মানবাধিকার রক্ষায় সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে

সোমবার , ১০ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
73

বিশ্ব মানবাধিকার দিবস আজ। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। ১৯৫০ সালের এই দিনটিকে জাতিসংঘ বিশ্ব মানবাধিকার দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। সেই থেকে বিশ্বজুড়ে এ দিনটি পালিত হচ্ছে। বিশ্বের অন্য দেশের মতো যথাযোগ্য মর্যাদায় সারাদেশে এ দিবস পালিত হচ্ছে। আলোচনা সভা, শোভাযাত্রাসহ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
বিশ্বের ৩৮টি দেশ মানবাধিকার চূড়ান্তভাবে লঙ্ঘন করছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। এ তালিকায় মিয়ানমার, ভারত ও চীন রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশগুলোর নাম তালিকাভুক্ত করেছে সংস্থাটি। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বার্ষিক প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। এসব দেশ হত্যা, নির্যাতন ও নির্বিচারে গ্রেফতারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ নির্লজ্জ দেশগুলো চরমভাবে অধিকার কর্মীদের ওপর বলপ্রয়োগ করে। দেশগুলোকে দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। নতুন দমন-পীড়নের ঘটনা লিপিবদ্ধ করার ক্যাটাগরিতে রয়েছে ২৯টি দেশ। আর পুরনো ঘটনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকার ক্যাটাগরিতে রয়েছে ১৯ দেশ। দশটি দেশের নাম দুই ক্যাটাগরিতেই রয়েছে। জাতিসংঘ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে ২৯ দেশ মানবাধিকার কর্মীদের ওপর দমন-পীড়নে জড়িত হয়ে পড়েছে। চূড়ান্তভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় যেসব দেশে সেগুলো হলো- বাহরাইন, ক্যামেরুন, চীন, কলম্বিয়া, কিউবা, কঙ্গো, জিবুতি, মিসর, গুয়াতেমালা, গায়ানা, হন্ডুরাস, হাঙ্গেরি, ভারত, ইসরায়েল, কিরগিজস্তান, মালদ্বীপ, মালি, মরক্কো, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সৌদি আরব, দক্ষিণ সুদান, থাইল্যান্ড, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, তুরস্ক, তুর্কমেনিস্তান এবং ভেনিজুয়েলা। আমাদের আনন্দের বিষয় বাংলাদেশ সেই তালিকায় নেই।
বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশ মানবাধিকারের ক্ষেত্রে চমৎকার অগ্রগতি লাভ করেছে বলে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার পেশ করা প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের আগাম উত্থাপিত প্রশ্নমালায় গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিরোধীদলীয় সদস্যদের গ্রেপ্তার, মতপ্রকাশের অধিকার সংকোচন, ৫৭ ধারা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতা এবং বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের যেসব পরিসংখ্যান ও তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা একেবারেই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সর্বজনীন নিয়মিত পর্যালোচনা বা ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ, যা ইউপিআর নামে পরিচিত তার তৃতীয় সভায় উপস্থাপনের জন্য পেশ করা প্রতিবেদন ও নথিতে এই পরস্পরবিরোধী চিত্র উঠে এসেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম এবং ২০১৩ সালের এপ্রিলে দ্বিতীয় ইউপিআর অনুষ্ঠিত হয়। মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার এই পদ্ধতি শুরু হয় ২০০৪ সালে এবং জাতিসংঘের সব সদস্যরাষ্ট্রই এই পর্যালোচনার অধীন।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের মতো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তদন্তে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাজ্য জানতে চেয়েছে গুম বিষয়ে জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের কমিটির জিজ্ঞাসার কী জবাব দেওয়া হয়েছে। উভয় দেশই ধর্মীয়সহ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কথা জানতে চেয়েছে। সুইডেন, জার্মানি, পর্তুগাল, ব্রাজিল, বেলজিয়ামসহ আরও কয়েকটি দেশ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নারী অধিকার এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ-বিষয়ক আইন সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে বিভিন্ন তথ্য জানতে চেয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সব মানবাধিকার ও সুশাসনের নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। সর্বস্তরে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ প্রণয়ন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সমপ্রতি মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত বিপুল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে মানবাধিকার রক্ষায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মানবতার এ অনন্য নিদর্শন স্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধি প্রদান করা হয়েছে। দেশের সব নাগরিকের বিশেষ করে শিশু ও নারীর মানবাধিকার রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।

x