মিশ্র ফলদ বাগান সৃষ্টি করেছেন এক মুক্তিযোদ্ধা অনেকের কাছেই তিনি উদাহরণ হয়ে উঠেছেন

কেশব কুমার বড়ুয়া : হাটহাজারী

সোমবার , ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৭:১২ পূর্বাহ্ণ
68

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বীর প্রতীক। তিনি জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করতে দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পর প্রাপ্ত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে দেশে পুষ্টি নিরাপত্তা প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কারণ ভবিষ্যত প্রজন্মকে পুষ্টি সমৃদ্ধ জাতি হিসাবে গড়ে তুলতে না পারলে স্বাধীনতার সুফল দেশের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া দূরূহ হয়ে উঠবে। তাই তিনি যুদ্ধ জয়ের পর এখন পুষ্টিবান জাতি গঠনের জন্য পুষ্টি নিরাপত্তার সংগ্রামে রত। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নেভেল সুইসাইড স্কোয়াড এর কমান্ডার ছিলেন। এখন বয়স তার ৬৮ বছর। ছোট কাল থেকে তার চাষাবাদের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ ছিল। চাকরি কালীন সময়ে ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার জন্য তিনি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে তার কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে স্বাধীনতার পর তাকে বীর প্রতীক খেতাব দেওয়া হয়। ভাগ্যক্রমে তিনি যুদ্ধে বেঁচে গেছেন। দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক তিনি। যুদ্ধ শেষে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তার ছোট কালের গাছের প্রতি ভালবাসার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি লেগে যান। গাছের প্রতি মমত্ববোধ তাকে বাগান করার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলে। তার বাগান করার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি হাটহাজারী চৌধুরীহাট এলাকার দেড় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে ফকির তাকিয়া এলাকায় সমতল ও টিলা ভুমি মিলে প্রায় ১২ হেক্টর জায়গা সংগ্রহ করেন। এক সময় তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি চেয়ে ছিলেন তার জায়গায় আমের বাগান করতে। বিষয়টি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ আবদুল্লাহ ওয়াহিদকে অবহিত করলে তিনি তাকে শুধু আমের বাগান না করে মিশ্র ফলের বাগান করার পরামর্শ দেন। প্রথমে তিনি এতে দ্বিমত করলেও পরে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শের সাথে একমত পোষন করেন। বিগত দুই বছর পূর্বে মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলম বীর প্রতীক তার ভূমিতে মিশ্র ফলের বাগানের কার্যক্রম শুরু করেন। মিশ্র ফলের বাগান করার পূর্র্বে তিনি তার জায়গায় কিছু আম , বাউ ও থাই কুলের বাগান করে ছিলেন। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে তিনি তার বাগানে ড্রাগন ফলের মধ্যে রেড ড্রাগনের ৪০ টি ও জাইন থাইলেন্ড জাতের ৪০টি গাছের চারা,বিভিন্ন জাতের ১ হাজার ৫ শ ২০টি মাল্টা গাছের চারা লাগান, বাগানে ৮ শ পেঁয়ারা গাছ,২শ ৫০ টি বিভিন্ন জাতের আম গাছ,৩৮ টি কাঁঠাল গাছ, ১শ ৯৮ টি পেঁপে গাছ,কলাগাছ ৫০ টি, দেশি ও ওপি ওয়ান জাতের নারকেল গাছ ১৫ টি,ছপেদা ৫ টি , লিচু ৬ টি ,কমলা গাছ ১ শ ৩০টি ছাড়া ও বিভিন্ন জাতের ফলদ গাছ তার বাগানে রয়েছে। তাছাড়া মাছ চাষের জন্য একটি পুকুর খনন করা হয়েছে। তার বাগানটি এখন এক প্রকার বিনোদন কেন্দ্রের মত।
কৃষি বিভাগের তথ্যানুসারে প্রতি গাছে ১ কেজি করে মাল্টা উৎপাদন হলে ১ হাজার ৫ শ ২০ কেজি মাল্টা এক মৌসুমে উৎপাদন হবে। এ বাগান থেকে বছরে তিনবার মাল্টা আহরণ করা যাবে। বাগানে উন্নত জাতের পেঁয়ারা গাছে কলম করা হয়েছে। কলমগুলো বিক্রি করেও অর্থ উপার্জন করা যাবে ফলও পাওয়া যাবে। একইভাবে কলা ও পেঁপে গাছ থেকে প্রচুর পরিমাণ ফল পাওয়া যাবে। দেশীয় এসব ফল দিয়ে দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা যাবে। বাইরের দেশ থেকে ফল আমদানি বাবদ দেশের প্রচুর অর্থ সাশ্রয় হবে। তার বাগানে কাজ করে প্রায় ১০ জন শ্রমিক তাদের পরিবার উন্নয়নের পরিজন ও সংসার পরিচালনা করেন। বাগানের উন্নয়নের জন্য কৃষি বিভাগের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মো: গোলাম মোস্তাফা চৌধুরী( অব) ও রিপন চন্দ্র হাওলাদার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার নির্দেশনানুসারে তাকে সহযোগিতা করছেন বলে তিনি জানান। হাটহাজারী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর লালিয়ারহাট ব্লকের আওতায় ফকির তাকিয়া এলাকায় সমন্বিত কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করণ প্রকল্পের আওতায় মিশ্র ফলের বাগানটি করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাকে উদ্বুদ্ব করে ছিলেন। বাগানের কার্যক্রম দেখে কৃষি বিভাগের উর্ধ্বতম এক কর্মকর্তা বাগানের গাছে শুস্ক মৌসুমে পানি দেওয়ার জন্য নলকুপ সহ বিভিন্ন প্রকার সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরো জানান, এ জাতীয় উদ্যোক্তা পেলে ফলের আমদানি নির্ভরতা কমে আসবে। দেশীয় সুস্বাদু ক্ষতিকর উপাদান মিশ্রিত ফলের প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকবেনা। অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যাবে। ফলের সহজ লভ্যতা পুষ্টি সমৃদ্ধ ভবিষ্যত প্রজন্ম গঠনের সহায়ক হবে। তাছাড়া মৌসুম ছাড়া ও এসব বাগানের মাধ্যমে ফলের যোগান পাওয়া যাবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার সহায়ক শক্তি হিসাবে এ জাতীয় বাগান কাজ করবে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা মো: খোরশেদ আলম বীর প্রতীককে অনুসরণের মাধ্যমে দেশকে ফলদ গাছের সমাহার সৃষ্টির জন্য প্রজন্মকে আহবান জানান। কেউ এ জাতীয় বাগান করার জন্য আগ্রহী হলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

- Advertistment -