মীরসরাইয়ের ঝরনা আর লেকে দর্শনার্থীর ঢল

মাহবুব পলাশ, মীরসরাই

বৃহস্পতিবার , ১৫ আগস্ট, ২০১৯ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ
27

বর্ষা এলেই সৌন্দর্য বেড়ে যায় ঝরনা আর লেকের জলের। বর্ষন মুখর দিন এলেই যেমন ঝরনা কলতান আর চঞ্চলতা বেড়ে যায়, ঠিক তেমনি লেকের জলে স্বচ্ছতা বেড়ে সবুজের সাথে জলের রূপে মোহনীয়তায় ভরে উঠে। বিশেষ করে মীরসরাই উপজেলার কয়েকটি ঝরনা আর মহামায়া লেক ইতিমধ্যে ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য প্রিয় হয়ে উঠেছে। খৈয়াছরা ঝর্ণা, বোয়ালিয়া ঝরনা আর রুপসী ঝরনা এখানকার বর্ষার প্রধান আকর্ষন এখন। আর যাঁরা বেশী হাটতে পারেন না তাঁরা নৌকায় চড়ে ঝরনা আর লেকের মিতালী স্থলের সহজতর ভ্রমণ স্পট মহামায়া লেক ঘুরে আসতে ভুলছেন না একদম।
এবার ভরা বর্ষায় ঈদুল আযহার ছুটিতে পর্যটকদের ভীড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেক মহামায়া সেচ প্রকল্প, দেশের ষষ্ঠ সেচ ও প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প মুহুরী প্রজেক্ট, আট স্তরবিশিষ্ট জলপ্রভাত খৈয়াছড়া ঝরনা, রূপসী ঝরনা, বোয়ালিয়া ঝরনা এলাকা। মহামায়া লেকে পরিবার নিয়ে দর্শনার্থিদের ভীড় লক্ষনীয় এবারের ঈদুল আযহার দিন বিকেল থেকে প্রতিদিনই। মুহুরী প্রকল্পের বাঁধের মূল ফটক সহ খৈয়াছরা ঝরনা এবং সকল ঝর্ণায় ও একই অবস্থা। খৈয়াছরা ঝরনা দেখতে আসা চট্টগ্রামের জনৈক প্রকৌশলী ইফতেখার সাইমুন (৩৫) বলেন, খুব ভাল লাগছে বর্ষার এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে।

