মিডিয়ায় ভিকটিম নারীর ছবি প্রসঙ্গে

নিপা দেব

শনিবার , ১৯ মে, ২০১৮ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ
23

এসিডে ঝলসে গেল’ লিখে সার্চ ইঞ্জিন ‘গুগল’এ ঢুঁ মারলাম। চোখের পলকেই ১৮ হাজার ৭০০ লিংক চলে এলো। প্রতিটি সংবাদই এসিড ছুঁড়ে মারার। হয়তো একই ‘ভিকটিম’কে নিয়ে একই সংবাদ একাধিক ওয়েবপেইজে রয়েছেণ্ড সেটা এখানে বিবেচনায় আনছি না। বিবেচ্য বিষয় হলোণ্ড এই হাজারহাজার সংবাদের বেশিরভাগেই ভিকটিম বা আক্রান্ত হিসেবে রয়েছেন কোনো না কোনো নারী। এবং এই নারীর উপর এই সহিংস আক্রমণকারীরা আর কেউই নন। নারীর নিজ পরিবারেরই কোনো না কোনো সদস্য অথবা পরিচিত কোনো বখাটে বা কোনো সংঘবদ্ধ পুরুষের দল।

যদি একটানা কয়েকটি সংবাদের শিরোনাম আমি বিভিন্ন ওয়েবপোর্টাল থেকে আপনাদের সামনে তুলে ধরি তবে ব্যাপারটা আরেকটু প্রামাণিক হয়। যেমন: ‘সাবেক স্বামীর এসিডে ঝলসে গেল তরুণী ও তার মা’, ‘দুর্বৃত্তের ছোড়া এসিডে ঝলসে গেল গৃহবধূ’, ‘স্বামীর ছোড়া এসিডে ঝলসে গেল তানিয়া’, ‘সাভারে এসিডে ঝলসে গেল গৃহবধূর গোপনাঙ্গ’ ‘দুর্বৃত্তের ছোড়া এসিডে ঝলসে গেল ভাইবোন’, ‘মাদকাসক্ত স্বামীর নিক্ষিপ্ত এসিডে ঝলসে গেল স্ত্রী’, ‘স্বামীর এসিডে ঝলসে গেল স্ত্রীর মুখ’, ‘রাজধানীর কদমতলীতে এসিডে ঝলসে গেল অন্তসত্ত্বা গৃহবধূ’, ‘চট্টগ্রামে স্বামীর এসিডে ঝলসে গেল স্ত্রীশাশুড়ি’, ‘এবার কাজী অফিসেই এসিডে ঝলসে গেল কলেজ ছাত্রী’, ‘এসিডে ঝলসে গেল দুই নারীর মুখ’, নারায়ণগঞ্জে স্বামীর এসিডে ঝলসে গেল স্ত্রী’, ‘ঝিনাইদহে দ্বিতীয় বার ছোড়া এসিডে ঝলসে গেল স্কুল ছাত্রীর মুখমণ্ডল’, ‘সিলেটে দুর্বৃত্তদের এসিডে ঝলসে গেল তরুণীর মুখ’, ‘দিনাজপুরে দুর্বৃত্তের এসিডে ঝলসে গেল গৃহবধূ’, ‘দুর্বৃত্তদের এসিডে ঝলসে গেল নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্রী’, ‘শরীরের সাথে ঝলসে গেল শেলিনার স্বপ্ন’, ‘কচুয়ায় এসিডে ঝলসে গেল গৃহবধূ’, ‘এসিডে ঝলসে গেল ছাত্রীর শরীর’, ‘কুষ্টিয়ার খোকসায় বিয়ের একদিন আগে দুর্বৃত্তদের ছোড়া এসিডে ঝলসে গেল কনের মুখ’।

ভাবনার বিষয় হচ্ছেণ্ড এ ধরনের সংবাদের বেশিরভাগেই ছবি হিসাবে দেওয়া হয়েছে ভিকটিমের ছবি অর্থাৎ কোনো না কোনো নারীর আহত বা বিভৎস কোনো ছবি। যা অনেক সময় যথেষ্ট মানবিক আবেদন উদ্রেকও করতে পারে। আমি মনে করি, সাধারণ পাঠকের সমবেদনা বা সহানুভূতি আদায়ই এ ধরনের ছবির উপযোগিতা। এর মাধ্যমে পাঠকরা ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে পারেণ্ড এটাও সত্য। কিন্তু খুব কমক্ষেত্রে অর্থাৎ কেবল হাতে গোনা গুটি কয়েক সংবাদে অপরাধী হিসেবে অভিযুক্তের ছবি প্রকাশিত (বা ছাপা) হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছেণ্ড যেভাবে দেদারছে ভিকটিম হিসাবে নারীর ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে এ ধরনের সংবাদ পরিবেশনে, অভিযুক্ত অপরাধীর ছবি কেনো সে হারে ছাপা বা প্রকাশ করা হচ্ছে না। এর একটাই কারণ থাকতে পারেণ্ড আর সেটা হচ্ছেণ্ড অভিযুক্ত তো আদালতে প্রমাণিত নয় যেণ্ড সে অপরাধী।

