মানসম্মত স্কুল শিক্ষা আকাঙক্ষা ও বাস্তবতা

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ২ জুন, ২০১৮ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ
158

প্রাচীনকালে বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে জ্ঞান অন্বেষণের যে চেষ্টা তা থেকে কালের আবর্তে আধুনিক শিক্ষার প্রচলন হতে থাকে। মধ্যযুগে মোগল আমলে পাঠশালা কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা যা থেকে বিজ্ঞান ও মনন চর্চার ক্ষেত্র তৈরি হয়। কুঁড়ে ঘরে বা গাছতলার যে শিক্ষা তখন গড়ে উঠেছিল তা ছিল মনন চর্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সময়োপযোগি যাকে বাস্তবভিত্তিক লোকশিক্ষা হিসাবেও অবহিত করা হয়েছিল। মধ্যযুগের এই প্রাথমিক শিক্ষার ধরন ছিল মূলত পাঠশালা শিক্ষা + লোকশিক্ষা = সাধারণ শিক্ষা।

বস্তুত তখন গ্রামের আনাচে কানাচে এই ধরনের শিক্ষার প্রচলন ছিল। ১৮০৩ সালে ইংরেজ লেখক ওয়ার্ড তার গ্রন্থে লিখেছিলেন এভাবে, ‘বাংলার প্রায় সব ঘরেই লেখাপড়া ও অংক শেখানোর জন্য পাঠশালা ছিল।’ এভাবে কালে কালে শিক্ষা বিস্তার ও প্রয়োজন থেকে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠে।

১৯ শতকের শুরুতে প্রাথমিক শিক্ষা আন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলনের মূল উদ্যোক্তাই ছিলেন উইলিয়াম কেরী। ১৮০০ থেকে ১৮১৭ সালের মধ্যে শ্রীরামপুর মিশনের চারপাশেই জেগে উঠেছিল প্রায় ৪৫টি পাঠশালা। যেখানে পড়ালেখা করত প্রায় ২০০০ শিক্ষার্থী। যখন সমগ্র বাংলায় ইংরেজি শিক্ষা সকলের উপর চাপানোর চেষ্টা চলছিল ঠিক তখন বাংলার প্রতিটি ঘরে প্রাথমিক শিক্ষা আন্দোলন আরো তীব্র গতিতে যেতে থাকে যা একসময় নবরূপ লাভ করে। ১৮৪০ সালের ১৮ জানুয়ারি বাংলায় পাঠশালার কাজ শুরু হয় অনেকটা আন্দোলনের মনোভাব নিয়েই। এই আন্দোলন’র মূল কারণটাই ছিল মাতৃভাষাকে অগ্রাধিকার দেয়া। আর বাংলা চর্চার এই প্রতিষ্ঠান ও আন্দোলনটি ১৮৪৪ সালের ১০ অক্টোবর বঙ্গ বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার থেকে স্বীকৃতি লাভ করে।

এই অঞ্চলের মানুষের শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়নি। তার প্রমাণ মিলে ১৮৫৮ সালের জুন মাসে প্রকাশিত ক্যালকাটা রিভিউ থেকে। কারণ ৩ কোটি ৭০ লাখ লোকের শিক্ষার জন্য ব্যয় করতো মাত্র ৮ হাজার টাকা। এটা ছিল সেই দিনের একজন কালেক্টরের বার্ষিক বেতনের একতৃতীয়াংশ মাত্র। তবে ব্রিটিশ আমলে বাঙালির শিক্ষা বিষয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চলে। তারই ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশ সরকার ১৮৮২ সালে গঠন করে হান্টার কমিশন। ১৯৩৪ সালে গঠন করা হয় সাপ্রু কমিশন, ১৯৪৪ সালে গঠন করা হয় সার্জেন্ট কমিশন।

তবে দেশবাসীকে একটি সুন্দর শিক্ষাব্যবস্থা উপহার দেয়ার জন্য ১৮২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় জনশিক্ষা পরিষদ। পরিষদ দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়ার জন্য নানা শিক্ষা পদ্ধতি ও ধরন তুলে ধরেন। এর ফলে টোল ও মক্তব শিক্ষার প্রচলন হতে থাকে। যা এই দেশের মোল্লা ও পুরোহিতরা বিশেষভাবে সমর্থন জানায়। শুধু তারা সমর্থন জানায়নি বরং ইংরেজদের এই কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সহযোগিতাও করেছেন। কিন্তু ইংরেজদের এমন কৌশল বেশি দুর এগুতে পারেনি। সেকালে জাতীয় একটি শিক্ষানীতির প্রশ্নে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ অনেকে। তারা সেই দেশের মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য বিজ্ঞান, আধুনিকতা, গণিত ও রসায়ন শাস্ত্রের শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য সরকারকে চাপ দিতে থাকেন ।

