মায়ের স্তনে দুধ তৈরি বন্ধ হওয়ার কারণাদি

প্রফেসর ডা: প্রণব কুমার চৌধুরী

শনিবার , ২৭ অক্টোবর, ২০১৮ at ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ
70

১. কারণ : শিশু পর্যাপ্ত দুধ না পাওয়ার কারণসমুহ বিচার করলে প্রধান কারণ হিসেবে আমার দেখতে পাই শিশুকে অন্য কোন দুধ, খাবার বা পানীয় দেয়।
সমাধান : যখনই কোন শিশুকে অন্য কোন খাবার বা পানীয় দেয়া হয় স্বভাবতই শিশু মায়ের দুধ খাবার চাহিদা কমে যায়। এ জন্য শিশুটি কম চোষে বলে স্তনে দুধ তৈরিও ব্যহত হয়। কাজেই কিছুতেই মায়ের দুধ ব্যতিত অন্য কোন দুধ, খাবার বা পানীায় দেয়া যাবে না।
২. কারণ : কর্মজীবী মায়েরা ৮-১০ ঘণ্টা কর্মক্ষেত্রে থাকেন। এসময় বুকের দুধ চেপে বের করার সঠিক পদ্ধতি এবং সংরক্ষণ যদি তারা না জানেন, তাহলেই তারা বিকল্প দুধ খাওয়ানো শুরু করেন। ফলে, পরবর্তীতে মায়ের পর্যাপ্ত দুধ তৈরি হয় না।
সমাধান : সঠিকভাবে মায়ের দুধ চেপে বের করে পরবর্তীতে সংরক্ষণের মাধ্যমে মা পরোক্ষভবে দুধ কমে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
৩. কারণ : যদি শিশুকে বোতল অথবা চুষনি দেয়া হয় শিশু ভুলে যায় কি ভাবে স্তনে চুষতে হবে। বোতলের বোঁটা এবং স্তনের বোঁটা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির বলে শিশুরে নিপল কনফিউসন হয়। বোতল দুধ খাওয়া শিশু সঠিকভাবে স্তন চোষে না। ফলে স্তনে দুধ তৈরি কমে যায়।
সমাধান : তাই শিশুকে বোতল দিয়ে দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিয়ে ধীরে ধীরে মায়ের দুধে অভ্যস্থ করে তুলতে হবে।
৪. কারণ : মায়ের স্তনে যখন কোন সমস্যা হয় যেমন বোঁটা ফেটে যাওয়া, বোঁটায় ঘা, স্তনে ফোঁড়া, স্তন ফোলা ইত্যাদি তখন মা তার শিশুকে দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দেন।
সমাধান : মায়ের জেনে রাখা ভালা এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসার সাথে সাথে মায়ের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে। আক্রান্ত স্তনে কেউ যদি দুধ খাওয়ানো বন্ধ করতে চান ১-২ দিনের বেশি কিছুতেই বন্ধ রাখা উচিৎ নয়। তবে সে সময় অবশ্যই প্রতি তিন ঘন্টা অন্তর মায়ের দুধ চেপে নিতে হবে যাতে দুধের সরবরাহ ঠিক থাকে। দুই এক দিনের মধ্যেই শিশুকে আক্রান্ত স্তনে খাওয়ানো শুরু করতে হবে।
৫. কারণ : কোন কোন মা শিশুকে রাতে খাওয়ান না। এতে মায়ের দুধ তৈরি কমে যাবে। কেননা প্রোল্যকটিন হরমোন যেটি স্তনে দুধ তৈরি হওয়ার জন্য জরুরি, তা রাতে বেশি তৈরি হয়।
সমাধান : শিশু যখনই খেতে চায় দিনে রাতে তার চাহিদা অনুযায়ী মায়ের দুধ খাওয়াতে বলতে হবে।
৬. কারণ : কেউ কেউ সময় ধরে বা ঘড়ি অনুসরণ করে শিশুকে খাওয়ান।
সমাধান : দুধের চাহিদা এক এক শিশুর এক এক রকম। মায়ের দুধ ঘন্টায় ঘন্টায়, দিনে দিনে প্রতিটি শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। শিশুর চাহিদা অনুযায়ী তাকে না খাওয়ালে স্বভাবতই স্তনে দুধ তৈরি কমে যায়। আবার মা খুব তাড়াহুড়া করে শিশুকে দুধ খাওয়ালে শিশু পুরোপুরি স্তন খালি করে দুধ খেতে পারেনা তখন স্তনে কিছুটা দুধ থেকে যায় যা পরবতীতে দুধ তৈরি কমিয়ে দেয়।
৭. কারণ : অনেক মা শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন না।
সমাধান : মায়ের দুধ বোঁটার চারপাশের কালো অংশের নীচে থাকে। সুতরাং শিশু যদি শুধু বোঁটা মুখে নেয় তখন শিশু ভাল করে চুষতে পারেনা। এছাড়া বোঁটায় দুধ থাকেনা বলে সে পর্যাপ্ত দুধ পায় না এবং স্তনও সম্পূর্ণ খালি হয় না। তাই মাকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর সঠিক পদ্ধতি শিখিয়ে দিতে হবে।
৮. কারণ : কেউ কেউ শিশুকে আলাদা খাটে শোয়াতে পছন্দ করেন। মায়ের দুধ খাওয়ার ক্ষেত্রে এটা একটি অন্তরায়। শিশু যদি মায়ের কাছে থেকে ৭/৮ ঘণ্টা আলাদা থাকে তখন শিশু স্তন থেকে দুধ চুষতে পারে না এবং এই সময় মা যদি দুধ চেপে না বের করেন তবে স্তনে দুধ তৈরি কমে যাবে।