কিন্তু, যে হারে অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পুরুষ অপরাধীর ছবি ছাপা বা প্রকাশ করা হচ্ছেণ্ড তাতে তো কোনো রাখঢাক দেখছি না। কিন্তু এসিড নিক্ষেপের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পুরুষ অপরাধীর বিপরীত পক্ষ হিসাবে নারীর ছবি সহজেই যোগাড় করা যাচ্ছে বলে কি সেই পুরুষ অপরাধী বা অপরাধীদের ছবি যোগাড়ে মিডিয়া বেশ তৎপর হবে না?

সময় এসেছেণ্ড এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার। অভিযুক্ত অপরাধী পুরুষ বলে তার প্রতি একধরনের প্রচ্ছন্নগোপন সমর্থন পুরুষ সাংবাদিকের অবচেতন মনে কাজ করে কিনা সেটা একটা গবেষণার বিষয় হতে পারে। তবে আমার মনে হয়ণ্ড অভিযুক্ত অপরাধীর ছবি তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি বলে তা ছাপা বা প্রকাশ করা সম্ভব হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে! কিন্তু, তার মানে তো এটাই প্রমাণিত হয় যেণ্ড পুরুষ বরাবরই জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করে পালিয়ে যেতে সক্ষম, আর ভিকটিম হিসেবে নারীর পালানোর কোনো জায়গাই নেই। বরং, একের পর এক ফলোআপ রিপোর্টে (অনুবর্তী সংবাদ) আপনি সেই ভুক্তভোগী নারী ভিকটিমের ছবি ছাপিয়েই চলেছেন, অথচ একটিবারের জন্যও আপনার সাংবাদিকতা অভিযুক্ত পুরুষ অপরাধীর ছবি যোগাড় করে তা ছাপিয়ে পাঠকের মনে তার প্রতি ঘৃণা উৎপাদন করতে পারছেন না। অর্থাৎ, বেশিরভাগ অভিযুক্ত নারী নিপীড়নকারীর ছবি ‘আড়ালেই’ থেকে যাচ্ছে!

বিষয়টির রাজনৈতিক অর্থনীতিও কি হালকাভাবে দেখা চলে? কিংবা দেখা উচিত? যদি বলিণ্ড মিডিয়ার বেশিরভাগ এক্সপোজার পুরুষ, আর সেইকারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী ভিকটিমের ছবি ছাপিয়ে আপনি এর মাধ্যমে পুরুষ পাঠকদের মনোযোগ ‘ধরে’ রাখার চেষ্টা করছেন? কিছুদিন আগে একটি পত্রিকায় তাই দেখলাম। ‘দেখতেশুনতে বেশ সুন্দরী’ এক নারীকে তার স্বামী যৌতুকের দাবিতে বেধড়ক মারধর করেছেন। ওই নারী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ওই ঘটনা নিয়ে বেশ কয়েকটি রিপোর্টও হয়েছে। প্রত্যেকটি রিপোর্টেই ওই নারীর ছবি ছাপানো হয়েছে। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও তার অভিযুক্ত নিপীড়ক স্বামীর ছবি ছাপানো হয়নি। যদি বলিণ্ড এক্ষেত্রে পাঠকের কাছে নারীর ‘ইমেজ’ আপনি বিক্রি করছেন ‘দুর্বল’ হিসাবেণ্ড তাহলে কি ভুল বলা হবে? নইলে, যে ঘটনার শিকার হলো তার মানসিক অবস্থার কথা একটু চিন্তা না করে আপনি কীভাবে ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’র মতো একের পর এক তার ছবি ছাপিয়ে বা প্রকাশ করে তা এক সাথে কোটি কোটি পাঠককে দেখিয়ে চলেন? যেখানে তার বিপরীতে অভিযুক্ত পুরুষ অপরাধীর ছবি ছাপানোর তেমন কোনো গরজই আপনি দেখাছেন না।

