মা দিবসের প্রার্থনা ভাল থাকুক সব মা

নিপা দেব

শনিবার , ১২ মে, ২০১৮ at ৭:১২ পূর্বাহ্ণ
31

আনা জার্ভিস তখন সমালোচনা করেন মাকে হাতে লেখা চিঠি না দিয়ে কার্ড কেনার নতুন প্রথাকেণ্ড যেটিকে তিনি আলসেমি হিসাবে গণ্য করতেন। ১৯৪৮ সালে এই আনাকেই গ্রেফতার করা হয় মা দিবসের বাণিজ্যিকীকরণের প্রতিবাদ করার কারণে।

জগতে সন্তানের প্রতি মাবাবার ত্যাগতিতীক্ষা সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘তাঁহাদের দৈন্যদুর্বলতা, তাঁহাদের মনুষ্যত্ব সমস্তই আমরা নিশ্চিত জানি, কিন্তু ইহাও সেইরূপ নিশ্চিত জানি যে ইঁহারা পিতামাতারূপে আমাদের যে কল্যাণ সাধন করিতেছেন সেই পিতৃমাতৃত্ব জগতেরই পিতামাতারই প্রকাশ।’ আমাদের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদও তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন, ‘মায়েদের অভিশাপ কখনো সন্তানের গায়ে লাগে না। দোয়া গায়ে লাগে। হাঁসের গায়ের পানির মত অভিশাপ ঝরে পড়ে যায়।’ আর একদিন পরই অর্থাৎ আগামীকাল মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় শ’খানেক দেশে উদযাপিত হবে ‘মা দিবস’।

মূলত: সন্তানের কাছে সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছেন তাঁর মা। মায়ের গর্ভে সন্তান যেমন রক্ত শুষে নিরাপদে ধীরে ধীরে বড় হয়, তেমনি জন্মের পরও তিল তিল করে মাই কেবল তার নাড়ি ছেঁড়া ধনকে তিলে তিলে বড় করে তোলেন আগামীর সম্ভাবনাময় একজন মানুষ হিসেবে। মাকে ভালোবাসা আর তাঁর প্রতি হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধার বিষয়টি পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোতেও তাই অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই মাকে ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিনের প্রয়োজন না থাকলেও একটি বিশেষ দিনকে বহু যুগ ধরে এ পৃথিবীর মানুষ ‘মা দিবস’ হিসেবে উদযাপন করে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এ্‌ই দিবসটির স্বীকৃতি দিলেও পৃথিবীর বহু দেশে বিভিন্ন তারিখে এই দিনটি উদযাপন করা হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা কি জানিণ্ড কী ছিলো এই দিবসটির শুরুর কথা? পুরো পৃথিবীব্যাপীই বা তা ছড়িয়ে গেলো কেমন করে?

প্রকৃতপক্ষেণ্ড বিশ্বের সর্বত্র মায়ের এবং মাতৃত্বের অনুষ্ঠান উদযাপন করা হয়। ইতিহাস পাঠে জানা যায়ণ্ড একটি গোষ্ঠীর মতে এই দিনটির সূত্রপাত প্রাচীন গ্রিসের মাতৃ আরাধনার প্রথা থেকে যেখানে গ্রিক দেবতাদের মধ্যে এক বিশিষ্ট দেবী সিবেলএর উদ্দেশ্যে পালন করা হত একটি উৎসব। এশিয়া মাইনরে মহাবিষ্ণুব এর সময়ে এবং তারপর রোমে ১৫ই মার্চ থেকে ১৮ই মার্চের মধ্যে এই উৎসবটি পালিত হত।

