মিস ইউ ইতালি-নেদারল্যান্ড-চিলি-ক্যামেরুন

বৃহস্পতিবার , ১৪ জুন, ২০১৮ at ১:০১ অপরাহ্ণ
73

আজই মাঠে গড়াচ্ছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় এবং উত্তেজনাপূর্ণ আসর। রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮। এবারের বিশ্বকাপে অনেক পরাশক্তির ভিড়ে হারিয়ে গেছে কিছু প্রিয় নাম, প্রিয় দল। রাশিয়া বিশ্বকাপের মূল পর্বে দেখা যাবে না চারবারের বিশ্বকাপ জয়ী আজ্জুরিদের। দেখা মিলবে না কমলা রঙের টোটাল ফুটবল। গ্যালারি মাতবে না চিলিয়ানদের বুনো উল্লাসে!। বিশ্ব আসরে যেমন সুযোগ মিলেছে আন্ডারডগদের তেমনি বাদ পড়েছে হট ফেভারিটরা। কেউ কেউ বাঁকা চোখে বলছেন, বিশ্বকাপ ফুটবল কি শুরুর আগেই তবে রং হারালো? সেটি বোঝা যাবে আজকের পর। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী মিস করবে তাদের। বিশ্বকাপ ফুটবলে না থাকা ইতালি, নেদারল্যান্ড ও চিলি, ক্যামেরুনসহ অন্যান্য দলগুলোকে নিয়ে লিখেছেন কাশেম শাহ

ইতালি

সেদিন আকাশটা তার আকাশি রঙ ছাড়িয়ে নীলাভ হয়ে ওঠেছিল। তারপর ধীরে ধীরে মেঘ জমতে শুরু করে আকাশে। আকাশ তার নীল রঙ পাল্টাতে পাল্টাতে একসময় ঘন কালো মেঘে রূপ নেয়। ৯০ মিনিট পর সে কালো মেঘ ভারী বর্ষণ হয়ে নেমে আসে ইতালির বুকে। বৃষ্টির সাথে কেঁদে বুক ভাসায় কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী ইতালিয়ান। তাদের স্বপ্ন যে সেদিন এমনভাবে ভেঙে পড়বে তা তারা কল্পনাও করেনি। ব্রাজিলের পর বিশ্বকাপ ফুটবলে সবচেয়ে বেশি গৌরবের অধিকারী দল বাছাইপর্বই উতরাতে পারল না। এ বিদায় মেনে নেয়া কষ্টের। শুধু ইতালিয়ানদের জন্য নয়, নান্দনিক ফুটবল যারা ভালোবাসেন তাদের জন্যও বড় দুঃসংবাদ ইতালির বিশ্বকাপে না থাকা। নীল জার্সিদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেল। ফুটবল ইতিহাসের কত রথীমহারথী খেলেছেন ঐতিহ্যবাহী এই নীল জার্সিতে।

১৯৩০ সালে উরুগুয়ের প্রথম বিশ্বকাপে খেলেনি ইতালি। এরপর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেরই অংশ হয়ে ছিল তারা। মাঝে খেলেনি কেবল ১৯৫৮ বিশ্বকাপেই। ১৯৫৮ সালের পর ১৩টি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইতালি খেলেছে প্রতিবারই। মোট চারবার বিশ্বকাপ জিতেছে, দুবার ফাইনালে খেলেছে। একবারের আয়োজক। এমন একটি দলের বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়া ফুটবলরোমান্টিকদের জন্য বড় এক ধাক্কাই। ২০০৬ জার্মান বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর গত দুই আসরে গ্রুপ পর্ব পার হতে ব্যর্থ হয় ইতালি। আর এবার ছিটকে পড়লো বাছাইপর্ব থেকে। নিশ্চিতভাবেই নিজেদের সমৃদ্ধ ফুটবল ইতিহাসে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই পরাশক্তি।

চারবারের বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ী দলের ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে না খেলা মানে উত্তেজনা অনেকটাই ফিকে হয়ে আসা। ৬০ বছর আগে ফুটবল মহাযজ্ঞ হয়েছিল চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ছাড়া। ১৯৫৮ সালে ইতালিকে বিদায় করে বিশ্বকাপ খেলেছিল সুইডেন। কি দুর্ভাগ্য! এবারও সেই সুইডেনের কারণে বিশ্বকাপে সুযোগ হয়নি তাদের। এবারও জড়িয়ে থাকলো সেই সুইডেনের নামটাই! ইউরোপ অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ের চৌকাঠ পেরোতে পারেনি তারা। আজ্জুরিদের হারিয়ে ২০১৮ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে সুইডেন। প্লে অফের দ্বিতীয় লেগ হয়েছে গোলশূন্য ড্র, তাতেই কাজ হয়ে যায় সুইডেনের। প্রথম লেগের ১০ গোলের জয়ের সুবিধা নিয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বে উঠে গেছে তারা।

