মায়ের দুধ পান সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ

হাসিনা আকতার লিপি

শনিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৮ at ৪:৫৮ পূর্বাহ্ণ
15

সুস্থ শিশুই সুস্থসবল জাতি গঠনের প্রাথমিক ধাপ। ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশে ১ থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত মা ও শিশুর পুষ্টি উন্নয়নে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালিত হয়ে আসছে। বুকের দুধের উপকারিতা সম্পর্কে অপ্রতুল জ্ঞান ও অজ্ঞতার কারণে দেশে বহু শিশু মায়ের দুধ পান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এক তথ্যে জানা যায়, অন্তত ৯০০০টি গবেষণা পত্রের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্তন্যদানকারী মা প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতায় কম ভোগেন। স্তন্য দানকালে অক্সিটোসিন নামক একটি হরমোনের মাত্রা শরীরে বেড়ে যায় যেটি মানসিক রিল্যাক্সেশন (প্রশান্তি) আনয়ন করে। স্তন্যদানকারী মায়ের শরীরে এই হরমোনের মাত্রা ৫০% যেখানে অন্য মায়েদের মধ্যে এর মাত্রা থাকে মাত্র ৮%। অন্যদিকে স্তন্যদানকারী মায়ের স্তন ও জরায়ুর ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাও কম। সন্তান গ্রহণের ফলে শরীরে যে বাড়তি মেদ জমা হয়, স্তন্যদান করলে তা আবার কমে যায়। স্তন্যদান করানোর মাধ্যমে গর্ভধারণের পরে আবার শরীরের স্বাভাবিক আকারে ফিরে আসা সহজ হয়।

অজ্ঞতার কারণে শিশুকে মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত করায় দেশের শিশুর অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগব্যাধি ও শিশুর মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ। একটি শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বের ১৭০টি দেশের মতো এ বছরও বাংলাদেশে মায়ের দুধের উপকারী দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘মাতৃদুগ্ধ পান টেকসই করতে আসুন ঐক্যবদ্ধ হই’।

৩১ শতাংশ নবজাতকের মৃত্যু রোধ করা যায়, যদি মায়েরা জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে তাদের শিশুকে বুকের দুধ পান করান। শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য মায়ের দুধপান করানোর কোনো বিকল্প নেই এবং এর অপরিহার্য পুষ্টি শিশুর

রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ায়।

মায়ের দুধের উপকারিতা

মাতৃ দুগ্ধ শুধুমাত্র পুষ্টির উৎস নয়, শিশুর স্বাস্থ্যের পক্ষেও যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনই মায়ের শরীরের পক্ষেও সমান উপকারী। জন্মের প্রথম ৬ মাস শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের দুধই খাওয়ানো উচিত। তার কারণ, প্রসবের পর পর যে হলুদ রংযের দুধ আসে তাই শালদুধ। এই দুধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে এবং শিশুকে সংক্রমণ রোগ থেকে রক্ষা করে। এই শাল দুধ নবজাতকের জন্য খুবই প্রয়োজন। এই দুধ একটু ঘন, তাই অনেকে ফেলে দেয়। কোনোমতেই ফেলে না দিয়ে খাওয়াতে হবে। মায়ের দুধ শিশুকে পাকাশয় ও অন্ত্রের সমস্যা থেকে রক্ষা করে। এই দুধ তাড়াতাড়ি হজম হয় এবং এতে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হয় না। এ ছাড়াও এই দুধ শিশুর পাকাশয় ও অন্ত্রের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। মাতৃদুগ্ধ শিশুর নাক ও গলার ঝিল্লির উপর আস্তরণ তৈরি করে হাঁপানি ও কানের সংক্রমণ থেকেও শিশুকে রক্ষা করে।

গরুর দুধে অনেক শিশুর অ্যালার্জি হয়। তুলনায় মাতৃদুগ্ধ ১০০ শতাংশ নিরাপদ।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, যে শিশুরা জন্ম থেকে মাতৃদুগ্ধ খেয়ে থাকে তাদের ভবিষ্যতে মোটা হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। কারণ তারা খিদে অনুযায়ী খেতে শেখে। ফলে শুরু থেকেই তাদের অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম থাকে।

শৈশবে লিউকোমিয়া হওয়া থেকে মায়ের দুধ রক্ষা করে। বড় বয়সে ডায়াবেটিস টাইপ ১ এবং উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কাও কম থাকে। মাতৃ দুগ্ধে শিশুর বুদ্ধি বাড়ে। কারণ, প্রথমত শিশুর সঙ্গে মায়ের একটা বন্ধন তৈরি হয় এবং দ্বিতীয়ত মাতৃ দুগ্ধে এমন সব ফ্যাটি এসিড থাকে যা শিশুর মগজের বৃদ্ধি ঘটাতে সহায়তা করে। নবজাতকদের স্তন্যপান নতুন মায়েদের তাড়াতাড়ি ওজন কমাতে সাহায্য করে। গর্ভাবস্থার পরে বুকের দুধ খাওয়ালে স্তনে ও ডিম্বাশয়ে ক্যান্সারের আশঙ্কা কম থাকে। যত দিন খাওয়ানো যায়, তত সম্ভাবনা কমে। মায়ের দুধ খাওয়ানোর কোনও খরচ নেই। সর্বদাই বিশুদ্ধ। শিশুর জন্য উপযোগী ও নিরাপদ। তাছাড়া শিশুর সঙ্গে মায়ের মানসিক মিলন ঘটায় এবং মায়ের শারীরিক ছোঁয়াতে শিশু আরাম বোধ করে। বুকের দুধ খেলে ডায়রিয়া হয় না বললেই চলে। বরঞ্চ ডায়ারিয়া হলে অন্য দুধ বন্ধ করে দিতে হয়। কিন্তু মায়ের বুকের দুধ নবজাতকের জন্য খুবই প্রয়োজন।

x