প্রাচীন রোমানদের ম্যাত্রোনালিয়া নামে দেবী জুনোর প্রতি উৎসর্গিত আরও একটি ছুটির দিন ছিল, যদিও সেদিন মায়েদের উপহার দেওয়া হত। এরপর মাদারিং সানডে’র মতো ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে বহু আচারানুষ্ঠান ছিল যেখানে মায়েদের এবং মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট রবিবারকে আলাদা করে রাখা হত। মাদারিং সানডে’র অনুষ্ঠান খ্রিস্টানদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পঞ্জিকার অঙ্গ। ক্যাথলিক পঞ্জিকা অনুযায়ী এটিকে বলা হয় ‘লেতারে সানডে’ যা মার্চের চতুর্থ রবিবারে পালন করা হয় ভার্জিন মেরি বা কুমারী মাতা ও ‘প্রধান গির্জার’ সম্মানে। প্রথানুযায়ী দিনটিকে সূচিত করা হত প্রতীকী উপহার দেওয়া এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রান্না আর ধোয়াপোছার মত মেয়েদের কাজগুলো বাড়ির অন্য কেউ করার মাধ্যমে।

জুলিয়া ওয়ার্ড হোই রচিত ‘মাদার্স ডে প্রক্লামেশন’ বা ‘মা দিবসের ঘোষণাপত্র’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবস পালনের গোড়ার দিকের প্রচেষ্টাগুলির মধ্যে অন্যতম। আমেরিকান গৃহযুদ্ধ ও ফ্রাঙ্কোপ্রুশীয় যুদ্ধের নৃশংসতার বিরুদ্ধে ১৮৭০ সালে রচিত হোইএর মা দিবসের এই ঘোষণা পত্রটি ছিল একটি শান্তিকামী প্রতিক্রিয়া। রাজনৈতিক স্তরে সমাজকে গঠন করার ক্ষেত্রে নারীর একটি দায়িত্ব আছে, হোইএর এই নারীবাদী বিশ্বাসও ঘোষণাপত্রটির মধ্যে নিহিত ছিল।

অত:পর বিংশ শতকের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে আনা জারভিস নামের এক নারী মায়েদের অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্য সচেতন করে তুলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। এ কাজের মধ্য দিয়ে তিনি মায়েদের কর্মদিবসের সূচনা করেন। ১৯০৫ সালে আনা জারভিস মারা গেলে তাঁর মেয়ে আনা মারিয়া রিভস জারভিস (১৮৬৪১৯৪৮) মায়ের কাজকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য সচেষ্ট হন। ওই বছর তিনি তাঁর ‘সান ডে স্কুল’(যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলিফিয়ার ওই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তিনি) প্রথম এ দিনটি মাতৃদিবস হিসেবে পালন করেন। ১৯০৭ সালের এক রবিবার আনা মারিয়া স্কুলের বক্তব্যে মায়ের জন্য একটি দিবসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। ১৯১২ সালে আনা জার্ভিস ‘মাদারস ডে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন’ (আন্তর্জাতিক মা দিবস সমিতি) গঠন করেন। এমনকি তিনিই ‘মে মাসের দ্বিতীয় রোববার’ আর ‘মা দিবস’ এই দুটি শব্দের বহুল প্রচারণা চালাতে সক্ষম হন। বিফল হয়নি তাঁর ওই প্রচেষ্টা। ১৯১৪ সালের ৮ মে মার্কিন কংগ্রেস মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে ‘মা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এভাবেই শুরু হয় আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবসের যাত্রা। ১৯৬২ সালে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক দিবসের স্বীকৃতি পায়। পৃথিবীর বহু দেশ তখন দিবসটি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পালন করা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় আমেরিকার পাশাপাশি মা দিবস এখন বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, অস্ট্র্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, রাশিয়া ও জার্মানসহ শতাধিক দেশে মর্যাদার সঙ্গে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এক পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস দ্বারা দিনটিকে সরকারি ছুটির হিসাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। বর্তমানে বেশিরভাগ দেশেই মা দিবস হল একটি সাম্প্রতিক রীতি, যা উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে ছুটির দিনটির রীতি অনুসারে চলে এসেছে।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সমাজে বিশেষ করে ইউরোপআমেরিকায় দিবসটি শুরু থেকেই বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। সেখানে উদযাপনের জনপ্রিয়তায় মা দিবসের অবস্থান অনেক উপরে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশে এ দিবসটি ঘটা করে পালনের ইতিহাস খুব বেশি দিনের পুরনো নয়। কয়েক বছর আগের এক হিসেবে দেখা যায়ণ্ড আমেরিকানরা এই দিবস উপলক্ষ্যে আনুমানিক ২০৬ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ফুলের ওপর, ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করে বিভিন্ন বিলাসী উপহারের ওপর যেমন স্পা ট্রিটমেন্ট ইত্যাদি) এবং আরও ৬৮ মিলিয়ন ডলার খরচ করে তাঁরা গ্রিটিংস কার্ডের ক্রয়ে। এছাড়া ওই দিনে ‘মাদার’স রিংস’ বা মায়েদের জন্য আংটির মত প্রচলিত উপহার প্রদানের খরচ মার্কিন গয়নাা শিল্পের বার্ষিক রাজস্বের ৭.% রাজস্ব উদপাদন করে। অন্য একটি খবরে জানা যায়ণ্ড মা দিবস এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিকভাবে সব থেকে সফলতম পর্ব। কারণ, সেখানকার ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোশিয়েশনের মতেণ্ড রেস্টুরেন্ট ডিনার করার অন্যতম জনপ্রিয় দিন হল এই মা দিবস।

