবীন্দ্রনাথের মতো
পিছনে মেঘের মতো বিশাল মিছিল নিয়ে আসা
মাওলানা ভাসানীর মতো/একঝাঁক পায়রা-ওড়া শেখ মুজিবের হাতের মতো/বাউল গানের আর্তনাদের মতো/জীবনানন্দের চিলের মতো
সারা গ্রাম-বাংলার বুকের ধবল দুঃখের মতো
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে ফুটে উঠলো শাদা শাপলাফুল
নির্মিত কহ্লারে যেন পাই আবক্ষ বাংলাদেশ/ আবিদ আজাদ
মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের শাপলা ফুলকে উদ্দেশ্য করে কবি আবিদ আজাদ আবহমান বাংলার ঐতিহ্যকে স্মরণ করেছেন। এই স্মরণের মধ্যে আত্ম-আবিষ্কার ও অহংকার রয়েছে। শাদা কহ্লার অর্থাৎ শাদা শাপলা ফুলের সঙ্গে হংসমিথুনের মিতালী, যাকে রবীন্দ্রনাথের মতো, জীবনানন্দের চিলের মতো, বাউলগানের আর্তনাদের মতো বলে মহত্ত্ব আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি এই শুভ্রপদ্মকে তুলনা করেছে বিশাল মিছিল নিয়ে আসা মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে এবং স্বাধীনতার মহানায়ক শেখমুজিবের সেই হাতের। যে হাতের উদাত্ত আহ্বান ঐতিহাসিক সাতই মার্চের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এভাবে আবিদ আজাদের কবিতাকে মহার্ঘ্য করেছে। সত্তরের শিহাব সরকার কিছুটা নিম্নকণ্ঠ কিন্তু সমকালচেতনা তাঁকে কম্পিত করলেও পিষ্ট করেননি। শুরু থেকে কবিতাকে শুদ্ধশিল্প হিসেবে চর্চা করে এসেছেন। তাঁকেও মুক্তিযুদ্ধ নাড়া দিয়েছে। তাঁর কবিতায় স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, উল্লাস হিসেবে আসেনি, এসেছে চেতনা হিসেবে। বাংলাদেশের কবিতার অন্তরঙ্গে যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঞ্চারিত হয়েছে, তেমনি বহিরঙ্গেও উপস্থিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুষঙ্গ। স্বাধীনতা-উত্তর কবিতায় এমন কিছু শব্দ প্রয়োগ দেখা যায়, যা একান্তই মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার। এসব অনুষঙ্গ স্ফুলিঙ্গের মতো কবিতার দেহ ও ধমনীতে সঞ্চার করেছে তীব্রতা, উত্তাপ, ক্ষোভ ও বেদনা। কয়েকটি উদাহরণ
(ক) ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে পূর্ণবার, বুঝে নিতে চাই
অধিনায়কের কণ্ঠে উচ্চারিত গাঢ় শব্দাবলী।
-রফিক আজাদ
(খ) রাষ্ট্র মানেই নিহত সৈনিকের স্ত্রী/রাষ্ট্র মানেই ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে যাওয়া/রাষ্ট্র মানেই/লেফ্‌ট রাইট, লেফ্‌ট রাইট, লেফ্‌ট রাইট।
-শহীদ (গ) ছুঁলে বুলেট মানুষ মরে স্বপ্ন থাকে,/বধ্যভূমি সাক্ষী থাকে/ মৃত লাশের স্মৃতি থাকে
-মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ এভাবে দীপিত হয়েছে আমাদের কবিতায়। আরক্ত করেছে কবিতার ভেতরভুবনকে। সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও সঞ্চারিত হয়েছে কবিতার ধমনীতে। যদিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উত্তরকালে আর পল্লবিত হয়নি। অচিরেই মার খেয়ে যায় মুক্তির এষণা ও স্বাধীনতার সোনালী স্বপ্ন। বিজয়ের গৌরব বেশিদিন জনমনে তৃপ্তি দেয়নি। স্বাধীনতার অল্প কিছুকাল পরেই জনজীবনে নেমে আসে সীমাহীন দুর্যোগ, হতাশা, ভাঙচুর, ক্ষুধা, দারিদ্র, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, দ্রব্যমূল্যে, উৎপীড়ন, সুবিধাভোগীদের বেহেল্লাপনা প্রভৃতি; গ্রাস করে ফেলে সারাদেশ। অবক্ষয়, নৈরাজ্য, অর্থনৈতিক অনটন, দুর্ভিক্ষ এবং রাজনৈতিক পালাবদল, বলগাহীনতা প্রভৃতি কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হয়ে গেছে নির্বাসিত। স্বাধীনতার সুফল এ জাতি ঠিকমতো পায়নি, হয়নি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সঠিক বাস্তবায়ন। স্বাধীনতা এখন স্মৃতিসৌধ, শহীদমিনার, জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ দিবসে বিবৃতি, বক্তৃতা, আবৃত্তি, কথামালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। ক্ষুব্ধকবির কণ্ঠে তাই ধ্বনিত হয়/আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি/ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে/এদেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?
