মিলু বিলুর যুদ্ধ

বিপুল বড়ূয়া

বুধবার , ২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৬ পূর্বাহ্ণ
27

বাবার চোখে মুখে আতঙ্ক। কখন কী যে হয় বলা যায় না। মার সাথে বাবার কথা হয় ভারী গলায়। অনেকটা নিচু গলায়। নিলু-ঠিকই বোঝে বাবা-মা যেনো চাইছে তাদের এসব কথাবার্তা যাতে নিলু-বিলুর কানে না যায়।
মা-বাবার সাথে অনেকটা ফিসফিস করে কথা বলে।
‘তুমি আজকাল এতো কী কী ভাবছো? অফিস হতে এসে চুপচাপ শুয়ে থাকো। কোনো কথাবার্তা নেই কারো সাথে। মিলু-বিলুও তোমার মনমরা অবস্থা দেখে সবসময় মন খারাপ করে থাকে।’
বিলু খেলছে খেলনা-পুতুল আরো কী কী নিয়ে। মিলুর কিন্তু কান খাড়া-বাবা-মার দিকে। কী বলে মা বাবাকে।
‘জানো শহরে পাকিস্তানি আর্মির চলাচল বেশ বেড়ে গেছে এই কদিনে। কতো ভয়ে ভয়ে অফিসে যেতে হয় জানো।’
‘তা-আমাদের কি হবে? আমরা তো কোনো দোষ করিনি। আমাদের কি করবে-আর্মিরা। আমরা কোথায় যাবো।’
‘তুমি অফিসে যাবে না তা বলে। মিলু-বিলু কি স্কুলে যাবে না, তা বলতে কি-আমারও আজকাল ভয় ভয় লাগে। তুমি অফিসে যাও আর মিলু-বিলু স্কুলে যায়। সারাক্ষণ চিন্তায় থাকি।’
‘নাহ্‌ কাল থেকে আর মিলু-বিলুর স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই। স্কুলের সিরাজ স্যারের সাথে কাল বাজারে দেখা।’
‘সিরাজ স্যারের সাফ সাফ কথা-কাল থেকে যেনো মিলু-বিলুকে স্কুলে না পাঠাই। অনেক ছাত্র তো স্কুলেই আসে না। আর এখন গেরিলা যোদ্ধারা এ রাস্তায় ও রাস্তায় ক্রেকার-ককটেল ফাটিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। ওরা রেগে মেগে কী না করে বসে বোঝা যায় না।’
মা আর কথা বাড়ায় না। মা তো কদিন আগে ছোট মামার কাছে যুদ্ধের কথা-পাকিস্তানি সৈন্যদের নৃশংসতার কথা-সবার উৎকণ্ঠার কথা-সব সব শুনেছে। ভয়ও পেয়ে গেছে। না বাপু দরকার নেই স্কুলে যাওয়া। মিলু-বিলুর ঘর থেকেই বের হওয়া যাবে না। চুপচাপ বাসায় বসে থাকো।
মিলু-বিলু দেখে মা-বাবার উৎকণ্ঠা। হাসি-খুশির মিলু-বিলু কেমন অদ্ভুত চুপসে যায়। আগের মতো হৈ চৈ করে বাসা মাথায় তোলে না। এ বাসা সে বাসায় যেতেও মন চায় না তাদের।
মিলু-বিলুরও একই কথা। তারা আর ইশকুলে যাবে না।
‘দেখো-মা বাবাকে বলো আমরাও কাল হতে আর ইশকুলে যাবো না। সারা দেশে পাকিস্তানি আর্মিরা এতো হত্যা-নির্যাতন চালাচ্ছে। বাঙালিদের ওপর আক্রমণ করছে-কতো মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমরাও যুদ্ধ করবো মা। আমরাও কাল হতে আর স্কুলে যাবো না। আমরাও দেখো মা-ঠিকই যুদ্ধে নেমে পড়বো।’
মা হাসে। ‘কি বলে মিলু-বিলু। বাছারা তা তোমরা যুদ্ধ করবে? কি দিয়ে যুদ্ধ করবে? তোমাদের অস্ত্র আছে? দেখো না-পাকিস্তানি আর্মির কী ভয়ংকর চেহারা, লাল টকটকে আগুন গোলা চোখ, ইয়া বড় বড় মোচ, কি ভারী জগদ্দল ইউনিফর্ম, কাঁধে ভারী অস্ত্র-আবার তার মাথায় সুচালো বেয়নেট বসা-পায়ে পাথুরে বুট-আর তাদের কী রোষ রে বাবা-এদের সাথে তোমরা কী করে যুদ্ধ করবে বাবা…।’
হাল ছাড়ে না মিলু-বিলু।
‘করবো-করবো মা-দেখো আমরা ঠিকই যুদ্ধ করবো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। আর আমরা এ যুদ্ধে জিতবো। ঠিক ঠিক হারিয়ে দেবো পাকিস্তানিদের।’
‘দেখো না আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা কী বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করছে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-আকাশবাণী বলছে না মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনের কথা-বাবার সাথে আমরা শুনছি না রোজ, দেখো হাবাগোবা পাকিস্তানি আর্মি ঠিকই হারবে। আমরা জিতবোই। আমাদের স্বাধীনতা আসবেই।’ গভীর তৃপ্তিতে উচ্ছ্বসিত হয় মিলু-বিলু।
