মা ও রান্নাবান্না

রূপা দত্ত

শনিবার , ১৮ মে, ২০১৯ at ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ
41

গতকাল সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুক চেক করতে গিয়ে দেখি জুকারবারগ আমাকে ৫ বছর আগের এক পোস্টের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ৫ বছর আগে ‘মা দিবস’ উপলক্ষে লেখা পোস্ট। সেবার আমি মা দিবসের সময় মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে ছিলাম এবং মা-কে শুভেচ্ছা জানাতে ভুলে গিয়েছিলাম। একদিন পর বাসায় এলে, মা খুব অভিমান নিয়ে কথাটা তুলেছিল। সেবারের পর থেকে সচেতন থাকার চেষ্টা করি যেন দিনটা আর সব দিনের মত ভুলে না যাই।
আজ সকালে মা-কে ফোন করতেই মা কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, ‘তুমিও তো আমার মা। তুমিও শুভেচ্ছা নিও।’ যথারীতি আমার স্বভাব মোতাবেক ঝাড়ি দিয়ে বললাম, ‘ঠাম্মাকে ফোন দিছেন? কান্না রেখে আগে নিজের মারে ফোন দেন।’ মায়ের সাথে এতটুকুই কথা মা দিবস উপলক্ষে।
আমার কাছে, আমাদের কাছে মা হল একটা ঘ্যানঘ্যানের ডিব্বা। এই যেমন কালকে কঙবাজার আসার আগে বলতে লাগল, ‘রবিবারটা ছুটিই নিয়ে নিতি, সার্টিফিকেটগুলা তোলা দরকার।’ আবার আমার ঝাড়ি, ‘আমার সার্টিফিকেট আমি তুলবো, আপনার এই নিয়া এত চিন্তা কেন?’
কালকে সকালবেলা দেখি মা তেলাকুচা শাক নিয়ে বসছে। রান্নার মেন্যু কি হবে জানতে চাইলে বলল, ‘তেলাকুচার শাক, থানকুনি পাতার ভর্তা, লইট্টা মাছ আর ডাল। খাবার সংক্ষিপ্ত। আর তোর পটল পছন্দ, পটল আনা হইছে। শোল মাছ আছে একটু। আমরা খাইছিলাম। তোর জন্য অল্প রাখা আছে। আনারসের টক রান্না করব ভাবছিলাম। তিলও ভাজা ছিল। কিন্তু, একটা ছোট আনারস আছে, সেইটা তোর বাবাকে দিব, তাই আর আনারসের টক হবে না।’ আম্মাজানের কথা শুনতে শুনতে বীথি আপুর কথা মনে হইল। আমাদের ঘরে নাকি ট্রাডিশনাল রান্না হয়, যেটা সচরাচর অন্যেরা রান্না করে না। আপুর কথা মনে হতেই ঘোষণা দিলাম, ‘মা, বীথি আপু দুপুরে খাবে।’ আবার মা শুরু করলেন, ‘এইগুলা দিয়ে কেমনে খাবে? ঘরে তো ভাল মাছ নাই। একটা মানুষ আসবে।’ বললাম, ‘যা আছে তাই। ভালো কিছু ও মেলা খায়, ভালো কিছু রাঁধতে হবে না।’ আপুরে ফোন দিয়ে জানিয়ে রাখলাম সে দুপুরে আমাদের বাসায় খাচ্ছে। মা’রে বললাম, ‘আপনারা মজা করে শোল মাছ খাইছেন, এখন আমাকে খাওয়ান। কত বছর খাই না। মজার মজার খাওয়া সব তো আপনারাই খান। ভালো করে গরম মশলা দিয়ে রান্না করবেন (আমাদের বাসায় শোল মাছের স্পেশাল রান্না হয়)। আনারসের টক হচ্ছে না তো কি হইছে, আমের টক করেন। মেলাদিন খাই না। আর আলু পটলের ডালনা করেন। নারিকেল বাটা দিয়ে না, ঝাল ঝাল মাখা মাখা করে আলুর দমের মতো করে। তরকারি কেটেকুটে সব গুছিয়ে দিয়ে আমি রান্নাঘর ছাড়লাম। এদিকে বাসায় নাই ইলেক্ট্রিসিটি। মা আর মামি মিলে রান্নার পাট শেষ করলেন।