কয়েক বছর আগের অপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, অন্য বিশেষ দিনগুলোর চেয়ে এ দিনটিতে সবচেয়ে বেশি ফোন কল হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভিআইপি কমিউনিকেশনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ দিনটিতে নববর্ষের চেয়ে ৮ শতাংশ, ভালোবাসা দিবসের চেয়ে ১১ শতাংশ এবং হ্যালোয়েনের চেয়ে ৬২ শতাংশ বেশি ফোন কল হয়। দক্ষিণ আফ্রিকানরা মা দিবসে ফোন করে সবচেয়ে বেশি। তাদের ফোন কলের হার বেড়ে ৯১ শতাংশ হয়েছে। যা অন্য বিশেষ দিনগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। এ ছাড়াও তারা অন্যদের চেয়ে এ দিনটিতে ফোনে বেশি সময় ব্যয় করে।

দিবসটি এভাবে বাণিজ্যিক হয়ে পড়ার শঙ্কা কিন্তু তখনই করেছিলেন আর্না জার্ভিস। কেননা, আমরা ইতিহাসে দেখতে পাইণ্ড সরকারিভাবে মা দিবস পালনের ন’বছরের মাথায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দিবসটি এতটাই বাণিজ্যিক হয়ে পড়ে যে আনা জার্ভিস নিজেই পরে এই তাৎপর্য পাল্টে যাওয়া দিনটির ঘোর বিরোধী হয়ে যান এবং নিজের সমস্ত সম্পত্তি ও জীবন দিনটির এইরকম অবমাননার প্রতিবাদে ব্যয় করেন। আনা জার্ভিস তখন সমালোচনা করেন মাকে হাতে লেখা চিঠি না দিয়ে কার্ড কেনার নতুন প্রথাকেণ্ড যেটিকে তিনি আলসেমি হিসাবে গণ্য করতেন। ১৯৪৮ সালে এই আনাকেই গ্রেফতার করা হয় মা দিবসের বাণিজ্যিকীকরণের প্রতিবাদ করার কারণে। এবং একপর্যায়ে তিনি বলতে বাধ্য হন যেণ্ড ‘এই দিনটির সূচনা না করলেই ভালো হত কারণ এটি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’ এই কথা হয়তো এখন অনেকেরই অজানা। বাণিজ্যিক চাপে পড়ে মা দিবসের আসল তাৎপর্য এখন মিইয়ে যাচ্ছে বলা যায়।

সবশেষে বলবোণ্ড মা দিবস নিয়ে আলোচনা কিংবা সমালোচনাণ্ড যাই হোক। আমি শুধু এই দিনটি উপলক্ষ্যে নয় বরং বছরের প্রতিটি দিনই কবি শঙ্খ ঘোষের মতো বলতে চাইণ্ড ‘মা গো আমার মা/ তুমি আমার এ ঘর ছেড়ে কোথাও যেও না।’

সব মায়ের প্রতি রইল ভালোবাসা। ভালো থাকুক সব মা।

x