মানবপ্রেম আর প্রকৃতিপ্রেমের মিথস্ক্রিয়ায় প্রাচ্য হয়ে ওঠেছে এক অনন্য প্রযোজনা

জানে আলম টিটু

বৃহস্পতিবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:২৮ পূর্বাহ্ণ
12

বাঙলা নাটকের সংস্কারক শেকড় সন্ধানী নাট্যকার সেলিম আল দীনের পাঁচালী নাটক ‘প্রাচ্য’-এর রিজোয়ান রাজনকৃত মূকনাটক মঞ্চায়ন হয় গত ১ সেপ্টেম্বর ২০১৯-এ চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে। উল্লেখ্য প্যান্টোমাইম মুভমেন্টের প্রযোজনা প্রাচ্য ১মবার মঞ্চায়ন হয়েছিল ২০০৯ সালে জাতীয় নাট্যশালার মূলমঞ্চে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ৬০তম জয়ন্তিতে। এবার দশবছর পর নাট্যাচার্যের ৭০তম জয়ন্তিতে মঞ্চায়ন হল। এই আয়োজনে অতিথি হয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. ইস্রাফিল আহমেদ রঙ্গন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক শাকিলা তাসমিন। অতিথিদ্বয়কে উত্তরীয় দিয়ে বরণ করে নেন প্যান্টোমাইম মুভমেন্টের সাধারণ সম্পাদক সোলেমান মেহেদী। দলপ্রধান রিজোয়ান রাজনের সঞ্চালনায় শুভেচ্ছা বক্তব্যের পরপরই শুরু হয় পাঁচালী নাটক প্রাচ্যের মৌন কথকতা।
নাট্য ঘটনাটি বহুল প্রচলিত বেহুলা-লক্ষিন্দর কাহিনীর বিপরীত চিত্র। লাঠিয়াল সয়ফরচান কাজলাকান্দা গ্রামের নোলককে বিয়ে করে নিজ গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। যাত্রা পথের কিছু ঘটনা এই নাটকের পরিণতি নির্ধারণ করে দেয়। নাটক এগিয়ে যায় ট্রাজেডির দিকে। বাসর ঘরে নোলক সর্প দংশনে নীল হয়ে ওঠে। সাপের খোঁজে সয়ফরচান স্বর্গমত্য ওলটপালট করতে থাকে এবং অবশেষে সাপের সন্ধান পেলেও সাপকে সে মারতে পারে না। নাটকের প্রথম দৃশ্যে সয়ফরচানের বসত বাড়ি, তার দাদী ও পড়শীদের দেখা যায়। এই দৃশ্যে গ্রাম্য মাতব্বর জিতু পুরানো লেনদেনের হিসাব দেখিয়ে সয়ফরচানের হালের বলদ নিয়ে যায়। এভাবে নাটকীয়তার মধ্যে এগিয়ে যেতে থাকে প্রাচ্যের পাঁচালী। সয়ফর আর নোলকের পরিচয় হয় এক গ্রাম্য যাত্রানুষ্ঠানে। পরিচয় থেকে পরিণয় অতঃপর অমোঘ নিয়তি মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে নাটকের দ্বিতীয় পর্যায়ের আরম্ভ। এখানে ট্রাজেডির নায়ক ও সাপের মধ্যেকার টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। সাপকে মারতে না পারার ব্যর্থতা আর সয়ফরের বিভ্রম জিতু মাতব্বর ও নোলকের প্রতিমূর্তি এক অদৃশ্য শৃঙ্খলের কারণে অপরাজেয় থেকে যায় আর দারিদ্রের দুষ্টচক্রে জীবনের নিয়তি বাধা পড়ে।
মূকনাটকটিতে অভিনয় করেছেন মোট সতের জন। দলীয় সূত্রে জানা যায় এই প্রযোজনার আগে মূকাভিনয় কর্মশালার মাধ্যমে তাদের দক্ষ হয়ে ওঠার গল্প। প্রযোজনাটিতে কাজ করেছেন স্কুল পর্যায়ের সাত বছর বয়সের শিল্পী থেকে কলেজ শিক্ষক ও কর্পোরেট পেশাজীবি পর্যন্ত।