সমাধান : শিশু মায়ের সাথে এক বিছানায় থাকলে সে যখনই খেতে চায় তখনই মা তাকে খাওয়াতে পারবেন এবং মায়ের যথেষ্ট পরিমানে দুধ তৈরি হবে।
৯. কারণ : ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই শিশুকে বাড়তি খাবার দিলে শিশুর পেট ভরে যায় বলে সে বেশিক্ষণ মায়ের দুধ টেনে খায় না। ফলে দুধ তৈরি হওয়াও কমে আসে।
সমাধান : শিশুর বয়স ৬ মাস পূর্ণ (১৮০ দিন) হবার পর পরই শিশুর বাড়তি খাবার শুরু করতে হবে।
১০. কারণ : অনেক মা আছেন, যাঁরা শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো একেবারেই পছন্দ করেন না। এসব ক্ষেত্রে বুকের দুধ অবশ্যই কমে যাবে। এছাড়া মায়ের আস্থাহীনতা, সঠিক জ্ঞানের অভাব, দুশ্চিন্তা ও পরিবারিক অসহযোগিতা দুধ খাওয়ানোতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে, ফলশ্রুতিতে মায়ের দুধ তৈরি কমে যায়।
সমাধান : শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে পরিবারের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শিশুর মা, বাবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর উপকারিতা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। মাকে দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে থাকার কথা বলতে হবে।
১১. কারণ : মা যখন গর্ভবতী হন তখন শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দেন।
সমাধান : গর্ভবতী মায়েরা ইচ্ছে করলে কোলের শিশুকে দুধ খাওয়াতে পারেন। এতে গর্ভের সন্তনের অথবা কোলের শিশুর কোন ক্ষতি হবে না। ইস্ট্রোজেন আছে এমন জন্ম নিরোধক বড়ি খেলে স্তনে দুধ তৈরি করে যাবে। সুতরাং এ সমায় বড়ি ছাড়া অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে।
১২. কারণ : এছাড়া শিশুরা যখন অসুস্থ হয় অথবা সময়ের আগে জন্মায় তখন ভালভাবে মায়ের দুধ চুষতে পারেনা। ফলে স্তনে দুধ তৈরি কমে যেতে পারে।
সমাধান : এসব শিশু একবারে ভাল করে খেতে পারে না বলে এদেরকে বারে বারে মায়ের দুধ দিতে হবে। প্রয়োজনে দুধ গেলে শিশুকে খাওয়াতে হবে। না হলে স্তন খালিও হবে না এবং দুধ তৈরিও কমে যাবে।
কিভাবে সাহায্য করতে হবে
হ মাকে আশ্বাস্ত করতে হবে
হ মার কাছে জানতে হবে কোন সে মনে করছে যে শিশু ঠিক পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ পাচ্ছে না
হ সঠিকভাবে অসুবিধা চিহ্নিত করতে হবে, যেমন- শিশুকে মায়ের দুধ দেয়ার সময় মা ও শিশুর অবস্থান, মায়ের স্তনে শিশুর লেগে থাকা, মায়ের মানসিক অবস্থা এবং মা ও শিশুর কোনো অসুস্থতা আছে কি না এসব দেখতে হবে।
হ মাকে বুঝতে হবে শিশু প্রত্যেকবার যেন খাওয়ার সময় এক স্তন থেকে খাওয়া শেষ করে আরেক স্তনের দুধ খায়। এতে সে প্রথম দিকের দুধ (ঋড়ৎব গরষশ) এবং শেষের দিকের দুধ (Hind Milk) দুই-ই খেতে পারছে।
হ মায়ের দুধ ছাড়া শিশুকে ৬ মাস পর্যন্ত আর অন্য কিছু যেমন- পানি , কৌটার দুধ, অন্যান্য খাবার কিছুই দেয়া যাবে না।
হ শিশুকে মায়ের কাছ থেকে দূরে রাখা যাবে না। যদি থাকে হবে তাকে মায়ের দুধ গেলে খাওয়াতে হবে।
হ শিশু যখনই খেতে চায় দিনে রাতে তার চাহিদা অনুযায়ী খাওয়াতে দিতে হবে
হ শিশু যতক্ষণ না দুধ নিজে নিজেই ছেড়ে না দেবে ততক্ষণ তাকে দুধ দিতেই হবে
প্রতিরোধের উপায়
/ শিশুকে মায়ের সংস্পর্শে রাখতে হবে
/ এক ঘন্টার মধ্যে মায়ের দুধ খাওয়ানো শুরু করতে হবে
/ মা ও শিশুর অবস্থান ও সংস্থাপন (position and attchment) ঠিকভাবে হতে হবে
/ বারে বারে বেশি সময় নিয়ে মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে এতে মায়ের স্তনে প্রচুর পরিমাণে দুধ তৈরি হবে
/ এক স্তন খাওয়া শেষ হলে আর এক স্তনে দিতে হবে
/ দিনে রাতে শুধুমাত্র মায়ের দুধ দিতে হবে। শিশু যখনই চাইবে তখনই তাকে দুধ দিতে হবে
/ শিশুকে বোতল (ফিডার) বা চুষনি দেয়া যাবে না।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান
শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চমেক হাসপাতাল

x