মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতি সাহিত্যের অভিযাত্রী রশীদ আল ফারুকী

সুভাষ দে

শুক্রবার , ১৫ মার্চ, ২০১৯ at ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ
53

যুক্তিবাদিতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবিক চেতনাকে তিনি তাঁর সাহিত্য রচনার নির্যাস হিসেবে নিয়েছেন। র‌্যাডিকেল হিউম্যানিজম-বলা চলে এই চিনত্মাকে। তাঁর সাহিত্য দর্শনের আধারে মার্কসীয় চিনত্মা ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। এড়্গেত্রে তিনি রণেশ দাশগুপ্ত, আহমদ শরীফ এর সগোত্র। স্বল্প পরিসরের জীবনে তিনি আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে যে কলেস্নাল তুলেছিলেন তার মূল্যায়ন হয়নি এখনো।
সাহিত্য সমালোচক ও গবেষক হিসেবে তাঁর খ্যাতি সমধিক। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি সাংস্কৃতিক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিম-লে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। রশীদ আল ফারুকীর পিতৃদত্ত নাম খায়ের উল বশর। তাঁর জন্ম ১৯৪০ সালে চট্টগ্রামের সীতাকু- উপজেলার গোপ্তাখালী গ্রামে। পিতামহ মওলানা আবদুস সাত্তার সীতাকু- এলাকার বিখ্যাত আলেম, পিতা মোহাম্মদ নুরুল আবসার আরবি ও ফারসি সাহিত্যের অধ্যাপক। ছোটবেলায় তাঁর শিড়্গাজীবন শুরু হয় মাদ্রাসায়। মাদ্রাসায় পড়াকালীন তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন।
১৯৫৫ সালে যোগ দেন অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সংগঠন যুবলীগে। সেই সময় এই সংগঠনটি ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং এই সংগঠনের কর্মীরা পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত হলে তিনি সেই সংগঠনে যোগ দেন।
১৯৫৬ সালে ফাজিল পাস করার পর ১৯৬০ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আই.এ (১৯৬২) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি.এ অনার্স এবং ১৯৬৬ সালে এম এ পাস করেন। চট্টগ্রাম কলেজে আই এ পড়ার সময় আইয়ুবের সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি গ্রেফতার হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন পরিচালনার কারণে পুনরায় কারাবরণ করেন।
তিনি রাউজান কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন ১৯৬৭ সালে। এরপর ১৯৭০ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালে তিনি এই বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৮১ সালে।
রশীদ আল ফারুকী খুবই কর্মোদ্যোগী মানুষ ছিলেন। অধ্যাপনা, লেখালেখি ও সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক নানা কাজে সদাব্যস্তা থাকতেন। চট্টগ্রামে তিনি পাঠচক্র, সাহিত্যিক আড্ডা ও সাহিত্য সংগঠন এসব সংগঠিত করেছেন। এ সময় তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদ চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি, বিশ্ব মৈত্রী ও সংহতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের পর আমাদের জাতীয় জীবনে পাকিস্তানি ভাবাদর্শ পুনরায় ফিরিয়ে আনতে যে রাজনৈতিক-সামাজিক তৎপরতা চলে সে সবের বিরুদ্ধে একজন দায়বদ্ধ লেখক, বুদ্ধিজীবী হিসেবে রশীদ আল ফারুকী খুবই সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। চট্টগ্রামে প্রায় প্রতিটি ছাত্র-যুব সমাবেশে, সাংস্কৃতিক সমাবেশে তিনি উপস্থিত থাকতেন। তিনি নিজেও সমমনাদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন চট্টগ্রাম সাহিত্য পরিষদ, তাঁর সাথে এ কাজে ঘনিষ্ঠ ছিলেন কবি ও সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্ত।
