মা-র কাছাকাছি

তুহিন ডি খোকন

মঙ্গলবার , ১০ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ
81

শেষ রাত্তিরে বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তার উপর তার চিহ্ন এখনও মুছে যায়নি। ইতঃস্তত জলের বৃত্ত, তার উপর ঝিকিয়ে উঠছে সকাল বেলার রোদ্দুর। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাই দেখছিলাম। দেখতে দেখতে আরেকটি বছর চলে এলো। মনের পাতায় স্মৃতির আঁচড় কাটা সেই দিনটি আজ অম্লান, ৪ঠা এপ্রিলে গেল মায়ের মৃত্যু দিবস।

দূরের ঐ পাহাড়েরা আমাকে তুলে নিয়ে গেল উদাসীনতায়। অভিমান ভরাবেদনার্থ হৃদয়টিকে নিয়ে উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে লাগলাম রাস্তা ধরে। বেশ হাওয়া দিচ্ছে। হাওয়ারা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে গতরাতের ঝড়ের এঁটো পাতাদের। কেমন অগ্নিবর্ণ সব পাতা !

বুক পকেট থেকে মা’কে বের করলাম। দেখলাম, তারপর চোখ বুঁজে মনের সামনে মা’কে ধরলাম। ছটফটে মনটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। মায়ের ছবি আসছে আর চলে চলে যাচ্ছে। শেষে সমস্ত অস্তিত্ব একাগ্র করলাম। মনে হলো আমি মায়ের কোল ঘেঁষে বসলাম। ভীষণ ভালো লাগছিল। রাস্তার পাশে জড়াজড়ি করে কিছু গাছ দাঁড়িয়ে আছে। হেলান দিয়ে বসলাম তাদের নীচে । একটু একটু ঘুম ঘুম পাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন মায়ের কোলে মাথা গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ছি কত নিশ্চিন্ত এই ঘুম ! এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে। যেন মায়ের চারুল আঙ্গুল বিলি কেটে দিচ্ছে আমার চুলে। হঠাৎ বড় ইচ্ছে হলো মায়ের সেই স্নিগ্ধসরল কণ্ঠস্বরটি শুনতে।

চোখ বুঁজলাম, দেখি মা এসে বসে আছে আমার মনের ফ্রেমে। পাছে আমি নড়লে মা সরে যায় তাই আমি স্থির, পাছে চোখের পাতা খুললে মা চলে যায়, তাই আমি সমাহিত যোগীস্থির চোখ বুঁজে আছি। দেখতে দেখতে রোদ চড়লো। সন্তর্পণে বিকেল এলো। দু’গাল বেয়ে জল পড়ছে। বুকের কাছটায় পাক মারছে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো গত ছাব্বিশে মার্চে মা’কে ঘিরে সেই দৃশ্যগুলো।

ভোরবেলা। মা’র ওপেনহার্ট সার্জারি হবে। ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত আমার তিন ভাই সহ অন্যান্য আত্মীয়ের ডাক পড়লো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হসপিটালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে। একটু পর মা’কে স্ট্রেচারে করে নিয়ে এলো হাসপাতালের নার্সরা। ঝাপসা দু’চোখে দেখলাম মা একদৃষ্টে চেয়ে আছে আমার দিকে। নির্বাক তাঁর দু’চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে এলো। মুছিয়ে দিলাম। বললাম, মা তুমি কাঁদছ কেন? কান্নায় মার কণ্ঠ বুঁজে এলো, একটি কথাও বললো না মা আমার। অপারেশন থিয়েটার গামী স্ট্রেচারে শুয়ে কেবল দু’চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগলো। খানিক পরই আমাদের সবাইকে পিছনে রেখে মা’কে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হলো।

এরপর দশদিন ধরে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করলো আমার মা, একমাত্র ডা্‌তারের ভুল অপারেশনের কারণে। এর প্রত্যেকটা দিন দূর থেকে মা’কে দেখতাম আইটিইউ নামক কক্ষের কাঁচের জানালা দিয়ে। ৪ এপ্রিল দুপুর, ডাক্তারদের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক আশ্বাসের সমাপ্তি হলো। ওরা আমাকে জানালো আর বড়জোর মিনিট কয়েক থাকবেন আমার মা। আইটিইউ’র শক্ত ব্যারিকেড পেরুলাম প্রথম ও শেষবারের মতো। বোধহীন অনুভূতি নিয়ে মায়ের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছি। চোখের সামনে রোগাক্লিষ্ট মৃত্যু পথযাত্রী মা আমার, দেখতে পাচ্ছি। আমার মা, যে অন্ধকারের সমুদ্রে একে একে ভাসাচ্ছে তাঁর জীবন মুহূর্তের প্রদীপগুলো। হঠাৎ মা’র বাম চোখ বেয়ে নেমে এলো জল, মৃদু শ্বাসপ্রশ্বাস আরও মৃদু হয়ে এলো। আমার হাতে ধরা তাঁর শীর্ন হাতখানির দিকে তাকালাম। স্পন্দনহীন। মাকে আমি ধরে রাখতে পারলাম না! মা চলে গেল! চোখ ফেটে বেরিয়ে এলো বাঁধ ভাঙা অশ্রু। নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করছি, পারছি না। মা নেই, আমি ভাবতে পারছি না। এই তো আমার মা, আমার পাশেই কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে !

শেষ যাত্রার খাটের উপর ফুল, শুধু ফুল। অজস্র ফুল। তার উপর মা আমার ঘুমিয়ে পড়েছেন। যে ঘুম আর ভাঙবে না।

সন্ধ্যার বানডাকা বাতাস বয়ে যায় বুকের উপর দিয়ে। অনন্ত আকাশ ঝুঁকে থাকে উদাসীনতা ভরে। সেখানে ফিরোজা রঙ ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছে গোধূলীর বেলা। নক্ষত্রের জগত ভেসে উঠতে থাকে। ওই হলো কালপুরুষ। ছোটবেলায় দেখেছি। এত বছর পর আরও উজ্জ্বল হয়েছে। সন্ধ্যা তারাটা কোথায় গেল এইতো একটু আগে সন্ধ্যা হলো ! ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে মনে হলো সব তারা মিলেমিশে একাকার হয়ে আমার চোখের ভেতর ঢুকে পড়েছে। চোখ বন্ধ করলাম। মানুষ মরে গেলে কি তারা হয়ে যায় ছোট বেলায় কে যেন বলেছিলো। তা হলে ‘মা’ কোন তারা?

হঠাৎ আবিষ্কার করলাম বুক আমার ভেসে যাচ্ছে জলে। মা, জানি জীবনে একবারই দেখা হয়। তোমার সাথে আমার আর দেখা হবে না। লক্ষী মা আমার যেখানেই আছো, ভালো থেকো।

আমার মাথার ভেতর এক আকাশের শূন্যতা। হৃদয়ের মধ্যে শব্দহীন জ্যোৎস্না। সেই জ্যোৎস্নার ভিতর বুনো হাঁসের ঝাঁক ওড়ে। বুকের ভেতর নিরুচ্চার কষ্ট । বিদায় মা। বিদায়!!!

মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে

মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে’

x