মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি

বৃহস্পতিবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:২০ পূর্বাহ্ণ
49

আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। পৃথিবীর সকলের মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, সচেতনতার দিন। এটি ১৯৯২ সালে প্রথমবার পালন করা হয়েছিল। কিছু দেশে একে মানসিক রোগ সচেতনতা সপ্তাহের অংশ হিসাবে পালন করা হয়। মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়েও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ সালে দেওয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, স্বাস্থ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ মানসিক স্বাস্থ্য। শারীরিক ও মানসিক উভয়ভাবে নীরোগ থেকে জীবন উপভোগ করা ও সাধ্য অনুযায়ী ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে কিছু করতে পারার সক্ষমতাই মানসিক স্বাস্থ্য। কারো হয়তো মানসিক রোগ নেই। তার মানে এটা বলা যাবে না যে তার কোনো মানসিক সমস্যা নেই। তবে মানসিক স্বাস্থ্যহানি ও মানসিক রোগ এক বিষয় নয়; বরং এটি মানসিক রোগের একটি কারণ।
মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক আলম সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমাদের সমস্যা অনেক, কিন্তু এর মধ্যেও কত শতাংশ লোক চিকিৎসা পাচ্ছে সেটাও আমরা গবেষণা করে বের করেছি। বাংলাদেশে ৭৮ শতাংশ লোক মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা পাচ্ছে না। এই যে ৭৮ শতাংশ লোক চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না তাদের কাছে আমরা কিভাবে পৌঁছাব, এটি নিয়ে আমার কিছু পরামর্শ আছে।
আমাদের সমস্যা অনেক, কিন্তু এখন আমাদের আগে অগ্রাধিকার ঠিক করা দরকার। এ জন্য আমাদের কিছু স্বল্প মেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি লক্ষ্য ঠিক করা দরকার। স্বল্প মেয়াদি লক্ষ্যের মধ্যে প্রথমেই আমাদের লোকবল বাড়ানো দরকার। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকবলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আমাদের দুই ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ যা ডাক্তার, নার্স কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীদের দেওয়া হয় এবং দীর্ঘ প্রশিক্ষণ যা ৮৯ দিনব্যাপী চলে ডাক্তারদের। এর উদ্দেশ্য হলো জেলাপর্যায়ে যেহেতু আমাদের পর্যাপ্ত মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ নেই তাই আমরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের দিয়ে সে জায়গাটা পূরণ করব।
পরবর্তী সময়ে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের ঐ জায়গায় স্থানান্তর করা যেতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আমাদের জেলাপর্যায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। আমরা আসি ঢাকা মেডিক্যালে, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অথবা পাবনায়; কিন্তু জেলাপর্যায়ে সেই সুবিধাটা নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেছেন, জেলাপর্যায়ে ডাক্তারদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সাত দিন নয়, বরং তিন মাস প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রটোকল এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। জেলাপর্যায়ে মানসিক রোগের ওষুধের অপর্যাপ্ততা নিরসনে এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি নির্দেশনা দরকার। সরকারি-বেসরকারি মোট ১০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান থাকলেও আমার মনে হয় না ২০টির বেশি প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনা হয়। এমবিবিএস ডাক্তাররা যদি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু না পড়েন তাহলে তাঁরা এই বিষয়ে জানবেন কেমন করে? অথচ সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় ধরেই নেওয়া হয় যে তিনি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে জানেন। তাই সব প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে একটি ইউনিট খোলা যায় কি না এটা নিয়ে ভেবে দেখতে হবে।আনন্দে থাকার মধ্যে রয়েছে মানসিকভাবে সুস্থ থাকার উপকরণ। মনোবিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ ফারুক হোসেন বলছেন, মানুষ যখন ভালো থাকে, সুখে থাকে, আনন্দে থাকে, তখন সাধারণত প্রায়ই হাসে। আমাদের মনের যে আনন্দ আবেগটা আছে, সেটার একটা তাৎক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ হাসির মাধ্যমে হয়। সুতরাং যখন কাউকে প্রায়ই হাসতে দেখি, তখন বলা যায় যে, সে ভালো আছে। তিনি বলছেন, হাসির শারীরিক দিকও আছে। হাসলে আমাদের হৃদযন্ত্র, শ্বাসযন্ত্র, এগুলোর একপ্রকার ব্যায়াম হয়।
মানুষের মধ্যেই দিনে দিনে বড় হয়ে উঠছে মানসিক সমস্যা। কোনটা মানসিক রোগ আর কোনটা রোগ নয়, তা জানতে-বুঝতেও সমস্যায় পড়ে অনেকেই। মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসক কিংবা মনোবিদদের কাছে গেলেই পাগল হওয়া নয়; যা শুধুই সচেতনতার ব্যাপার মাত্র। তবে মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় দেশে জরুরি হয়ে পড়েছে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ভিত্তি গড়ে তোলা এবং সেই ব্যবস্থাপনা থাকবে শহর থেকে গ্রামে।

x