এই সুযোগে সমাজের উচ্চবিত্ত লোকদের কাছে ইংরেজি শিক্ষার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। যার ধারাবাহিকতা এখনও লক্ষ্য করা যায়। এক ধরনের আধুনিক মানুষ বানানোর নামে এখনও চলছে সেই ধাচের ইংরেজি শিক্ষার বিষয়টি। আর এই সুযোগে মেকেলে প্রবর্তন করেছিলেন এক জঘন্য ধরনের শিক্ষানীতি যার নাম দিয়েছিলেন ‘Filteration Theory’ এর সাধারণ অর্থ ছিল-‘সমাজের উচ্চতরের লোকেরা ইংরেজির মাধ্যমে লব্ধ জ্ঞান তাদের মাতৃভাষার মারফত সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিবে।’ মেকেলে সেদিন আরো বলেছিলেন, ‘ইংরেজি শিক্ষার দ্বারা এমন এক শ্রেণির লোক সৃষ্টি করতে হবে, যারা রক্তে ও বর্ণে হবে ভারতীয়। কিন্তু রুচিতে, মতবাদে, নীতিতে এবং হাবভাবে হবে সম্পূর্ণ ইংরেজ।’

মেকেলের এই আশা শুধু তখন নয় এখনও চলছে এবং পূরণও হচ্ছে। এখনও এমন অনেক ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত লোকজন নিজেকে বাঙালি পরিচয় না দিতে পারলে বরং বাঁচে। এই অবস্থার উন্নতির জন্য সর্বাজ্ঞে প্রয়োজন শিক্ষার উন্নতি সাধন। আমাদের জাতীয় শিক্ষা ও শিক্ষানীতির এমন অবস্থা দেখে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন এভাবে, ‘পরের সব ভালমন্দকে ভাল বলিয়া মানিয়া লওয়ার, আত্বন, নিজের শক্তি ও জাতীয় সত্যকে নেহাৎ খর্ব করা হয়। নিজের শক্তি, স্বজাতির বিশেষত্ব হারানো মনুষ্যত্বের মস্ত অবমাননা। স্বদেশের মাঝেই বিশ্বকে পাইতে হবে। সীমার মাঝেই অসীমের সুর বাজাইতে হইবে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের দেশের মানুষের মাঝে প্রকৃতি ও তাদের সত্তা সর্ম্পকে বলতে গিয়ে বলেছেন এভাবে, ‘আমাদের পানিও আছে পিয়াসও আছে, দেখিয়া পৃথিবীর লোক হাসিতেছে এবং আমাদের চক্ষে অশ্রু আসিতেছে, কেবল আমরা পান করিতে পরিতেছি না।’

মানুষের নিজের ভেতরের চাহিদা থেকে শুরু হয় অধিক মাত্রায় জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রটি নিজের প্রয়োজনে মানুষ তৈরি করে নেয়। টোলমক্তব আপনা আপনি শেষ হয়ে যায় এক সময়। মানুষ স্কুল, কলেজ, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন বোধ করে। আজকাল আর এই বড় প্রতিষ্ঠান গুলোতে পড়ে মানুষ নিজের প্রয়োজনকে শেষ করতে পারছে না, তারা মনে করছে মানসম্মত শিক্ষা প্রয়োজন। আর মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণের মূল ক্ষেত্র হল মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেটা শুরু হবে প্রাইমারি শিক্ষা থেকেই। শিক্ষার নান্দনিকনৈতিকদার্শনিক বিষয়গুলো খুবই বড় এবং মৌলিক। এই মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করলে আমাকে অনেকেই সুস্থ মানুষ হিসাবে বিবেচনা করবেও না। কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই আলোচনা অনেক পরে হতে পারে এর আগেই চাই মানসম্মত শিক্ষা। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে মানস্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কুল, কলেজ তথা বিশ্ববিদ্যালয়।

আজকাল আমাদের প্রাইমারি, হাই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানসম্মত নয় এই দাবি উঠেছে। না, এই দাবি শতভাগ সত্য নয়। মানসম্মত শিক্ষা আমাদের দেশেও দেয়া হচ্ছে। তবে এই শিক্ষা গ্রহণকারীর সংখ্যা কত এই বিষয়টি আমাদের সামনে আনতে হবে। দুঃখের সাথে বলতে হয় আমাদের দেশের মধ্যেও কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদ পত্রের মূল্য সাধারণত অনেক বেশি। কারণ সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা নিজেরাই মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা করে আসছি। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি।