চরিত্রায়ন প্রসঙ্গে আসা যাক। মূকনাটকে ওঝা চরিত্রটিতে রূপদানকারী শিল্পীর বিশেষ ভঙ্গিমা এবং তার শারীরিক প্রকাশ ওঝা চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছে। এই চরিত্রের শিল্পী আরিফুর রহমান আবীর দর্শকের মনোযোগ কেড়েছেন। পাগল চরিত্রে রূপদানকারী তরুণ বিশ্বাসের স্বত:স্ফূর্ত অভিনয় দর্শকের হাসির খোরাক যোগালেও অভিনয়ে তিনি ছিলেন সিরিয়াস। চরিত্রটি নির্দেশক রিলিফ ক্যারেক্টার হিসাবে ব্যবহার করেছেন। মূকনাটকে নোলকের বাবা-মা চরিত্রের মেজবাহ চৌধুরী ও প্রকৃতি সাহা’র চরিত্রানুযায়ীই অভিনয় দর্শক হৃদয়ে আচড় দিয়ে গেছে। যাত্রানুষ্ঠানে কবিয়াল চরিত্রেও এ দুজনের নৃত্যগীত প্রশংসার দাবিদার। মাতব্বর রূপী বাবলু দাশ ও ছেলের চরিত্রের সাকিরুল হক মারূফ মেধাবী অভিনয় উপহার দিয়েছেন। সয়ফরের দাদী চরিত্রের ইশরাত জাহান চরিত্রের দাবি মেটালেও মুখজ অভিনয়ে আরো সচেষ্ট হওয়া জরুরি ছিল। এই নাটকে একাধিক চরিত্রে রূপদানকারী জোবায়েদ হাসান সাবলীল ও পরিপূর্ণ অভিনয় উপহার দিয়েছেন। মূকনাটকের নায়ক সয়ফরচান পরিচ্ছন্ন অভিনয় করেছেন। মূকাভিনয়ের দক্ষতা স্পষ্ট তার। চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে যথাসাধ্য পরিশ্রম করেছেন, কখনো সার্থক হয়েছেন বটে কিন্তু চরিত্রের গাম্ভীর্যতা কখনো কখনো ম্লান হয়েছে। এই চরিত্রের শিল্পী শহিদুল বশর মুরাদকে আরো পথ পাড়ি দেবার প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই। যে চরিত্রটিকে কেন্দ্র করে নাট্য কাহিনী এগিয়েছে সে চরিত্রের রূপদানকারী শিল্পী হলেন তৃষ্ণা চৌধুরী। তাঁর অভিনয়ে দক্ষতা রয়েছে, নির্বাকতা প্রকাশেও সাবলীল। তবে প্রপস ব্যবহারে সচেতনতা বাঞ্চনীয়। এছাড়া নাজিফা তাবাস্‌সুম, রোদেলা মাহবুব, হৃদিতা চক্রবর্তীর প্রাণবন্ত অভিনয় নাট্যকাহিনীকে গতিশীল করেছে। অন্যান্যদের মধ্যে রিদোয়ানুল হক নক্বিব ও রাইদাদ অর্নব চরিত্রের দাবি মিটিয়েছেন। তবে নাহিদ, সোহেল ও সিফাত উল্লাহ কায়েস জড়তা কাটিয়ে ওঠতে পারেননি। তাদের নিয়মিত অনুশীলন ও অভিনয় দক্ষতা বাড়াতে হবে।
মূকনাটকটিতে ছোট-বড় নয়টি বক্স, বাঁশ ও কাপড়ের ব্যবহার ছিল উল্লেখ করার মত। নানা রঙের বঙগুলো নাটকীয় মুহূর্ত তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। পাত্র-পাত্রীর পরণে ছিল ধুতি পায়জামা, ফতুয়া ও গামছা। পোশাক পরিকল্পনায় প্রাচ্যদেশীয় ভাবনা ও ট্রাজেডিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পোষাক পরিকল্পনায় তামিমা সুলতানার সুচিন্তিত পরিকলল্পনা প্রযোজনাটিকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে নিঃসন্দেহে। দুটি দৃশ্যের কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। এক. নৌকা করে নদী পার হওয়া। দুই. বাসর ঘরে স্বামী-স্ত্রীর একান্ত মুহূর্ত। দৃশ্য দুটির শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি নান্দনিকতার উদাহরণ হতে পারে। এছাড়া যাত্রাপালার দৃশ্যটিও বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। মূকনাটকের পাত্র-পাত্রীদের দর্শক অভিমুখী বসিয়ে তাদের উল্টোদিকে অর্থাৎ পেছন অবস্থানে ছায়াচিত্রের মাধ্যমে যাত্রার অনুষ্ঠান আয়োজন ত্রিমাত্রিক দৃশ্য তৈরি করেছে।
