মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতির পরিচায়ক

মঙ্গলবার , ৩১ জুলাই, ২০১৮ at ৬:৫০ পূর্বাহ্ণ
46

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অবিশ্বাস্য ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে পরিবর্তনগুলো ইতিবাচক। শুধু ইতিবাচকই না, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক মডেল। তাই প্রাসঙ্গিকভাবেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বৈপ্লবিক উন্নতিগুলো এখন সারা পৃথিবীর স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্য বিষয়ক নীতি নির্ধারক, স্বাস্থ্য বিষয়ক দাতা সংস্থাদের কাছে রীতিমতো অভাবনীয় বিষয়।

স্বাস্থ্য খাতের অন্য রকম অগ্রগতি বোঝা যায় মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিতে। দৈনিক আজাদীতে গত ২৯শে জুলাই প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্যে মানুষের গড় আয়ু এখন প্রায় ৭২ বছর যা ২০০৮ সালে ছিল ৬৯। ২০০০ সালে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৬৮ দশমিক ২৭ বছর। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৭১ দশমিক ৮ বছর। বর্তমান সরকারের পদক্ষেপে নানামুখী সফলতা এসেছে। বিশ্বের মানুষের গড় আয়ুর হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। আর সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে তৃতীয়।’

গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়ার তুলনামূলক চিত্রে দেখা গেছে ২০০০ সালে গড় আয়ু ছিল ৬৫ দশমিক ২৭ বছর, ২০০১ সালে ৬৫ দশমিক ৮২, ২০০২ সালে ৬৬ দশমিক ৩৪, ২০০৩ সালে ৬৬ দশমিক ৮১, ২০০৪ সালে ৬৭ দশমিক ২৮, ২০০৫ সালে ৬৭ দশমিক ৭৭, ২০০৬ সালে ৬৮ দশমিক ২৪, ২০০৭ সালে ৬৮ দশমিক ৬১, ২০০৮ সালে ৬৯ দশমিক ১২, ২০০৯ সালে ৬৯ দশমিক ৫৩, ২০১০ সালে ৬৯ দশমিক ৯৪, ২০১১ সালে ৭০ দশমিক ৩১, ২০১২ সালে ৭০ দশমিক ৬৭, ২০১৩ সালে ৭০ দশমিক ১, ২০১৪ সালে ৭০ দশমিক ৩৯ ও ২০১৫ সালে ৭১ দশমিক ৪ বছর।

এই যে এত এত সাফল্য, তা অর্জন কিন্তু খুব সহজ ছিল না। কারণ বাংলাদেশ কোনো স্বল্প সংখ্যক জনসংখ্যার ধনী দেশ নয়। বরং সম্পদের সীমাবদ্ধতাসহ ঘন বসতিপূর্ণ বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশ। জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীতে অষ্টম। সুতরাং এমন একটি দেশে এত বড় সাফল্য অর্জন কোনো বিচারেই সহজ সাধ্য ছিল না। অথচ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অনেকগুলো সূচকে তার প্রতিবেশীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশের সমান কিংবা কাছাকাছি পরিমাণ মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোর তুলনায়, স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন তুলছেন : রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জনসংখ্যার ভারে নুয়ে পড়া একটি স্বল্প উন্নত কিংবা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ কীভাবে এত সব মীরাকেল সম্পাদিত করল? তাই এখন বড় বড় জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী, একাডেমিক, অর্থনীতিবিদ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের কাছে বাংলাদেশ একটি সফলতম উদাহরণ।

বর্তমান স্বাস্থ্য সেবায় দক্ষ জনশক্তি, আন্তরিকতা এবং উন্নত মান নিশ্চিত থাকায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মত। মানুষ আজ বিভিন্ন কুসংস্কারমুক্ত হয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা সেবা গ্রহণে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। সঠিক প্রচারণা, পলিসি নির্ধারণ এবং জনগণের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা সেবা পৌছে দিয়ে বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতে এক যুগান্তকারী বিপ্লবের সূচনা করতে সক্ষম হয়েছে। জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি, বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, রক্ত পরিসঞ্চালন আইন, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন ইত্যাদি প্রণয়ন করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী এবং জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে।

আমরা জানি, এমনি এমনি বাড়ে না মানুষের আয়ু। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সামগ্রিক জীবনমানের প্রশ্ন। বহু আগে দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়েছে কলেরা, গুটিবসন্ত। ডায়রিয়ায় হাজারে হাজারে শিশু এখন আর ঢলে পড়ে না। দেশে এখন কাঁচা পায়খানা নেই বললেই চলে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার মতো সচেতনতা ও সামর্থ্য দুটোই বেড়েছে। সামগ্রিক জীবনমান বাড়ছে। এতগুলো সম্মিলিত সুসংবাদের মজবুত ভিত্তির ওপরই আয়ু বাড়ার সুসংবাদ দাঁড়িয়ে আছে।

তবে গড় আয়ু বাড়ছে মানে দেশে প্রবীণদের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই এবার প্রবীণদের সুরক্ষা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে যিনি নিজের মেধা কর্মক্ষমতা ও শ্রম সারাটি জীবন সংসার, সমাজ, দেশ ও জাতির জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন, তিনি বৃদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে সকলের কাছে যেন অবহেলা, অবজ্ঞা ও মূল্যহীন হয়ে না পড়েন।

এ জন্য বর্তমান বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা বাড়ানোর দরকার আছে। তা না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার যে টার্গেট আছে তা আমরা পূরণ করতে পারবো না। দরিদ্র এবং হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যবীমাও চালু করতে হবে।

x