মীরসরাইয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ‘চাঁই’

মাহবুব পলাশ, মীরসরাই

শনিবার , ২৩ জুন, ২০১৮ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ
148

দেশের গ্রামীণ জনপদে মাছ ধরার অন্যতম উপকরণ ‘চাঁই’। কোথাও কোথাও একে ‘আনতা’ও বলা হয়। এক সময় উপজেলার চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন ছড়া ঝর্ণা কিংবা মাঠের পাশে ডোবার কোল ঘেষে এই আনতা বা চাঁইয়ের দেখা মিলত। কিন্তু দিনে দিনে কালের আবর্তে তা যেন হারিয়ে যাচ্ছে।

ভরা বর্ষাতে নদীনালা ও জমিতে পানির দেখা মিললেও এখন দেখা মিলে না চাঁইয়ের। কৃষকেরা মৌসুমের আমন আবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে। চলছে আষাঢ় মাস। বৃষ্টিও হচ্ছে। নদীনালা, খালবিল সবখানে পানি। কিন্তু উপজেলার মিঠানালা, দুর্গাপুর, ইছাখালী, কাটাছরা, ওচমানপুর, হিঙ্গুলি, ওয়াহেদপুর, হাইতকান্দি, ধূমসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা মেলেনি চাঁই দিয়ে মাছ ধরার দৃশ্য।

জানা যায়, উপজেলার মিঠাছরা, আবুতোরাব, শান্তিরহাট ও আবুর হাটে একসময় চাঁই বিক্রি হতো। কিন্তু হাট ঘুরে দেখা যায়, একজন বিক্রেতা মৌসুমে মাছ ধরার চাঁই নিয়ে এলেও বসে আছেন ক্রেতার অভাবে। নিপুণ হাতের তৈরি এসব চাঁই বিক্রি হচ্ছে খুবই কম। এছাড়া উপজেলা সদর থেকে আমবাড়িয়া গ্রামে যাওয়ার পথে প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় এক চাঁই বিক্রেতার। তার নাম সুজন চন্দ্র। কাঁধে তার ভার বোঝাই চাঁই। কোথায় যাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাঁই বিক্রি করতে যাচ্ছি। তবে তিনি জানান, আগের মত এখন আর চাঁই বিক্রি হয় না।

অনেক চাঁই বানিয়েছিলাম, হাটে বিক্রি হচ্ছে না দেখে গ্রামে হেঁটে হেঁটে বিক্রি করা যায় কিনা দেখছি।

সুজন জানান, চাই তৈরির বাঁশ ক্রয় করে এ কাজে বাড়ির গৃহিণী থেকে শুরু করে ছেলেমেয়েরাও সহযোগিতা করে। বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে এসব তৈরি করেন তারা। একটি চাঁই তৈরিতে প্রকারভেদে খরচ পড়ে ৫০ থেকে ৩শ’ টাকা। আর তা বিক্রি হয় ১শ’ থেকে ৫শ’ টাকায়। কিন্তু দিন দিন কমে যাচ্ছে চাঁইয়ের চাহিদা।

তিনি আরো জানান, এসব তৈরিতে আগের চেয়ে খরচ বেড়েছে। ফলে আগের মতো আর লাভ হয় না। এমনিতে নদীনালা ও জমিতে পর্যাপ্ত পানি হলেও নেই কোনো মাছের দেখা। এছাড়া দেশি মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। ফলে চাঁই আর আগের মতো বিক্রি হচ্ছে না।

দুর্গাপুর ইউনিয়নের মৌসুমী মাছ বিক্রেতা রবিউল হক বলেন, বর্ষা মৌসুমে আমি চাঁই দিয়ে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ কেজি মাছ ধরতাম। তা বিক্রি হতো ৪শ’ টাকায় দরে। যা দিয়ে আমার সংসার চলতো। কিন্তু বর্তমানে খালবিল পানিতে ভরপুর থাকলেও দেখা মিলছে না মাছের। তাই অন্য কাজ করে সংসার চালাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির আশপাশে, ক্ষেতের আইলে, খালের কিনারে কিংবা ডোবা জলাশয়ের কিনারে যেখানে মাছের আনাগোনা বেশি সেখানে চাঁই পাতা হয়। পরদিন সকালে ওসব চাঁই থেকে মাছ সংগ্রহ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেখানে মৎস্য সম্পদ বেকারত্ব দূরীকরণ ও আমিষের অভাব পূরণসহ দেশের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখার কথা অথচ সেখানে দিনে দিনে কমছে মাছ চাষ। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, চাষাবাদে প্রয়োগ করা হচ্ছে অতিরিক্ত কীটনাশক, যার ফলে বিলুপ্ত হচ্ছে সুস্বাধু দেশি প্রজাতির মাছ। আর এসবের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে নিপুণ হাতের তৈরি চাঁই।

x