মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করতে আইন বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে

অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী সনদ নেই

শনিবার , ১০ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ
44

দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে মূলত সাত বছরের সাময়িক অনুমতি নিয়ে। এ সময়ের মধ্যে স্থায়ী সনদ অর্জনের শর্ত পূরণ করতে না পারলে আবেদন ও তদন্তসাপেক্ষে সাময়িক অনুমতি পত্র আরো পাঁচ বছরের জন্য নবায়নের সুযোগ রয়েছে। ন্লবায়নসহ সাময়িক অনুমতি পত্র দিয়ে ১২ বছর পার করেছে এমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন ৫১। নিয়ম অনুযায়ী এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটিরই এখন শর্ত পূরণ সাপেক্ষে স্থায়ী সনদ লাভ করার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র হচ্ছে, এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী সনদ পেয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর ধারা ৬-এ বর্ণিত ১০টি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সাময়িক অনুমতি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসব শর্তের মধ্যে আছে অনধিক ২১ ও অন্যূন নয় সদস্যের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠন, পর্যাপ্ত সংখ্যক শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগার, ল্যাবরেটরি, সেমিনার কক্ষ, অফিস কক্ষ ও শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক কমন রুমসহ পর্যাপ্ত স্থান ও অবকাঠামো থাকা, ২৫ হাজার বর্গফুটের নিজস্ব বা ভাড়া বাড়ি, কমপক্ষে তিনটি অনুষদ ও ছয়টি বিভাগ থাকা, শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কিত একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রত্যেক বিভাগ, প্রোগ্রাম ও কোর্সের জন্য কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত সংখ্যক পূর্ণকালীন যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করা, নিবিড় পাঠক্রম ও কোর্স প্রণয়ন ও আসন সংখ্যার অনুমোদন, সংরক্ষিত তহবিল হিসেবে এলাকা ভেদে দেড় থেকে ৫ কোটি টাকা ব্যাংকে জমা রাখা এবং কোন ধরনের রাষ্ট্র বিরোধী ও জঙ্গি কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতা না করা। এসব শর্ত পূরণের ভিত্তিতে দেয়া সাময়িক অনুমতি পত্রের মেয়াদ সাত বছর। এ সময়ের মধ্যে আরো সাতটি শর্ত পূরণ করে স্থায়ী সনদের জন্য আবেদন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে আইনের ৯নং ধারায়। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার ক্ষেত্রে কমপক্ষে এক একর, অন্য এলাকার ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই একর নিষ্কণ্টক, অখণ্ড ও দায়মুক্ত জমি থাকা, নিজস্ব জমিতে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ, ৩ শতাংশ আসন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও ৩ শতাংশ আসন অনুন্নত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা এবং গবেষণার জন্য বাজেট রাখা ও ব্যয় করা পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
খবরে দেখা যাচ্ছে, সাত বছরের বেশি বয়সি ৫৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৪টি এখনও নিজস্ব ক্যাম্পাসে যাওয়ার শর্ত পুরোপুরি পূরণ করেনি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকার ছয়বার সময় দিলেও তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারও তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোন পদক্ষেপ নেয় নি। এই ৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬টি নির্ধারিত পরিমাণ জমিতে নির্মাণাধীন ক্যাম্পাসে আংশিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আর দুটি ক্যাম্পাসে গেছে, তবে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম জমিতে। ইউজিসির তালিকা অনুযায়ী, ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক ঠাক নিজস্ব ক্যাম্পাসে গেছে। তবে এগুলোর দুইটি আবার ঢাকায় আলাদা ক্যাম্পাস রেখেছে। এটা কিন্তু আইনে নেই। আইন মেনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে স্থায়ী সনদপ্রাপ্ত তিনটি। স্থায়ী সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত হলো, স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর। শর্ত পূরণ না করলে স্থায়ী সনদ না পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আর আইনি শর্ত পূরণ না করলে বন্ধ করে দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয় নি। আবার যেসব বিশ্ববিদ্যালয় ভাবছে ১৯৯২ সালের আইনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ২০১০ সালের আইন অনুযায়ী স্থায়ী সনদের জন্য আবেদন করবে না, তারা একটি ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে রয়েছে। তাদের অবশ্যই আইন মেনে আবেদন করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ছিল, সময় পেয়েও যারা নিজস্ব ক্যাম্পাসে যায় নি, তাদের ছাত্র ভর্তি বন্ধ করাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সেটা হয় নি। আইন না মানলেও দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আইন অনুযায়ী কোন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের শর্ত না মানলে সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ থাকার কথা, কিন্তু সেই শর্ত না মানা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্র ভর্তি হচ্ছে। নতুন নতুন বিভাগ অনুমোদনও পাচ্ছে। সমাবর্তনের অনুমোদনও পাচ্ছে। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ এবং সেগুলোকে নিয়ম-শৃঙ্খলায় আনতে ২০১০ সালে নতুন আইন করে সরকার। কিন্তু আইন প্রণয়ন করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আইন মানানোর ক্ষেত্রে কোন কার্যকর ভূমিকা নেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, অর্থ কমিটিসহ অন্যান্য কমিটির দায়িত্ব ও কার্যক্রম ট্রাস্টি বোর্ডের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রণ হয়। এছাড়া সমঝোতার মাধ্যমে ট্রাস্টি বোর্ড সদস্যদের নিজস্ব অন্যান্য ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবহার, ইউজিসিকে না জানিয়ে সাধারণ তহবিলের টাকা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ভুয়া কাগজপত্র ও স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ ও আত্মসাৎ, শিক্ষকদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে প্রভাব বিস্তার, কম যোগ্য ব্যক্তিকে বিভাগীয় প্রধান করাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ট্রাস্টি বোর্ডের কোন কোন সদস্য। এমনও বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যার মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা নিজেই, উপাচার্য সহধর্মিণী, পরিচালক নিজেদের আত্মীয়-স্বজন। পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে মুনাফা তৈরির হাতিয়ারেই পরিণত হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ বেসরকারি উচ্চ শিক্ষালয় জোড়াতালি দিয়েই চলছে। জোড়াতালি দিয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা হতে পারে না, সনদ বিতরণ করা যায় মাত্র। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা চাই একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো তদন্ত করা হোক। তবে শুধু তদন্ত করলেই হবে না, যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-কানুন মানছে না এবং শিক্ষার ন্যূনতম মান রক্ষা করতে পারছে না, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। উচ্চ শিক্ষার নামে উচ্চ মুনাফা করা ও সনদ বিক্রি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উচিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়ে সচেতন হওয়া; মানসম্পন্ন শিক্ষা দান না করে সনদ বিক্রিতে লিপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এড়িয়ে চলা। শুধু ‘স্থায়ী ক্যাম্পাস’-এর ব্যবস্থা করাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকে থাকা ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে চিহ্নিত না করে সত্যিকার অর্থে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ সকলকে এক যোগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

x