সুইডেনের বিশ্বকাপে ওঠার আনন্দভাগ্যকে দোষ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই ইতালির। গোলের কম চেষ্টা তো আর করেনি তারা। একের পর এক আক্রমণে ব্যস্ত রেখেছে তারা সুইডেনের রক্ষণভাগকে। শুরুর দিকের হিসাব না হয় বাদই রাখা হলো, শেষদিকে স্বাগতিকরা যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে, সেখানে আসলে ফুটবলদেবতা মুখ তুলে তাকাননি। নইলে নির্ধারিত সময়ের শেষ ৫ মিনিটে অন্তত দুটি গোল পেতে পারলো ইতালি। তা পায়নি বলেই এক যুগ পর আবার বিশ্বকাপের মূল আসরে সুইডেন। ২০০৬ সালে জার্মানির আসরে শেষবার খেলেছিল তারা, যে আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল এই ইতালিই।

রাশিয়া বিশ্বকাপ খেলে বিদায় নেওয়ার ইচ্ছা ছিল জানলুইজি বুফ্‌ফনের। সেটা আর হচ্ছে না। তবে ম্যাচ শেষে ইতালির অধিনায়ক আবেগময় কণ্ঠে নিজের জন্য নয়, দু:খপ্রকাশ করলেন দেশের ফুটবলের জন্য। ‘আমি আমার জন্য নই, ইতালিয়ান ফুটবলের জন্য দু:খিত। এভাবে শেষ করাটা আফসোসের।’ শঙ্কার মেঘ জন্মেছিল ফ্রেন্ডস অ্যারেনার প্রথম লেগ শেষে। সান সিরোতে এসেও কাটলো না সেই মেঘ। বরং আরও জমাট হয়ে কান্নার বৃষ্টিতে ভেজালো ইতালিয়ানদের।

নেদারল্যান্ডস

ইতালির মতোই রাশিয়া বিশ্বকাপে নেই টোটাল ফুটবলের কমলা দল ডাচরা। আসন্ন বিশ্বকাপে নেই ক্রুয়েফরবিনের দেশ। যোগ্যতা অর্জন পর্বের বাধা টপকে রাশিয়ার টিকিট পাকা করতে পারেনি ২০১০ বিশ্বকাপ রানার্স নেদারল্যান্ড। যোগ্যতা অর্জন পর্বে ব্যর্থ হওয়ার পরই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান দলটির সেরা তারকা রবিন। ক্রুয়েফের নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছিল নেদারল্যান্ড। সেবার পশ্চিম জার্মানির কাছে ১২ গোলে ফাইনালে হেরে ক্রুয়েফের নেদারল্যান্ডের স্বপ্নভঙ্গ হয়। সেবার টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছিলেন ক্রুয়েফ। আর্জেন্টিনাকে ৪, পূর্ব জার্মানির বিরুদ্ধে ২০ ও ব্রাজিলের বিরুদ্ধেও ২০ গোলে জয় পেয়ে ফাইনালে উঠেছিল নেদারল্যান্ড। ১৯৭৪ এর পর আরও দুবার রানার্স আপ তকমা নিয়েই বিশ্বকাপের মঞ্চ ছাড়তে হয়েছে ডাচদের। ১৯৭৮ ও ২০১০ সালে দ্বিতীয় স্থানে থেকে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ করেছে নেদারল্যান্ড। ২০১০ এর রানার্সআপ আর গেল আসরের শেষ চারে খেলা নেদারল্যান্ডের মেলেনি টিকিট। কমলা রঙের ঢেউ যেমন পড়বে না গ্যালারিজুড়ে তেমনি রোবেন, ভ্যান ফার্সিদের বড় মঞ্চে দেখার সবশেষ সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে হলো গোটা বিশ্বকে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বুলগেরিয়ার কাছে ২০ গোলে পরাজিত হয়ে চূড়ান্ত পর্বের আশা ক্ষীণ হয়ে যায় বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল দল নেদারল্যান্ডের। এই ব্যর্থতায় জাতীয় দলের কোচ ড্যানি ব্লিন্ডকে বরখাস্তও করেছে নেদারল্যান্ড ফুটবল ফেডারেশন। তিনবারের বিশ্বকাপ রানার্সআপ নেদারল্যান্ড ইউরো ২০১৬’র চূড়ান্ত পর্বেও খেলতে ব্যর্থ হয়েছিল।

