মায়ের শীতল পাটির টাকায় মেয়ের গোল্ডেন এ প্লাস

আকাশ আহমেদ ।। রাঙ্গুনিয়া

সোমবার , ২১ মে, ২০১৮ at ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ
249

সনি নাথ। রাঙ্গুনিয়ার একজন মেধাবী গরীব শিক্ষার্থী। উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় একমাত্র গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে সে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার ভ্যানচালক বাবা মারা যাওয়ার পর দিনের পর দিন দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলেছে সনি। বাবার মৃত্যুর পর মা শিতল পাটি বানিয়ে সংসার চালালেও মেয়েকে কখনো কোন কাজ করতে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত মায়ের শিতল পাটি বানানোর টাকায় জীবনে বড় সাফল্য আসে সনি নাথের। বিদ্যালয়টিতে ৭ জন এ প্লাস পেলেও একমাত্র গোল্ডেন এ প্লাসটি সনি নাথের দখলে। বড় হয়ে সনি ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু মেয়ের ইচ্ছাটা তার মেধার কাছে কোন ব্যাপার না হলেও দারিদ্রতা এই ইচ্ছেটা বাস্তবায়ন করতে দেবে কিনা তা নিয়ে মায়ের দু’চোখে চরম হতাশা কাজ করছে।

সরেজমিনে সনি নাথের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুর্গম সড়ক পার হয়ে টিন আর বেড়ার তৈরি ঘরটিতে ছাউনি ও বেড়ার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো অনায়াসে প্রবেশ করছে ঘরের ভিতর। নড়বড়ে ছোট তিন কক্ষের এই ঘরে সামনের লম্বা বারান্দায় মা শীতল পাটি বানিয়ে সারা দিনরাত কষ্ট করে চলেছেন। আর ভিতরের একটি কক্ষে পড়ার টেবিল না থাকলেও খাটের উপর বসে নিয়মিত অধ্যবসায় করে চলেছে শিক্ষার্থী সনি নাথ। আর এই অধ্যবসায়ের ফলস্বরূপ নিজের জীবনের পিইসি, জেএসসি ও এসএসসি তিন পরীক্ষাতেই সে এ প্লাস নিয়ে পাস করে। এছাড়াও শ্রেণির সবচেয়ে ভাল ফলাফলটাও তার দখলে থাকতো বলে তার শিক্ষকরা জানান।

কথা হয় সনি নাথের মা রুনু নাথের সাথে। কথা বলতে বলতে বার বার চোখ ভিজে যাচ্ছিল তার। একদিকে মেয়ের পাসের আনন্দ, অন্যদিকে মেয়ের স্বপ্ন পূরণের পথে দারিদ্র্যতার হতাশা। তিনি বলেন, আমার এক ছেলে এক মেয়ের মধ্যে সনি নাথ বড়। সনির বাবা সুভাষ নাথ মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর ভ্যান চালানোর টাকা দিয়ে চলতো তাদের সংসার। ২০১১ সালে তখন সনি চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। একদিন তার বাবার খুব অসুখ হয়। হাসপাতালে ভর্তি করানো হলেও বাঁচানো যায়নি তাকে আর। তখন থেকেই গৃহিণী কাজের পাশাপাশি শুরু করি সন্তানদের মানুষ করার কাজ। শখের বসে শেখা শীতল পাটি বানানোর কাজকে জীবনে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করি। রাতদিন পাটি বানাই। পাশাপাশি আশপাশের গ্রামের যে কোন গৃহাস্থালি কাজে যে যেখানে ডাকে সেখানেই গিয়ে শ্রম বিক্রি করে সন্তানদের পড়ালেখার খরচ চালিয়ে যাই। গত দীর্ঘ ৭ বছর সন্তানদের মানুষ করতে এভাবেই কষ্ট করে চলেছি।

তিনি বলেন, আমার মেয়ে বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আমাকে তার এই ইচ্ছের কথা বার বার বললেও আমি তাকে আশ্বস্ত করি। কিন্তু আমি জানি না তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাকে শেষ পর্যন্ত সহায়তা করতে পারবো কিনা। তিনি তার মেয়ের স্বপ্ন বাঁচাতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

শিক্ষার্থী সনি নাথ বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই দেখছি মা দিনরাত পরিশ্রম করছেন। কিন্তু কোনদিন আমাদের কোন কাজে পাঠায়নি এবং করতেও দেয়নি। শুধু পড়ালেখা করে যেতে তিনি সবসময় উৎসাহ যুগিয়েছেন। আমি পিইসি পরীক্ষায় উত্তর রাঙ্গুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এ প্লাস পাই। এ সময় বিদ্যালয়ের কাদের স্যার আমাকে সবদিক থেকে সহায়তা করতেন। এরপর উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে টানা তিন বছর খুব কষ্ট করে পড়ালেখা করি। সেখানে জেএসসি পরীক্ষাতেও এ প্লাস পাই। এরপর বিদ্যালয়ের স্যারদের পরামর্শে এবং নিজের ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছেকে বাস্তবায়ন করতে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়ালেখা করা শুরু করি। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়ের মঈনুল স্যার আমাকে ফ্রিতে গণিত ও বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলো এবং পার্শ্ববর্তী উত্তর রাঙ্গুনিয়া ডিগ্রী কলেজের মো. আলমগীর স্যার আমাকে ইংরেজী পড়াতেন। এভাবে সবার সহযোগিতায় আমি কঠোর অধ্যবসায় করে এসএসসিতেও গোল্ডেন এ প্লাস পাই। আমার জন্য দোয়া করবেন যেন ভবিষ্যতে একজন ডাক্তার হয়ে মায়ের দুঃখ ঘুচাতে পারি।

উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, সনি নাথ ২০১৮ সালে বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভাল ফলাফল করে বিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে অনেক ধনী ঘরের শিক্ষার্থী থাকলেও সনি ছিল সম্ভবত সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কিন্তু এই সনিই ছিল মেধার দিক দিয়ে সবার চেয়ে এগিয়ে। আমরা বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেছি। তার উচ্চ শিক্ষায় সকলের সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য কাজী মঈন বলেন, সনি নাথ আমাদের গ্রামের গর্ব। আমি অনেক আগে থেকেই তার পড়ালেখার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে চলেছি। তার মা বিধবা ভাতা পায়। সমাজের সকলে যদি এগিয়ে আসে তাহলে মেধাবী শিক্ষার্থী সনি নাথ অকালে ঝরে যাবে না। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, সনি নাথ দারিদ্র্যতার সাথে যুদ্ধ করে বড় সাফল্য পেয়েছে। তার জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পথে উপজেলা প্রশাসন থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।

x