‘মানুষের ভালোবাসায় চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন মহিউদ্দিন চৌধুরী’

চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে স্মারকগ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব

আজাদী প্রতিবেদন

শুক্রবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৪:০১ পূর্বাহ্ণ
207

এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে একজন সফল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। তিনি রাজনীতিকে অন্তরে ধারণ করেছিলেন। জনগণের কল্যাণেই রাজনীতি, এজন্য তিনি রাজনীতি করে আমৃত্যু এর সাথে ছিলেন। চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মানুষের স্বার্থের সাথে কখনো তিনি আপোষ করেন নি। এজন্য তিনি অন্যান্য রাজনীতিবিদদের থেকে ব্যতিক্রম। মৃত্যুর পর মানুষ স্মৃতির অন্তরালে চলে যান। কিন্তু কেউ কেউ তার কাজের মধ্য দিয়ে থেকে যান মানুষের মণিকোঠায়। বাঙালি যেমন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মনে রেখেছে তেমনি চট্টগ্রামবাসী তাদের প্রিয় মহিউদ্দিনকে আজীবন মনে রাখবে। তিনি কত বড় মাপের নেতা ছিলেন তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, ভবিষ্যতেও অনেক হবে। মানুষের ভালোবাসার মধ্য দিয়ে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। গতকাল বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু হলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘সাংবাদিকবান্ধব এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ’ এর প্রকাশনা উৎসবে বক্তারা এ কথা বলেন।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সভাপতি কলিম সরওয়ারের সভাপতিত্বে এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিন্টু চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। প্রধান আলোচক ছিলেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. অনুপম সেন। আলোচক ছিলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মহীবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, মহিউদ্দিন চৌধুরীর সহধর্মিণী ও মহানগর মহিলা লীগের সভানেত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন। স্বাগত বক্তব্য দেন, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশ।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন, স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা কমিটির আহ্বায়ক মোয়াজ্জেমুল হক। অন্যদের মধ্যে যুবলীগ মহানগর কমিটির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নাজিমুদ্দীন শ্যামল, রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, মৃত্যুর পর মানুষ স্মৃতির অন্তরালে চলে যান। কিন্তু কেউ কেউ তার কাজের মধ্য দিয়ে থেকে যান মানুষের মণিকোঠায়। বাঙালি যেমন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মনে রেখেছে, তেমনি চট্টগ্রামবাসী তাদের প্রিয় মহিউদ্দিনকে আজীবন মনে রাখবে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রামের এমন আন্দোলন-সংগ্রাম ছিল না যেখানে তিনি ছুটে যান নি। যেখানেই সংকট সেখানেই তিনি ছুটে গেছেন। এ কারণে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সম্মান করতেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর (মহিউদ্দিন) পুত্রকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক করে সম্মান করেছেন। নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে দলীয় মনোনয়নও দিয়েছেন মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্মৃতি ধরে রাখতে। মহিউদ্দিনপুত্র নওফেল তার কাজের মধ্য দিয়ে পিতার কাজকে ধরে রাখবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এগিয়ে চলা চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ভূমিকার কথা স্মরণ করে সাংবাদিকনেতা ইকবাল সোবহান বলেন, যখন দেশের অনেক প্রেস ক্লাবে বঙ্গবন্ধুর কোন ছবি ছিল না, তখন নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙিয়েছে, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, প্রগতিশীলতার পক্ষে সবসময়ই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজ কাজ করে গেছে। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সাবেক মেয়র মহিউদ্দিনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমরা অনেকের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে থাকি, কিন্তু কৃতজ্ঞতা স্বীকারে কার্পণ্য করে থাকি। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব তাঁকে নিয়ে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছে। এ গ্রন্থে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে নিয়ে বিভিন্ন সাংবাদিক তাদের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে লিখেছেন। এতে করে মহিউদ্দিনের বহুমুখী দিকটি উঠে এসেছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. অনুপম সেন বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী কত বড় মাপের নেতা ছিলেন তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, ভবিষ্যতেও অনেক হবে। ৭৫ এ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর মহিউদ্দিন চৌধুরী প্রতিবাদ করেছিলেন। তাকে দেশত্যাগ করতে হয়েছিল। পরবর্তীতে আবার ফিরে আসেন। যারা প্রতিবাদ করেছিলেন সেই গুটিকয়েক ব্যক্তির মধ্যে মহিউদ্দিন চৌধুরী একজন। ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ের পর মুসলিম হলে অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি করেছেন। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী ও সরল। রাগ করে গালাগাল দিলেও ভালোবাসতেন প্রকৃত অর্থে। মহিউদ্দিন চৌধুরীকে মনে রাখতে হবে। তিনি মানুষের জন্য ভালোবেসে কাজ করেছেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী নতুন রূপে আর্বিভূত হন সিটি মেয়র হওয়ার পর।
সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, তিনি রাজনীতিকে অন্তরে ধারণ করেছিলেন। জনগণের কল্যাণ সাধনই রাজনীতি। তিনি মানুষের কল্যাণের জন্যই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং আমৃত্যু এর সাথে ছিলেন। চট্টগ্রাম, চট্টগ্রামের স্বার্থের প্রশ্নে কখনো আপোষ করেননি। অন্য রাজনীতিবিদদের থেকে ব্যতিক্রম তিনি। রাজনীতিতে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এসে কেউ কেউ কম্প্রোমাইজ করে থাকেন, কিন্তু তিনি কখনো করেন নি।
ব্যারিস্টার মহীবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, আমার বাবা ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। তাঁর এ জীবনকে মূল্যায়ন করেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু কন্যা সবসময় সৎ-সাহসী রাজনীতিবিদদের মূল্যায়ন করেছেন। কলম সৈনিকদের প্রতি বাবার অপার ভালোবাসা ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন তারা যদি মুক্ত-স্বাধীন থাকেন এবং সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারলে সমাজ-রাষ্ট্রের ভালো হবে। তিনি শ্রমজীবী মানুষের জন্য আজীবন কাজ করেছেন। অনেক সময় অভিমান করে বলতাম- আপনার বিরুদ্ধে লেখে, আপনি তাদের ভালোবাসেন কেন? তিনি বলতেন, সাংবাদিকরা স্বাধীন তারা প্রশংসা যেমন করবে, সমালোচনাও করবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখব, এর মাধ্যমে সমাজের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যে লড়াই সে লড়াইয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পেলে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য কাজ করে যাব, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখবো।
হাসিনা মহিউদ্দিন বলেন, তিনি ছিলেন মাথা নত না করা একজন রাজনীতিবিদ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহিউদ্দিন চৌধুরীকে মূল্যায়ন করেছেন। মহিউদ্দিন চৌধুরীর রুষ্ট আচরণে কেউ কেউ ব্যথিত হয়েছেন। সেজন্য পারিবারিকভাবে ক্ষমা চাইছি। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সভাপতি কলিম সরওয়ার ক্লাব ভবন নির্মাণে মহিউদ্দিন চৌধুরীর অবদান স্মরণ করে বলেন, আমরা এ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে একজন সফল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মহিউদ্দিন চৌধুরীর বহুমুখী পর্যায়কে স্মরণ করেছি।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশ বলেন, এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে সাংবাদিকদের সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। অনেক সাংবাদিক তাঁর স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছেন। চট্টগ্রাম ও সারাদেশে যে সাংবাদিকরা তাঁর স্নেহধন্য আমিও তাদের একজন। অনুষ্ঠানে সাংবাদিকবান্ধব এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা উপ-পরিষদের আহ্বায়ক মোয়াজ্জেমুল হক বলেন, প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর শোকসভায় এই স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের প্রস্তাব করেছিলাম। আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হচ্ছে। ৫৬ জন সাংবাদিক বইতে মহিউদ্দিন চৌধুরী সম্পর্কে লিখেছেন। যার যার দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা থেকে তারা লিখেছেন।
অনুষ্ঠানে যুবলীগ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু বলেন, চট্টগ্রামের রাজনীতি স্মরণীয় পুরুষ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৬ পৃষ্ঠার স্মারক গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিন্টু চৌধুরী। বইটিতে ৫৬ জন সাংবাদিকের লেখা সংকলিত হয়েছে। স্মারক গ্রন্থের ভূমিকা রচনা করেছেন সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. অনুপম সেন। এতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর জীবনের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। এছাড়া এতে আছে আছে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বর্ণনা ও ছবি।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অন্যদেরর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি কাজী আবুল মনসুর, সহ-সভাপতি মনজুর কাদের মনজু, যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, অর্থ সম্পাদক দেবদুলাল ভৌমিক, সাংস্কৃতিক সম্পাদক শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, ক্রীড়া সম্পাদক নজরুল ইসলাম, লাইব্রেরি সম্পাদক রাশেদ মাহমুদ, সমাজসেবা ও আপ্যায়ণ সম্পাদক রোকসারুল ইসলাম, কার্যকরী সদস্য ম. শামসুল ইসলাম, হেলাল উদ্দিন চৌধুরী, শহীদ উল আলম।

x