‘মি টু’ আন্দোলনের গোড়ার কথা

মাধব দীপ

শনিবার , ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ
69

এখন ২০১৯ সালে এসে- ‘মি-টু’ আন্দোলনের পরবর্তী ইতিহাস আমাদের সবারই কম-বেশি জানা। কেননা, এরই মাঝে এই আন্দোলন এতোটা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে যে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ইউরোপ-আমেরিকা ছাপিয়ে সেই আন্দোলনের ঢেউ এখন আমাদের দেশেও লেগেছে।

২০১৭ এর অক্টোবরের শেষ দিকে হ্যাশট্যাগসহ ‘মি-টু ক্যাম্পেইন’ নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম। দৈনিক আজাদীর এই পাতাতেই। নিউইয়র্ক টাইমসের একটি খবরের আলোকে সেটি লিখেছিলাম। লেখাটির শিরোনাম ছিলো- ‘সাড়া জাগানো মি-টু আন্দোলন কি আমাদের নাড়া দেবে?’
লেখাটি থেকে একটি অংশ তুলে ধরছি হুবহু- “মি-টু এর মতো কোনো ম্যুভমেন্ট কি আমাদের পুরুষতান্ত্রিক হৃদয়ে কোনো নাড়া দিবে? আচ্ছা, এ ধরনের কোনো ক্যাম্পেইন কি আমাদের দেশে সম্ভব?…এ বিষয়ে প্রকাশ্যে যেকোনো আলোচনাকে এখনো আমরা সামাজিকভাবে ‘অশোভন যোগাযোগ’ (ট্যাবু কমিউনিকেশন) হিসেবেই বিবেচনা করি। আচ্ছা যদি, এরকম কোনো সুযোগ দেওয়া হয় এদেশের শিশুকন্যা, ছাত্রী, নারী বা বৃদ্ধাকে- তবে কেমন হবে- ভাবা যায়? অথবা যদি এরকম কোনো স্টাডি পরিচালনা করা হয় যেখানে তাঁরা একে-একে বলবে তাঁদের জীবনে ঘটে যাওয়া নানা কিসিমের নিগ্রহের ঘটনা। তবে যে চিত্র উঠে আসবে তাতে কি মুখ দেখাতে পারবে এদেশের পুরুষসমাজ?? উত্তর আপনাদের উপরই রইল প্রিয় পাঠক।’
এখন ২০১৯ সালে এসে- ‘মি-টু’ আন্দোলনের পরবর্তি ইতিহাস আমাদের সবারই কম-বেশি জানা। কেননা, এরই মাঝে এই আন্দোলন এতোটা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে যে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ইউরোপ-আমেরিকা ছাপিয়ে সেই আন্দোলনের ঢেউ এখন আমাদের দেশেও লেগেছে। আর পার্শ্ববর্তী ভারতে তো এ নিয়ে রীতিমতো লঙ্কাকাণ্ড ঘটার মতোই খবর বেরোচ্ছে ক’দিন পরপর। এমনকি এই ‘মি-টু’ আন্দোলনের অনুকরণে আরও নানাধরনের হ্যাশট্যাগ-নির্ভর আন্দোলন ইতোমধ্যে সারা পৃথিবীতেই সাড়া জাগিয়েছে। তো, চলুন তাহলে এবার জেনে নিই ‘মি-টু’ আন্দোলনের গোড়ার কথা।
আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ার তারানা বুর্কে নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী ১৯৯৭ সালে ১৩ বছর বয়সী এক মেয়ের ‘যৌন নিগ্রহের শিকার’ হওয়ার কাহিনী শুনছিলেন। অনেক খারাপ লাগছিলো তাঁর। বলতে পারছিলেন না যে- ‘এমনটা’ তাঁর নিজের জীবনেও ঘটেছে। কিন্তু নানাভাবে নানাকারণে নানাস্থানে যৌন নিগ্রহের শিকার হওয়া নারীদের জন্য কিছু করার পরিকল্পনা তখন থেকেই তাঁর ছিলো।
অত:পর ২০১০ সালে এসে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন ‘জাস্ট বি ইন্স’ নামের একটি অলাভজনক সংগঠন যার কাজ নারীদের অধিকার ও নারীর উপর চলা যাবতীয় নিগ্রহের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। এখান থেকেই মূলত আসে ‘মি টু’ আন্দোলন। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ বলে তাঁর ওই আন্দোলন শ্বেতাঙ্গ নারীবাদীদের চোখে পড়েনি। পরিণতিতে, তাঁর সেই আন্দোলনের কথা কেউ তেমনভাবে জানতেও পারেনি এতোদিন।
কিন্তু ২০১৭ এর আক্টোবরের প্রথম দিকে ঘটে গেলো একটা ঘটনা। হলিউডের ম্যুুভি-মুগল বলে পরিচিত হারভে ওয়েনস্টেইন তার নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান ‘দ্যা ওয়েনস্টেইন কোম্পানি’ থেকে চাকরিচ্যুত হন। এর পেছনে কাজ করে তার দ্বারা সংঘটিত অসংখ্য যৌন নিগ্রহের ঘটনা। নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের অসংখ্য অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। এবং তাকে এইসব অভিযোগে চাকরিচ্যুত করে তার নিজের প্রতিষ্ঠানেরই পরিচালকবৃন্দ।
তো, এই ঘটনা ঘটার পরপরই হলিউডের আরেক দাপুটে অভিনেত্রী, এ্যাকটিভিস্ট, সাবেক গায়িকা ও প্রযোজক এলিসা মিলানো তাঁর টুইটার একাউন্টে যৌন নিগ্রহের শিকার নারীদের সাপোর্ট দিতে হ্যাশট্যাগসহ ‘মি টু’ ক্যাম্পেইন পুনরায় চালু করেন। এবং এটি মুহূর্তেই এতোটা ভাইরাল হয়ে যায় যে জেনিফার লরেন্সসহ দুনিয়া কাঁপানো প্রায় কুড়িজনেরও অধিক তারকা ওই টুইটে ‘মি টু’ লিখে তাঁদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এমনকি জেনিফার লরেন্স প্রকাশ্যে তাঁর শারীরিকভাবে নিগৃহীত হওয়ার অতীত কাহিনীও তুলে ধরেন। সিএনএন-এ সেটি প্রচারও করা হয়।
মূলত: তারানা বুর্কের পর এলিসা মিলানো, জেনিফার লরেন্সসহ অন্যান্য তারকাদের ওই আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশের কারণেই
‘মি টু’ ক্যাম্পেইন মিডিয়ার মাধ্যমে দ্রুত সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা ওই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন এই কারণে যে তাঁরা বিশ্বাস করতেন- এর মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে একটা নাড়া দেওয়া সম্ভব এবং এর মাধ্যমে পুরুষের ‘সম্বিত’ ফিরে পাবে বলে তাঁরা মনে করেছিলেন।
আর এভাবেই সারা পৃথিবীতে ‘মি-টু’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ও জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। এবং একে-একে উন্মোচিত হতে থাকে হয়রানিকারী কিংবা নির্যাতনকারী পুরুষের মুখোশ।

x