খেতে বসে প্রথমেই চোখ গেল ডালের দিকে। আমার মায়ের রান্না ডাল খুবই বিখ্যাত আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে। কিন্তু, সেই ডালের উপর দেখি পোড়া কালো কালো পেঁয়াজ ভাসছে। ডালের রঙ হলুদ না হয়ে, হয়েছে লাল। মা বললেন, টমেটোর কারণে। মাঝে সাঝে ডালের ফোঁড়নের পেঁয়াজ পুড়ে ফেলা আমার মায়ের পুরান অভ্যাস। শাক খেতে গিয়ে দেখি লবণ বেশি। যদিও বীথি আপু বলছে ঠিক আছে। মামা খেতে বসে রায় দিল, শাকে আসলে তেল কম হইছে। ময়মনসিংয়ের বিখ্যাত জামআলু দিয়ে শখ করে যে শোল মাছ রান্না হইল, সেটাও দেখি পোড়া পোড়া, লবণ বেশি। কাহিনি কি? মা’র উত্তর, ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না, চশমা দিয়েও ভালো দেখা যায় না অন্ধকারে। মাসতুত ভাই অনিক আবার বলে দিছে রান্না খুব ভালো হইছে, এইটা নিয়ে কোন কথা হবে না। আলু-পটলের তরকারি দেখে তো মেজাজ পুরাই খারাপ। সাদা সাদা হয়ে আছে। বলছিলাম, ঝাল-ঝাল লাল-লাল মাখ-ামাখা করে রান্না করতে। রান্না করছে মিষ্টি-মিষ্টি তরকারি। ঘটনা কি? মামি আস্তে আস্তে বলল, ‘টক দই ছিল না, তাই মিষ্টি দই দিছি।’ হায় খোদা মোরে তুলে নাও। এবার মামা অভিযোগ শুরু করল, ‘তোর মা আর মামি যে কি শুরু করছে। তাজা তাজা লইট্টা মাছ আনছিলাম, বলছি বড়া বানাইতে, সেই বড়া বানাইছে ফ্রিজে মাছ পুরান করে কয়েকদিন পর। ফাইস্যা মাছরে বলছিলাম ভাজা ভাজা করি রানতে, কিন্তু করছে ঝোল-ঝোল রান্না। তেইল্লা মাছেরে কি যে রানছে। যা ইচ্ছা হইতেছে তাই রানতেছে।’ মামা শেষ করতে না করতে যোগ দিল বাবা, ‘নাহ, তোর মা রানতেই ভুইল্লা গেছে। আলু-পটলের ডালনা কি সুন্দর মাখা মাখা হবে, ঘিয়ের গন্ধ ছড়াবে, তেলটা উপরে উঠে আসবে। তা না, কি যে এক রান্না শিখছে দই দিয়া আর নারকেল দিয়া। লইট্টা মাছের কেউ ঝোল করে, দেখ কেমন ঝোল ঝোল হইছে।’ মা’র রান্না নিয়ে যে-কথা আমরা অন্তরে ধারণ করি তা হইল, যদি মা’রে কেউ বলে এইটা খাইতে মন চাইছে, তাইলে খুব যত্ন করে এমনভাবে রান্না করবে যে, সেই খাবারের কথা জীবনেও কেউ আর বলবে না। সেটা যে কি একখান জিনিস হবে! খেতে বসে রান্না নিয়ে এত গবেষণা নিশ্চিতভাবে বীথি আপু আগে কখনো দেখে নাই। আমরা একেক জন বিশিষ্ট রন্ধন বিশারদ হয়ে গেলাম। অনিক এবার মা আর মামির পক্ষ নিয়ে কথা বলতে শুরু করল, ‘এত কথা না বলে নিজে রান্না করতি। এত তরকারি যে রান্না করছে সেটা কত না। মাসি কিছু কয় না দেখি, তোরা এইরকম শুরু করছস।’