মূকনাটকে আবহ সঙ্গীতের বিশেষ ভূমিকা আছে। নাট্যকাহিনীকে গতিশীল, নাটকীয়, গতিহীন, নিস্তব্ধতা ইত্যাদি প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলা নাটকের খ্যাতিমান অভিনেত্রী ও সংগীতজ্ঞ শিমুল ইউসুফ এবং রাজ ঘোষ যৌথভাবে আবহ সঙ্গীত পরিচালনা করেন। নাটকীয় পরিবেশ সৃষ্টিতে শিমুল ইউসুফ এই প্রযোজনাতে কখনো কখনো কণ্ঠ সঙ্গীতও ব্যবহার করেছেন। আবহ সঙ্গীতে ফোক ও পাশ্চাত্য উভয় ধরনের সঙ্গীতের ব্যবহার হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে দেশীয় ধারার সঙ্গীতের ব্যবহার নাট্য কাহিনীকে আরো ঋদ্ধ করত নিঃসন্দেহে। এছাড়া আবহ প্রক্ষেপণেও যথেষ্ট সচেতনতা অবলম্বন দরকার। আলোক পরিকল্পনা মুগ্ধতা ছড়িয়েছে দর্শকদের। নাটকীয়তা সৃষ্টিতে আলোর প্রয়োজনীয় ব্যবহার প্রশংসাযোগ্য। দিনরাত্রির ব্যবধান, সময়ের পার্থক্যকে খুব স্বাভাবিকভাবেই আলোর সাহায্যে তুলে ধরা হয়েছে। আলোক পরিকল্পনায় সাখাওয়াত শিবলীর অভিজ্ঞতা দীর্ঘ দিনের। তবে আলো ব্যবহারে আরো কুশলী হতে হবে এবং সমগ্র মঞ্চকে আলোর আওতায় আনতে হবে। এবার নির্দেশনার ভাল মন্দ আলাপ করি। সংলাপ ও বর্ণনা নির্ভর দীর্ঘ এই নাট্যকে নির্বাকে রূপান্ততি করার কৃতিত্বটা নির্দেশকের একান্ত। অনেকগুলো চরিত্রের সমাবেশ এক সাথে মঞ্চে হওয়ায় কখনো কখনো দৃশ্যকাব্যের দর্শনে বিঘ্নিত হয়েছে। মঞ্চ পরিকল্পনা দৃষ্টিনন্দন হলেও দৃশ্য পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল প্রায়সই। তবে নির্দেশক রিজোয়ান রাজন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দীর্ঘ এই প্রযোজনাটিকে টানটান উত্তেজনায় দর্শকের নিরবচ্ছিন্ন মনোসংযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ ব্যাপারে রিজোয়ান রাজন বলেন, মূকনাটকটিকে আরো সংবেদনশীল ও মহৎভাবে উপস্থাপন জরুরি। এই নাটকের যে দর্শন তা হলো প্রকৃতির মাঝে বিলীন হয়ে যাওয়া। আমি আগামীতে সেই প্রচেষ্টা আরো অব্যাহত রাখবো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ছাত্র আশরাফ মাসুদ এর কাছে এই মূকনাটকের চরিত্রায়ন বিশেষ দৃষ্টি কেড়েছে। প্রতিটি চরিত্রকে আলাদাভাবে চিনে নিতে তার একদমই অসুবিধা হয়নি বলে জানান। অনেক দর্শকের অভিমত ছিল এই ধরনের প্রযোজনার মঞ্চায়ন যেন অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রথিতযশা নাট্যকারদের নাটকের মূকপ্রযোজনা মঞ্চায়নে যেন অন্যান্য নাট্যদলগুলিও এগিয়ে আসে। নাটক শেষে বিপুল সংখ্যাক দর্শক করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করে প্রযোজনার কুশীলবদের। সেই সাথে নীরবতা ভেঙে মূখর হয়ে ওঠে সমস্ত আয়োজন।

x