স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও একটি উদার, আধুনিক ও সময়োপযোগী শিক্ষানীতি আমরা করতে পারিনি। এটা ছিল জাতি হিসাবে আমাদের চরম ব্যর্থতা। অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার একটি কারন ছিল শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম। প্রশ্ন কেন তাহলে এতটি বছর আমরা পারলামনা স্বাধীন একটি শিক্ষানীতি করতে? পারিনি দেশ পরিচালনায় সঠিক নেতৃত্বের অভাবে। অর্থনীতির যেমন নিজস্ব নিয়মকানুন আছে সেই যেমন কারো ইচ্ছা অনুযায়ী চলে না তেমনি শিক্ষারও নিজস্ব কিছু নিয়মনীতি আছে, আছে স্বভাবধর্ম। এখানেই শাসক শ্রেণি বার বার ভুল করেছে। শিক্ষাকে তার নিয়ম অনুযায়ী চলতে দেয়নি বরং চাপিয়ে দিয়েছে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। এতদিন পরে আমাদের জেগে উঠার স্বপ্ন আমরা দেখছি। আমরা ঠেকে শিখতে বসেছি। মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দরকার বলে মনে করতে শুরু করেছি। শিক্ষা যেমন একদিনে ধ্বংস হয়ে যায়নি, তেমনি একে রাতারাতি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার ও উপায় নেই। তাহলে কি করতে হবেআমার ব্যক্তিগত বিবেচনা হল এমন

. সরকারের সুষ্ঠু শিক্ষানীতি ও বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছা

. শিক্ষকশিক্ষার্থীর সঠিক অনুপাত বিন্যাস

. শিক্ষকশিক্ষার্থীর শিক্ষা দান ও প্রদানে আগ্রহ

. শ্রেণিকক্ষ ও পাঠ্যপুস্তকের বাস্তব উন্নতি সাধন

. অবকাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিত করা ও তা নিরসনে ব্যবস্থা নেয়া

. যোগ্যদক্ষ লোকদের শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত করা

. শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা

. নিয়মিত পরিদর্শক বাহিনী দ্বারা শিক্ষাদান কার্যক্রম তদারকি করা।

অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সমাজকে যে পর্যায়ে সচেতন হওয়া জরুরি তা এখনও হয়নি। আর এই উন্নতির জন্য প্রয়োজন শিক্ষাকে ঘিরে পুরো জাতির উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ানো। শিক্ষার এই হতাশাজনক অবস্থা দেখে বিশ্বকবি রবি ঠাকুর মন্তব্য করেছিলেন এভাবে, ‘একজন দরিদ্র সমস্ত শীতকালে অল্প ভিক্ষা সঞ্চয় করিয়া যখন শীতবস্ত্র কিনিতে সক্ষম হইত তখন গ্রীষ্ম আসিয়া পড়িত, আবার সমস্ত গ্রীষ্মকাল চেষ্টা করিয়া যখন লঘুবস্ত্র লাভ করিত তখন অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি, দেবতা যখন তাহার দৈন্য দেখিয়া দয়ার্দ্র হইয়া বর দিতে চাহিলেন তখন সে কহিল, আমি আর কিছু চাহি না, আমার এই হেরফের ঘুচাইয়া দাও।’

শিক্ষাকে ঘিরে যে দুর্যোগ ও হেরফের চলছে তা থেকে মুক্তির একটি মাত্র পথ হল সকলে মিলে শিক্ষাকে আধুনিকায়নের জন্য এগিয়ে আসা। আমরা নোবেল বিজয়ী, মাতৃভাষার জন্য সংগ্রামের ইতিহাসে গর্বিত জাতি। আর গর্বিত জাতির অস্তিত্বের প্রয়োজনে শিক্ষার সংখ্যা ও গুণগতমান উন্নতি প্রয়োজন।

এটি সময় নেয়ারও বিষয় নয়। দরকার মনোজগতের পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনটাই সময়ের। এই পরিবর্তনটাই প্রয়োজনের। সকলের মধ্যে জাগ্রত হউক নতুন বিশ্বের সাথে সম্পর্ক রাখার প্রত্যয়। তাহলে কেবল এমন সুন্দও শিক্ষার দিকে আমরা এগিয়ে যাব।

x