মুক্তিপথের দিশা যে তারা

গুপ্তচর হয়ে পাকসেনাদের ক্যাম্পের খবর সংগ্রহ করতেন দুঃসাহসী তারামন। কমান্ডারের নির্দেশে কলাগাছ বুকে বেঁধে একা সাঁতরে পাড়ি দিতেন খরস্রোতা নদী। মাথার চুল এলো করে, শরীরে কাদা-বিষ্ঠা মেখে, দীর্ঘ হাসি-কান্না বা বোবার অভিনয় করে পাগলীর সাজ নিতেন। কৌশলে চলে যেতেন পাকশিবিরে। গুনে আসতেন কতগুলো অস্ত্র আছে আর কয়জন ধর্ষিতা সেখানে বন্দি; জেনে নিতেন কোথায় অপারেশন হবে। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের চালান দিতেন সেসব তথ্য। পুরুষ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার সম্মুখ যুদ্ধেও অংশ নেন তিনি। কয়েকবার বেঁচে ফিরেছেন মৃত্যুর হাত থেকে।

এস.বি. টুপসি

শনিবার , ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ
55

‘তারামন’ মানে, তারার মতো মন। মনের দিক থেকে পথ দেখানোর তারা-ই ছিলেন তিনি। সে কথা নিজেও জানতেন না, দাবিও করেননি কখনও। আকাশে তাকে দেখে যে পথহারা পথিক দিশা খুঁজে নেয়, সন্ধ্যার তারা কি নিজে সে কথা জানে? কুড়িগ্রামের অজপাড়া গাঁয়ের সেই অশিক্ষিত নারী কেমন করে আমাদের সমগ্র জাতির পথের দিশা হতে পারেন, সে কথাই তুলে ধরতে চাই।
তখন ১৯৭১ সাল। হানাদারদের হামলায় ভিটা ছেড়ে অন্য গ্রামে পালিয়ে যান কিশোরী তারামন ও তার মা। বাবা আবদুস সোহবান তখন বেঁচে নেই। কচুরমুখী সেদ্ধ করে পেট চালাতে হতো মা-মেয়েকে। একদিন হাবিলদার মুহিব এসে তারামনকে প্রস্তাব দেন দশঘড়িয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ভাত রাঁধার জন্য। মাকে জানানো হলে তিনি প্রথমে রাজি হননি। তাই মায়ের সামনেই তারাকে নিজের ধর্মমেয়ে বলে ঘোষণা দেন হাবিলদার। এরপর মেয়েকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে পাঠালেন মা কুলসুম বেগম।
ক্যাম্পে শুধু রান্নার কাজ নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রগুলোও মুছে পরিষ্কার করতেন তারামন। ছোট্ট মেয়েটির সাহস তখনই আঁচ করতে পেরেছিলেন তার ধর্মবাবা মুহিব হাবিলদার। তারামনকে রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ দেন তিনি। পরে শেখালেন স্টেনগান চালাতে। এরপর ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার আবু তাহেরের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন ১৪ বছরের কিশোরী তারামন।
গুপ্তচর হয়ে পাকসেনাদের ক্যাম্পের খবর সংগ্রহ করতেন দুঃসাহসী তারামন। কমান্ডারের নির্দেশে কলাগাছ বুকে বেঁধে একা সাঁতরে পাড়ি দিতেন খরস্রোতা নদী। মাথার চুল এলো করে, শরীরে কাদা-বিষ্ঠা মেখে, দীর্ঘ হাসি-কান্না বা বোবার অভিনয় করে পাগলীর সাজ নিতেন। কৌশলে চলে যেতেন পাকশিবিরে। গুনে আসতেন কতগুলো অস্ত্র আছে আর কয়জন ধর্ষিতা সেখানে বন্দি; জেনে নিতেন কোথায় অপারেশন হবে। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের চালান দিতেন সেসব তথ্য। পুরুষ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার সম্মুখ যুদ্ধেও অংশ নেন তিনি। কয়েকবার বেঁচে ফিরেছেন মৃত্যুর হাত থেকে।
সংক্ষেপে এই হলো তাঁর বীরত্বের বিবরণ। কিন্তু ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব পাওয়ার কথা নিজেই জানতেন না অশিক্ষিত ও প্রান্তিক এই নারী মুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মায়ের কাছে ফিরে যান তিনি। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৭৩ সালে তাঁকে খেতাবে ভূষিত করে জাতির জনকের সরকার। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ ২৪ বছর পর্যন্ত তাঁকে খুঁজেই বের করা সম্ভব হয়নি।
১৯৯৫ সালে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর কলেজের অধ্যাপক আবদুস সবুর ফারুকীর সহায়তায় প্রথম তার সন্ধান পান ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক বিমল কান্তি দে। কয়েকটি নারী সংগঠন তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে। সেই সময় তাকে নিয়ে পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়। খালেদা জিয়ার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বীরত্বের পদক তুলে দেন তারামন বিবির হাতে। ‘বীর প্রতীকের খোঁজে’ বইয়ে তারামন বিবির নাটকীয় জীবনের এসব গল্প তুলে ধরেছেন আনিসুল হক।
খালেদা সরকারের পক্ষ থেকে যেদিন তাঁর হাতে পদক তুলে দেওয়া হয়, সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি চাই সব মুক্তিযোদ্ধা যেন সম্মান পায়’। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও কি আমরা দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সকল মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান দিতে পেরেছি? নাকি দল-মতের সংকীর্ণ চোখ দিয়ে দেখে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেও বৈষম্য করেছি? সময় এসেছে সেই আত্মসমালোচনার।