মা অবাক হয়। মিলু-বিলুর কথা শুনে। দেশের স্বাধীনতার জন্য কী দারুণ করে ভাবছে মিলু-বিলু। ওদের বুকের ভেতর স্বাধীনতার কী মধুর স্বপ্ন বাসা বেঁধে আছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জন্য কী ঘৃণা? কী দেশপ্রেম-মিলু-বিলুর। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাদের কী ভাবনা?
মা দেখে আজকাল মিলু-বিলু নিজেরা কী সব শলা পরামর্শ করছে ড্রয়িং খাতা-রঙ তুলি নিয়ে। ফিসফাস করে। মাকে কিছুই বলে না। বাবাকেও না। নিজেরা নিজেরা কিছু একটা করবে বোঝা যায়।
মা বুকে জড়িয়ে ধরে মিলু-বিলুকে। দেশের জন্য ওদের কথায় চিন্তায় গর্বে বুক ভরে যায় মা’র। স্বাধীনতার রঙিন স্বপ্ন আরো গভীরভাবে ধরা দেয় চোখের পাতায়। ঝলমল আনন্দে যেনো ভরে ওঠে চারপাশ। তাদের ছোট মিলু-বিলু যুদ্ধে নামলো বলে। ভাবতে ভালো লাগছে মা’র-ঘরে বাইরে সবাই নেমে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধে-দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে।
তবে মা-ভাবে-খুব ভাবে। কেমনতরো যুদ্ধ করবে মিলু-বিলু। তার কোনো হদিস ঠিকই খুঁজে পায় না মা। ওরা কী করে জানান দেবে-ওরা দেশের জন্য যুদ্ধে নেমেছে-যুদ্ধ করছে।
বাবা-মা’র কাছ হতে মিলু-বিলুর সব কথা শুনেছে। হাসে বাবা।
‘করুক-করুক-ওরা যা চায় করুক দেশের জন্য। ওদের মতো যা কিছু মন চায় করুক।’
বাবা অফিসে। মা দুপুরে সেলাই মেশিন নিয়ে বসেছে।
আর ওদিকে মিলু-বিলু ঠিক এ সময়টায় পড়ার ঘরে ড্রইং খাতার বড় পাতা-তুলি-রঙ-রঙ পেন্সিল নিয়ে কী দারুণ কাজে নেমে পড়ে।
মা এক দু’বার আটকানো দরজা নক করে ফিরে যায়। মাকে পড়ে আসতে বলে নিজেদের কাজে ধুম ব্যস্ত হয়ে পড়ে মিলু-বিলু। মা ওদের সে ব্যস্ততা দেখে ফিরে যায় ওদিকে।
বাবা অফিস হতে ফেরে বিকেলে। সন্ধ্যা পেরোয়। ঝিম রাত নামে। চারপাশ নিস্তব্ধ। বাইরে কোনো সাড়া শব্দ নেই। মা বাবার পাশে বসে যুদ্ধের-শহরের মিলিটারিদের খবরাখবর জানতে।
মিলু-বিলু ঠিক সে সময় বাবার কাছে এসে দাঁড়ায়। হাতে বড়ো ড্রইং খাতার রঙ তুলিতে আঁকা অনেক কটা পৃষ্ঠা। বাবা এ পৃষ্ঠা সে পৃষ্ঠায় দেখে অবাক করা ম্যালা ছবি। পাকিস্তানি আর্মির হিংস্র ছবি-দেশ গ্রামে বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার ছবি-আর্মি বোঝাই ভারী কনভয়, শহর ছাড়া মানুষের ঢল, মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং, অপারেশনের ছবি-গ্রেনেড ছোড়ার দৃশ্য-লাল সবুজ পতাকার ঝলমলে উড়াল ছবি-সব সব দারুণভাবে রঙ তুলিতে আঁকা।
‘বাবা-এই আমাদের যুদ্ধ। আমরা আজ থেকে রাতে এসব ছবি ওই মোড়ের দেয়ালে সাঁটিয়ে দেবে। সবাই দেখুক বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরব কথা। ঘৃণ্য হানাদার পাকিস্তানি আর্মির বর্বরতা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ুক মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর। জয়জয়কার।
বাবা-মার মুখে আর কোনো কথা জোগায় না। মা ভাবে মিলু-বিলু তাহলে কদিন শলা পরামর্শ করে-আজ দুপুরে এই চমৎকার কাজটি করেছে সত্যি মিলু-বিলু একটা দারুণ কাজ করেছে-যার তুলনা হয় না। ভাবতে ভালোই লাগছে তাদের মিলু-বিলুও ঠিক ঠিক যুদ্ধে নেমে পড়েছে।

- Advertistment -