ফেনী থেকে পরিবার সহ আসা মহামায়া লেকের দর্শনার্থী শিক্ষিকা ইসমত আরা বেগম (৪৫) বলেন, ঝরনা আর লেক দেখতে আসবো বলে আসা হয়না এসে এতোই বিমোহিত যে বাড়ির পাশে এতো সুন্দর দর্শণীয় প্রাকৃতিক লীলাভূমি দেখতে এসে দেরী হয়েই গেছে মনে হচ্ছে। তবে দর্শনার্থীদের বিষয়ে মীরসরাই থানার ওসি জাহিদুল কবির বলেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন পর্যকটরা অনেক আনন্দ মনে নিয়ে এখানে আসেন। কিন্তু অসতর্কতা আর অসচতেনতার জন্য পরিবার ও স্বজনদের জন্য অনেক সময় মনে অনেক দুঃখ নিয়ে যান। সহপাটি সহ সকল দর্শনার্থিদের তিনি ঝর্ণা দেখার ক্ষেত্রে ঝুকিঁপূর্ণ স্থানে উঠা থেকে বিরত থেকে ঝুকিঁপূর্ণ স্থানে উঠে সেলফি তোলা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেন। এতে একটি দূর্ঘটনা নিজের জীবন যেমন কেড়ে নিবে। পরিবারের জন্য নিয়ে আসবে বাকি জীবনের কান্না।
মহামায়া লেক ঃ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মীরসরাই উপজেলার ঠাকুরদীঘি বাজারের এক কিলোমিটার পূর্বে এর অবস্থান। সিএনজি অটোরিকশায় কিছুদূর গেলেই দেখা মিলবে রেলপথের। এটি পেরুলেই মহামায়ার মোহনীয় রূপ দেখা যাবে। দূর থেকেই দেখা যায় পাহাড়সম বাঁধ। উভয় পাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। বাঁধের ধারে অপেক্ষমাণ সারি সারি ডিঙি নৌকা আর ইঞ্জিনচালিত বোট। ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের লেক অপরূপ শোভা ছড়ায়। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে স্বচ্ছ পানিতে তাকাতেই দেখা যায় নীলাকাশ। নৌকায় চড়ে যেতে হবে ঝর্ণা দেখতে। সেখানে আরো বৈচিত্রময় কয়েকটি স্পট এর মধ্য ‘কাবতলি’ পাহাড়ী গুহা পেরিয়ে গেলেই দেখা মিলবে পাথরের উপর দিয়ে সিলেটের শ্রীমঙ্গলের মতো আরেক সুন্দরের বেলাভ্থূমি।
বোয়ালিয়া ঝর্না : মীরসরাই সদর দিয়ে ব্রাক এর গোড়া পর্যন্ত সিএনজিতে। এরপর পায়ে হেটে যেতে হয় বোয়ালিয়া ঝর্ণায়। সিএনজির শেষ স্টপেজ ব্রাক এর সামনেই দেখা মিলবে কিছু বেকার তরুনের । ওদের বললে গাইড ও সহযোগি হিসেবে সাথেই যাবে। প্রকৃতির এই শান্ত নিবিড় অপরূপ বোয়ালিয়া ঝর্ণা এখন দর্শনার্থিদের প্রধান আকর্ষন। কাছাকাছি এলাকায় শোনা যায় হরিণের ডাক, অচেনা পাখির ডাক। সাথে চোখে পড়ে ঘাসের কার্পেট বিছানো উপত্যকার পথ।
রূপসী ঝর্ণা : প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের আরেক নাম বড় কমলদহ রূপসী ঝর্না। আঁকাবাঁকা গ্রামীণ সবুজ শ্যামল মেঠো পথ পার হয়ে পাহাড়ের পাদদেশে গেলেই শোনা যাবে ঝরনার পানি গড়িয়ে পড়ার ধ্বনি। দুই পাশে সুউচ্চ পাহাড়। সাঁ সাঁ শব্দে উঁচু পাহাড় থেকে অবিরাম শীতল পানি গড়িয়ে যাচ্ছে ছড়া দিয়ে। রূপসী ঝরনা প্রথম দেখেই তার রূপে পাগল হবে যে কেউ। মেঘের মতো উড়ে আসা শুভ্র এ পানি আলতো করে ছুঁয়ে দেখলেই এর শীতল পরশ মুহূর্তে ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড়দারোগাহাট বাজারে নামার পর সিএনজি অটোরিকশায় বাজারের উত্তর পাশের ব্রিকফিল্ড সড়ক দিয়ে পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত যাওয়া যাবে। এরপর হেঁটে পৌঁছে যাওয়া যায় ঝর্নায়।
খৈয়াছড়া ঝর্ণা : যেখানে প্রকৃতি খেলা করে আপন মনে, ঝুম ঝুম শব্দে বয়ে চলা ঝরনাধারায় গা ভিজিয়ে মানুষ যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ থেকে নিজেকে ধুয়ে সজীব করে তুলছে খৈয়াছড়া ঝরনায়। আট স্তরের এ ঝরনা দেখতে প্রতিদিন ছুটে যাচ্ছে হাজার হাজার দেশী বিদেশী পর্যটক। উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্ব দিকে ঝরনার অবস্থান। এর মধ্যে এক কিলোমিটার পথ গাড়িতে, বাকি পথ হেঁটে যেতে হবে।
মুহুরীর চরে জল আর রোদের খেলা : মুহুরীর চর যেন মীরসরাইয়ের ভেতর আরেক মীরসরাই। অন্তহীন চরে ছোট ছোট প্রকল্প। এপারে মীরসরাই, ওপারে সোনাগাজী। পশ্চিমে মৎস্য আহরণের খেলা, আর পূর্বে মন কাড়ানিয়া প্রকৃতি। নুয়ে পড়া মনোবল জেগে উঠবে পুবের জেগে ওঠা চরে। ডিঙি নৌকায় ভর করে কিছুদূর যেতেই দেখা মিলবে সাদা সাদা বক। চিকচিকে বালুতে জল আর রোদের খেলা চলে সারাক্ষণ। সামনে পেছনে, ডানে-বামে কেবল সৌন্দর্য আর সুন্দরের ছড়াছড়ি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের (পুরাতন) জোরারগঞ্জ বাজারে নেমে ধরতে হবে সংযোগ সড়কের পথ। জোরারগঞ্জ-মুহুরী প্রজেক্ট সড়ক নামে এ সড়কে দেখা মিলবে হরেক রকমের মোটরযানের। ভাঙাচোরা আঁকাবাঁকা আধাপাকা সড়ক পাড়ি দিতে হবে প্রায় ৮ কিলোমিটার। এরপর মুহুরী প্রকল্পের বাঁধ। যেতে যেতে দুই কিলোমিটার পরই দেখা মিলবে আসল সৌন্দর্য।

x