…………….. স্বাধীনতা
এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননী/স্বাধীনতা একি তবে নষ্ট জন্ম?/একি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল?/জাতির পতাকা আজ খামছে ধরেছে পুরোনো শকুন।
বাতাসে লাশের গন্ধ/ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
স্বাধীনতা আজ যেন ব্যর্থতায় পর্যবসিত; ধর্ষিতার কাতর চিৎকার, দুঃস্বপ্নের রাত, মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য, রক্তাক্ত সময়, বাতাসে লাশের গন্ধ, এমনকি জাতির পতাকা আজ খামছে ধরা পুরোনো শকুনদেরও যেন সহজেই ভুলে গেছে এদেশ, এদেশের মানুষ। স্বাধীনতা আজ যেন পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল, নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননীর মতো।
আমাদের কবিতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেছে এভাবেই, কবিতায় যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন মাত্রা। কবিতার অন্তরঙ্গে সঞ্চারিত হয়েছে বেদনা ও বিক্ষোভ, কিছু না পাওয়ার হাহাকার। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে কিন্তু আমরা মুক্তিলাভ করতে পারিনি, ভুখণ্ডগত স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি সত্যি কিন্তু স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ আমরা লাভ করতে পারিনি। জাতীয় জীবনের রাজনৈতিক ব্যর্থতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বারবার মার খেয়েছে। বিশেষত জাতির জনকের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড, জাতীয় চার নেতার জেলহত্যা, ক্ষমতার মসনদে সামরিক শাসকদের আগমন, স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে শাসকচক্রের আঁতাত ইত্যাদি ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের দেয়ালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বারবার ধাক্কা খেয়ে বিব্রত হতে হয়েছে। বিভিন্ন কবিতায় কিছু অনুষঙ্গ ও শব্দ এসেছে যা একান্তভাবে মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারী। যেমন-বন্দুক, রাইফেল, বুলেট, বেয়নেট, ট্রিগার, মর্টার, মাইন, এ্যম্বুশ, ঘেরাও, গেরিলা, হেলমেট, বারুদ, রাজাকার, হানাদার, আলবদর, আলশামস্‌, ইউনিফর্ম, ক্যামোফ্লাজ ইত্যাদি। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, রূপকল্প ইত্যাদি নির্মাণেও মুক্তিযুদ্ধের বিচিত্র অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন আমাদের কবিরা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পল্লবিত বিকাশ আমাদের কবিতাকে ভিন্ন এক গৌরব দান করেছে, যা পৃথিবীর অন্য ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের কবিতাকে স্বতন্ত্র করেছে। ভবিষ্যতের অনাগত কবিরাও এই চেতনা নিয়ে লিখবেন কবিতা, যে কবিতার শরীরে ও মর্মে উৎকীর্ণ হবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস।

x