চিলি

রাশিয়া বিশ্বকাপের ভাগ্যটাই মনে হয় খারাপ। বর্তমান কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন দল চিলি। অথচ সেই চিলিই টিকেট পায়নি রাশিয়ার। অ্যালেঙ সানচেজ ও আর্তুর ভিদালের মতো ফর্মের তুঙ্গে থাকা খেলোয়াড়রা খেলতে পারবেন না রাশিয়া বিশ্বকাপে। চিলি ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে পরপর দুবার কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন। ২০১৭ সালের কনফেডারেশন কাপে জার্মানির সাথে ফাইনাল খেলেছিল তারা। আলেঙি সানচেজ এবং আরতুরো ভিদালের মত তুখোড় তারকা রয়েছে চিলিতে। অথচ কোয়ালিফাই করতে পারেনি। ফুটবলে একসময় যে স্বর্ণযুগ তাদের ছিল, চিলি তা অনেকটাই হারিয়েছে। এবার দক্ষিণ আমেরিকাতে কোয়ালিফাইং রাউন্ড অপেক্ষাকৃত বেশ প্রতিযোগিতামূলক ছিল, ফলে চিলির ব্যর্থতা বড় কোনো অঘটন ছিল না বলে মনে করেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা।

ক্যামেরুন

রজার মিলা’র কথা মনে আছে? ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের অন্যতম নায়ক। মিলা অনেকটা একাই দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের খেলা দেখে পেলে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ২০০০ সাল নাগাদ আফ্রিকান কোনো একটি দল বিশ্বকাপ জিতবে। ক্যামেরুন বর্তমান আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন। অথচ তারা রাশিয়ার বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি। ২০১৮ বিশ্বকাপ খেলতে পারবে না আফ্রিকান কাপ অব নেশন্সের সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন ক্যামেরুন। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচে নাইজেরিয়ার সঙ্গে ১১ গোলে ড্র করে বিশ্বকাপের দৌঁড় থেকে ছিটকে পড়েছে আফ্রিকার চ্যাম্পিয়নরা। আফ্রিকার অদম্য সিংহদের দমিয়ে দিল সুপার ঈগলরা। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে আফ্রিকান অঞ্চলে ‘বি’ গ্রুপে ১০ পয়েন্ট নিয়ে রাশিয়ার টিকিট নিশ্চিত করে ফেলেছে নাইজেরিয়া।

এছাড়াও রাশিয়া বিশ্বকাপ খেলতে পারবে না আরো বেশ কয়েকটি দল। চলুন, তাদেরকেও এক নজর দেখে নেয়া যাক।

বসনিয়া

সর্বশেষ ম্যাচ ২০ তে জিতলে বিশ্বকাপ খেলতে পারতো বসনিয়া। কিন্তু তা ৩২ হওয়া ছিটকে পড়তে হয় বসনিয়াকে।

ঘানা : ২০১০ সালে বিশ্বকাপে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল ঘানা। কিন্তু তারা এবারের ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি। বিশ্বকাপে আসতে ৬ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট প্রয়োজন ছিল ঘানার।

গ্রিস : গত বছর খেললেও এবার বিশ্বকাপে নেই গ্রিস। সর্বশেষ ম্যাচ ৪১ গোলে হারায় বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি গ্রিস।

আয়ারল্যান্ড

সর্বশেষ অষ্ট্রিয়া এবং ওয়েলসকে হারিয়ে ভালো ফর্ম ছিল আয়ারল্যান্ডের। কিন্তু ক্রিস্টিয়ান এরেসকেনের দল কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হওয়া রাশিয়া ২০১৮ বিশ্বকাপে তারা নেই।

যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্বকাপে বেশি পুরনো না হলেও তাক লাগানো দল ছিল আমেরিকা। কিন্তু রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলতে পারবে না আমেরিকা।

ওয়েলস

২০১৬ সালের ইউরোতে সেমি ফাইনাল খেললেও বিশ্বকাপে নেই ওয়েলস। রাশিয়া বিশ্বকাপে দেখা যাবে না তারকা খেলোয়ার গ্যারেথ বেলকে। এছাড়াও ক্যামেরুন, আইভরিকোস্ট, স্কটল্যান্ড এবং ইকোয়েডরের মতো দলগুলো বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি।

আইভরি কোস্ট : অন্যদের একই পরিণতি হয়েছে আফ্রিকার আরেক ফুটবল জায়ান্ট আইভরি কোস্টের যারা ২০০৬ সাল থেকে সবগুলো বিশ্বকাপে খেলেছে।

x