প্রবন্ধ রচনা ও সাহিত্য সমালোচনায় রশিদ আল ফারুকীর একটি বিশিষ্ট স্থান রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কোলকাতার বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা ও সাময়িকীতে তাঁর লেখা রয়েছে যেগুলি এখনো অগ্রন্থিত রয়েছে। রশীদ আল ফারুকী রচনা সংগ্রহ যেটি বাংলা একাডেমি থেকে ড. মাহবুবুল হক এর সম্পাদনায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে তাঁর অগ্রন্থিত প্রবন্ধ ও বই সমালোচনার একটি দীর্ঘ তলিকা রয়েছে। তিনি কিছু গল্প লিখেছেন, ১৬টির মতো, এর তালিকা ঐ বইতে সংযোজিত আছে। গল্পগুলিও গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি।
তাঁর যে সকল প্রবন্ধ বা সাহিত্য সমালোচনা বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা হয়েছে সেগুলি সংগ্রহ করে গ্রন্থাকারে ছাপানো প্রয়োজন। এই লেখাগুলিতে কেবল সাহিত্যের বিষয় নয় বরং আমাদের স্বাধীনতা পরবর্তী কালের জাতির আশা, প্রত্যাশা আর প্রত্যাশা ভঙ্গের বিষয়গুলিও আছে। কোনো নিষ্ঠ গবেষক এই প্রবন্ধগুলি সংগ্রহ করার দায়িত্ব নিলে আমাদের জাতীয় ইতিহাস, সমাজ ও সাহিত্যের একটি বস্তুনিষ্ঠ পরিচয় পাওয়া যাবে।
রশিদ আল ফারুকীর প্রবন্ধ ও গবেষণা গ্রন্থগুলি হলো, রুচি ও প্রগতি (১৯৬৯, চট্টগ্রাম), বাংলা সাহিত্যে চরিত্র চিত্রণ (১৯৬৯, ঢাকা), উর্দু সাহিত্যর রূপরেখা (১৯৭০) শরৎ সাহিত্য জিজ্ঞাসা ১৯৭১, চট্টগ্রাম, মুসলিম মানস : সংঘাত ও প্রতিক্রিয়া (কলকাতা ১৯৮১), বাংলা উপন্যাসে মুসলমান লেখকদের অবদান (১৯৮৪ কলকাতা), বাংলার জাগরণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (১৯৮৫ ঢাকা), ধর্ম ও রাষ্ট্র (১৯৮৭), ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি।
রশীদ আল ফারুকীর সাহিত্যে সমালোচনার বিচরণ ড়্গেত্র প্রধানত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, বাংলাসাহিত্যে মুসলিম লেখকদের অবদান, ঊনবিংশ শতাব্দির রেঁনেসা ও মুসলিম সমাজের অবস্থান, মুসলিম সমাজমানসের সংঘাত এবং সমাজ ও সাহিত্যে তার প্রতিক্রিয়া প্রভাব- এসব বিষয় তাঁর তীক্ষন পর্যবেক্ষণে এসেছে। মধ্যযুগের সাহিত্য ও সমাজ বিশেস্নষণে তিনি ড. আহমদ শরীফ ও ড. আনিসুজ্জামানের সগোত্র।
বাংলা ভাষা চর্চা নিয়ে মুসলিম সম্ভ্রানত্ম বংশীয়দের যে মনোভাব ছিলো, ফারসি-উর্দু যেভাবে দাপটে মুসলিম সমাজে আসন গেড়ে বসেছিলো তা থেকে সাধারণ বাঙালি মুসলমানদের দৃষ্টি ফেরাতে এবং মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনার ড়্গেত্রে যে সকল অনুষঙ্গগুলি ক্রিয়াশীল ছিলো (মুসলিম মানস : সংঘাত ও প্রতিক্রিয়া) তা তাঁর প্রবন্ধে বিশদভাবে বিধৃত হয়েছে। তিনি বলছেন, বিংশ শতাব্দীয় দ্বিতীয় দশক থেকে মুসলমানদের লিখিত সামাজিক উপন্যাসে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাটি দেখা দিতে শুরু করেছে অবশ্য এর আগে মীর মোশাররফ হোসেন, বেগম রোকেয়া, এস ওয়াজেদ আলীর লেখায় বাঙালি ঐতিহ্য, ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা এসেছে। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমাজের বেশ ক’জন লেখক মাতৃভাষা বাংলায় সাহিত্য রচনার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছেন। ততদিনে মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ পর্ব শুরু হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে নজরুলের মাধ্যমে মুসলিম সাহিত্য সমাজে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এলো, তরুণ মুসলিম লেখক বুদ্ধিজীবীদের তা প্রবলভাবে আলোড়িত করে যার উদাহরণ ‘শিখাগোষ্ঠী’ এবং মুসলিম সাহিত্য সমাজের লেখকগণ। মুসলমান মধ্যবিত্তের মধ্যে বাংলাভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে দ্বিধা ততদিনে কেটে গেছে। খেলাফত আন্দোলন সত্ত্বেও। বরং প্রগতিবাদী চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নারীর অধিকার, সেক্যুলারিজম এসব আধুনিক বিষয় পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম লেখকদের প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। এই ধারাটি এতই শক্তি অর্জন করেছিলো যে পাকিস্তানোত্তর সময়ে ধর্মীয় জাগরণকে পেছনে ফেলে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক ধারাটি প্রবল হয়ে উঠলো। রশীদ আল ফারুকীর সামগ্রিক প্রবন্ধ সাহিত্যে, লেখায় এর একটি ক্রমপর্যায় খুঁজে পাওয়া যাবে। তিনি নিজেও সাহিত্যে এই ধর্মনিরপেক্ষ ধারণাটি শক্তিশালী করতে তাঁর সকল প্রচেষ্টা নিয়োজিত রেখেছেন লেখায়, বক্তৃতায়, সাহিত্য আড্ডা ও পাঠচক্রে। মার্কসবাদী চিনত্মায় আশ্রয়ী ছিলেন বলে তাঁর ব্যাখ্যা বিশেস্নষণ সাহিত্যে ও সমাজ প্রগতির ধারাটি বিসত্মৃত করেছে। তবে সেই সাথে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মর্মবাণীকেও অগ্রসর চিনত্মার সাথে যুক্ত করতে সচেষ্ট থেকেছেন।
বিগত শতকের সত্তর ও আশির দশকে তিনি লেখায় ও আলোচনায় সাহসী হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৭৫ এর রাজনৈতিক ট্রাজেডির পর মৌলবাদ ও পাকিস্তানি দর্শনে ফিরে যাওয়ার যে রাজনৈতিক-সামাজিক তোলপাড় চলে তার বিরুদ্ধে রশীদ আল ফারুকী সোচ্চার ছিলেন। সে সময় তিনি নিজেকে ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতায় যুক্ত করেছেন। কলকাতার সারস্বত মহলেও তাঁর সাহিত্যিক দর্শনের বৈশিষ্ট্য প্রশংসিত হয়েছে। ড. অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায় এবং বিশিষ্ট বামপন্থী তাত্ত্বিক নরহরি কবিরাজের মনত্মব্যে তার পরিচয় পাওয়া যাবে।
এই পরিশ্রমী, সৎ মানুষটির কাজের জন্যে যে সম্মান ও মর্যাদা পাওয়ার কথা ছিল সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে, আমরা তা দিতে ব্যর্থ হয়েছি।
রশীদ আল ফারুকীর সকল রচনা, গ্রন্থভুক্ত হওয়া প্রয়োজন, তাহলে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দির সাহিত্যে মুসলিম লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহিত্য দর্শনে রূপটি চিনে নেওয়া সম্ভব হবে। সমসাময়িক বিষয় যেমন ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্রব্যবস্থা এসব নিয়েও তাঁর অনেক প্রবন্ধ রয়েছে। বাংলা একাডেমি তাঁর সকল রচনা নিয়ে “সমগ্র” প্রকাশ করবে বলে আশা করি।
রশীদ আল ফারুকীর সাহিত্য চিনত্মায় স্বদেশ, স্বদেশের সংস্কৃতি যেমন ছিলো তেমনি শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের সমাজতান্ত্রিক আদর্শও সতত সক্রিয় ছিলো। তাঁর সকল কর্মোদ্যোগ এ লক্ষযেই পরিচালিত হয়েছিল। ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের যেসব বিষয় আমাদের এখন উদ্বিগ্ন করে তুলছে সেসব নিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য অকপটে সাহসের সাথে তুলে ধরেছেন। এজন্যে তাঁর সাহিত্য পাঠ আমাদের অবশ্যকর্তব্য।

x