আবার কখনোসখনো এমনও দেখি বিশেষত কোনো ধর্ষণের সংবাদে কোনো নারীর মুখনির্ভর ‘ধর্ষণউন্মুখ এমন ধরনের প্রতীকী ছবি’ ব্যবহার করা হচ্ছে যা স্পষ্টত নারীর প্রতি চরম অবমাননাকর।

যাই হোকণ্ড এসিড নিক্ষেপ প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এর সর্বশেষ একটি উদাহরণ দিই। গত ২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের একটি সংবাদ এসেছে দেশের প্রায় প্রতিটি পত্রিকাতেই। খবরটির সূচনা করা হয় এভাবে-‘মাকে নিয়ে ঝুপড়ি ঘরের বিছানায় ঘুমিয়ে ছিলেন ২২ বছরের শেলী আক্তার। হঠাৎ মুখ ও শরীরে তীব্র জ্বলুনিতে চিৎকার করে জেগে ওঠেন তিনি। পাশে শুয়ে থাকা মা হোসনে আরা বেগমও (৫৫) তখন আর্তচিৎকার করছেন। তাঁদের চিৎকারে পাশের ঘরে থাকা স্বজনেরা এগিয়ে আসেন। পরে শেলী ও তাঁর মা জানতে পারেন অ্যাসিড ছুড়ে মারা হয়েছে তাঁদের ওপর।অভিযোগ উঠেছে, শেলীর সাবেক স্বামী অটোরিকশাচালক মো. জাহাঙ্গীর বর্বর এ কাজ করেছেন। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক।’ ওই খবরেও গতানুতিকভাবে ভিকটিমের ছবিই ছাপানো হয়েছে। এই সংবাদের কোনো ফলোআপেও অভিযুক্ত অপরাধীর ছবি আমরা ছাপাতে দেখিনি।

যাই হোকণ্ড এই সময়ে এসে যখন জাতীয় পরিচয়পত্রসহ পাসপোর্ট বা অন্যান্য নাগরিক সনদপত্রের খোঁজ সহজেই পাওয়া যায় কোনো নাগরিকেরণ্ড সেখানে অভিযুক্ত অপরাধীর ছবি পাওয়া তো কঠিন কিছু নয়। উপরন্তু, তাৎক্ষণিকভাবে সেই অভিযুক্ত ‘অপরাধীর’ ছবি পাওয়া না গেলেও ফলোআপ রিপোর্টে তা যোগাড় করা কি জরুরি হয়ে পড়ে না? এ কাজের জন্য কেবল দরকার একটু পরিশ্রম করার মানসিকতা। যদি এক্ষেত্রেও আপনি আদালতের দ্বারা ‘দোষী’ সাব্যস্ত করার ব্যাপারটি আনেন তবে বলবো মেনে নিলাম আপনার কথা। কিন্তু আদালত দ্বারা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও কেনো এ ধরনের সংবাদের পরিবেশনে পুরুষ নিপীড়কের ছবি ছাপানো বা প্রকাশ করা হয় না? তখনও কিন্তু আমরা দেখিণ্ড ওই আহত বা নিহত নারীর ছবিকেই ‘লোগো’ বানিয়ে মিডিয়ায় প্রকাশ করা হচ্ছে।

আমি মনেকরি, এ ধরনের সংবাদে ‘ভিকটিম’ হিসাবে নারীর ছবি ছাপানোর মাধ্যমে ওই নারীর প্রতি সাধারণ পাঠক বা মিডিয়া ব্যবহারকারীর মনে যে সমবেদনা বা সহানুভূতি জেগে ওঠেণ্ড অভিযুক্ত অপরাধীর ছবি ছাপানো বা প্রকাশের জন্য তা খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক আরও তৎপর হতে পারে। অন্তত: আদালত দ্বারা দোষী প্রমাণিত হওয়ার পর অপরাধী পুরুষের ছবি প্রকাশ বা ছাপানো তখন আরও জরুরি হয়ে পড়ে।

তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই বারবার সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ‘ক্রসচেকের’ মধ্য দিয়ে যেতে হবে। জোরের সাথে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে ভুল কেউ বা অপরাধী নয় এমন কারও ছবি যাতে কখনোইণ্ড কোনোভাবেই প্রকাশ না পায়। এবং কাউকে যাতে আবার সংবাদের কোনো বাক্যে বা শব্দে নিপীড়নের ‘দায়’ দেওয়া না হয় কিংবা সরাসরি তাকে অপরাধের সংঘটিত করার জন্য ‘দায়ী’ করা না হয়। কারণ, সেটি একেবারেই আদালতের বিবেচ্য তথা ঘোষণার বিষয়। সাংবাদিক বা কোনো মিডিয়ার নয়।

x