তো এই হল আমার মা; এই হল আমাদের ঘরের নিত্য দিনের কাণ্ড; এই আমার মায়ের সংসার। আমার মা ফেনীর মানুষ, বাবা নেত্রকোনার আর আমাদের স্থায়ী ঠিকানা চট্টগ্রাম। তাই রান্না খুবই বৈচিত্র্যপূর্ণ। আর এই খাবার টেবিল ঘিরেই আমাদের প্রতিদিনকার বিশাল কাহিনি। নিত্যদিনের এই বিরক্তি উদ্রেককারি কাণ্ডগুলাই আনন্দের স্মৃতি হয়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে আমাদের জীবনে।
তো আমার ঘ্যানঘ্যানে মা একটা কথা ঘ্যানঘ্যান করে আমার এবং আমার ভাইয়ের মাথায় ঢুকাইছে, ‘নিজের পায়ে দাঁড়াও। নিজের পায়ে দাঁড়াইলে মানুষ কিছু বলবে না আর কারও মুখের দিকে তাকাই থাকতে হবে না।’ এখন জানি ওই ঘ্যানঘ্যানে কথাটা কত দরকারি ছিল। এইটা মাথায় ঢুকিয়েছে বলেই এখনও নিজেরটা নিজে কামাই করে খাই, প্রতিকূল সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছি।
ব্যাক্তিগত ঘটনাপ্রসূত, সকাল থেকে মনে হচ্ছে যেন বুকের উপর বিশাল একটা পাথর চেপে বসেছে। মনে হচ্ছে একটা ফোন করি, কিন্তু করা আর হয় না। মা আমারে ছোটবেলা-বড়বেলায় বলত, আমার স্বভাব হইল কুত্তার মতো আর আমারে বানানো হইছে বিলাইয়ের হাড্ডি দিয়া। কিছু হইলেই আমার মাথায় রক্ত উঠে যেত আর ঘেউ ঘেউ করতাম (এখনও যায়, তবে নিজেরে কন্ট্রোল করা শিখতেছি), আর ঘটনা শেষ হইলেই বিলাইয়ের মত মা’র কাছ ঘেঁষে মিউ মিউ করতাম (এখনও করি)। এইতো সেদিন, চাকরি সংক্রান্ত একটা পরীক্ষা ছিল, কিন্তু সেটার মানসিক চাপ নিতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল মা’র সাথে কথা বললে সব ঠিক হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে, পরীক্ষা শুরুর একদম আগ মুহূর্তে মাকে ফোন দিলাম। মা এবার আমারে ঝাড়ি দিল, ‘এত চিন্তা কিসের? সব ভালো হবে। তুমি নিজেকে এত দুর্বল ভাবো কেন? মাথা ঠাণ্ডা রাখ।’ মনে হইল, আর চিন্তা নাই। সব ভালোই হবে এবং হয়েওছিল। এই বুড়া বয়সে এসেও মাঝেমধ্যে কুসংস্কারাচ্ছন্ন হইতে ভালই লাগে।
ওহ…কালকে ফেসবুকের এক প্রশ্নের জবাবে লিখছিলাম, ঢ়রুুধ হচ্ছে প্রিয় ইতালিয়ান খাবার। শুভাশিস জানতে চাইল বাংলা খাবারের কথা। কিছুতেই যে কোনো একটা খাবারের কথা বলতে পারলাম না। মা’র এত এত রকমের রান্না আছে, কোনটা ছেড়ে কোনটা বেছে নিব এইটা বড়ই মুশকিলের বিষয়। শেষে এই সাব্যস্ত হল, ‘মায়ের রান্নাই প্রিয়।’
*** মায়েদের রান্না ঘরে আর ঘর-সংসারে আটকে ফেলেছি, এই টাইপ কিছু ভাবনা চিন্তা এলেও, এটাই সত্য আমার মায়ের জন্য।

x