ফেব্রুয়ারি, মার্চ, ডিসেম্বর মাস এলেই আমাদের কথায়-লেখনীতে মুক্তিযোদ্ধাদের যতখানি স্তব-স্তুতি হয়, সারা বছর যদি আমরা কাজেকর্মে ততখানি সম্মান তাঁদের দিতে পারতাম, তাহলে বোধহয় দেশের চেহারাটা চার দশক আগেই পাল্টে যেত। তাই এ দেশে বিজয়ের মাসের প্রথম দিনে মারা যাওয়াটা একজন প্রান্তিক নারী মুক্তিযোদ্ধার জন্য সৌভাগ্যেরই বলতে হয়। ডিসেম্বর মাসজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মঞ্চে শ্রদ্ধা জানানো হবে তারামন বিবিকে। পত্রিকা-টেলিভিশনে তাঁকে নিয়ে থাকবে নানান আয়োজন। নতুন প্রজন্ম জানবে এই বীরপ্রতীকের অবদান। এ-ও বা কম কীসে?
এই বীরপ্রতীককে নিয়ে ইতোমধ্যে অনেকে অনেক কথাই লিখেছেন। সবার কথায় উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর রোমাঞ্চকর মুক্তিযুদ্ধ ও নাটকীয় জীবনের কথা। কিন্তু আমার পাঠ-পর্যবেক্ষণে বারবার ধরা পড়ে তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্য দিক। স্বাধীনতার পর দুই যুগ আড়াল থাকার সময়টা তিনি যে বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন লালন করেছেন, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ পেতে বেশিদূর যেতে হয় না। একমাত্র ছেলের নামটাই তো রেখেছেন নিজের সেক্টর কমান্ডার আবু তাহেরের নামে। যুদ্ধাহত সেই সেক্টর কমান্ডার যে বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখাতেন, সে কথাও আমাদের অজানা নয়।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে এই যে দীর্ঘ সময় নিজেকে আড়ালে রাখলেন, এরই মাঝে ১৯৭৪ সালে আবদুল মজিদের সঙ্গে বিয়ে হয় তারামন বিবির। ১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর যখন তাঁকে খেতাব বুঝিয়ে দেওয়া হলো, পদক নিয়ে আবার ফিরে গেলেন স্বামীর জীর্ণ কুটিরেই। স্বামী-সন্তান কারও জন্যই রাষ্ট্রের কাছে কিছু চেয়ে নেননি তিনি। এখানেই প্রকাশ পায় রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতিদান চেয়ে নেয়ার প্রতি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার অনীহা।
আমরা জানি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ভালোবাসায় শেষ জীবনে সুদিন ফিরে এসেছিল তাঁর। ২০০৯ সালে কুড়িগ্রাম শহর লাগোয়া হলোখানা ইউনিয়নের আরাজী পলাশবাড়ী গ্রামে শেখ হাসিনা সরকারের দেওয়া এক বিঘা জমিতে বিজিবি’র উদ্যোগে বীরপ্রতীক তারামনকে একটি বাড়ি করে দেওয়া হয়। যদিও রাজিবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুরের কাচারিপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতেই মেয়ে মাজেদা খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাটাতেন তিনি।
তারামন বিবিকে আবিষ্কারের কৃতিত্ব যেমন অধ্যাপক বিমল দে ও অধ্যাপক আবদুস সবুর ফারুকীর, তেমনি তাঁর মর্যাদা ও সুদিন ফিরিয়ে আনার মূল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কয়েকটি নারী সংগঠন ও গণমাধ্যমগুলো। মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে ‘তারামন বেগম বীরপ্রতীক’ নামে তালিকাভুক্ত এই গেরিলাকে নিয়ে প্রকাশিত সমস্ত প্রতিবেদন-নিবন্ধের পাঠ থেকে উঠে আসে আরও অনেক প্রান্তিক নারী মুক্তিযোদ্ধার কাহিনি অপ্রকাশিত থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা।
বাংলার মা-মেয়েদের বড় অংশ যে শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের ভাত রাঁধা বা আশ্রয় দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধও করেছেন -এই দাবিও অমূলক নয়। এ কারণে আমার মনে হয়, এসব প্রান্তিক নারী মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করাটা নারী সংগঠনগুলোর বিশেষ দায়িত্ব। এই কাজটা শুধু নারী মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতিই এনে দেবে না, আজকের নারীদের সামনে উপস্থাপন করবে ‘আদর্শ নায়িকাদের’, যাদের উদাহরণ আমাদের যোগাবে আত্মবিশ্বাস ও লড়াকু চেতনা অর্জনের অনুপ্রেরণা।
আজ যে যুগে আমরা বসবাস করছি, সেখানে সাম্রাজ্য গড়েছে বহুজাতিক পুঁজি। বিজ্ঞাপন কিংবা সিনেমায় মুনাফার দেবী যেন খোলামেলা শরীরের সুশ্রী কোনও নারী। পুঁজিবাদের হাতে প্রতিনিয়ত বিকিয়ে যাচ্ছে নারীদের সম্ভ্রম। শিক্ষাদীক্ষা অর্জনের ফলে সমাজের স্তরে স্তরে নারীদের স্বাধীনতার পরিধিই শুধু বেড়েছে। কিন্তু বৈষম্যমূলক সমাজ আজও প্রতিষ্ঠা হয়নি বলে ফলশ্রুত বঞ্চনা থেকে সামষ্ঠিকভাবে মুক্তি পায়নি বাংলার নারীরা। কেননা, আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাধারায় নিমগ্ন থাকছি বলে আমরা সমাজ পরিবর্তনের সহযাত্রী হতে পারছি না। আর এখানেই তারা হয়ে পথের দিশা দিচ্ছেন বীরপ্রতীক তারামন বিবি।

- Advertistment -