মাননীয় অর্থমন্ত্রী প্লিজ…

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১৬ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
27

জোকো উইদোদো ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট। বয়স ৫৭। আমাদের মতো ভেজাল জন্মদিন ওখানেও আছে কিনা জানিনা! যদি থাকে, তাহলে কয়েক বছর এদিক ওদিকও হতে পারে। এ’ ব্যাপারে কোন ওয়ারেন্টি গ্যারান্টি দেয়ার ক্ষমতা আপাতত নেই। পৃথিবীতে সম্ভবত ভেনিজুয়েলার পর ইন্দোনেশিয়ার টাকার মান সবচে’ কম। হাজারের বেশি রূপি খরচ হয় এক কাপ গরম চায়ের আমেজ নিতে। অবশ্য এখন প্লাষ্টিক-ইলেক্ট্রনিক মানির যুগ। টাকার বোঝার বদলে ছোট্ট চৌকোনা কার্ডে সব মুস্কিল শেষ। আবার মাদুরোর ভেনিজুয়েলায় হাজার হাজার দশ- বিশ রুপির নোট এক দুই মার্কিন ডলারে কিনে চমৎকার চারু ও কারুশিল্পজাত পন্যের নয়া ব্যাবসাও শুরু হয়েছে। তো, ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় সমপ্রতি এশীয় দেশগুলোর প্রধান ক্রীড়া আসর এশিয়াড অনুষ্ঠিত হয়েছে। এশিয়ার প্রায় সব দেশ বর্ণাঢ্য এই আসরে অংশ নেয়। জাকার্তার প্রধান স্টেডিয়ামে আসরের উদ্বোধনী আয়োজনে ঘটে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ! যার নায়ক দেশটির প্রেসিডেন্ট উইদোদো। প্রেসিডেন্ট উইদোদো আসর উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রটোকল নিয়ে যোগ দেয়ার সময় মাঝপথে নিরাপত্তা বলয় ভেঙে প্রেসিডেন্ট গাড়ি থেকে নেমে পড়েন। নিরাপত্তা বহরকে চমকে দিয়ে তিনি এক রক্ষীর মোটর বাইকে চেপে বসেন। তার হেলমেট চেয়ে নিয়ে মাথায় চাপিয়ে দুরন্ত গতিতে বাইক হাকিয়ে উড়াল দেন। সামনেই সড়কে উঁচু পাটাতন। পাটাতনে ঝড়ো গতিতে উঠে শূন্যে লাফ দেন বাইকসহ। অসাধারণ এক মোটরবাইক ষ্ট্যান্ট! নিরাপদেই উড়ন্ত বাইক নিয়ে তিনি সড়কে নামেন। ততক্ষণে নিরাপত্তা মোটরবহর প্রেসিডেন্টকে হারিয়ে দিশাহারা! হেলমেটে মুখ ঢাকা থাকায় রাজপথে কেউ চিনছেওনা। অভূতপূর্ব দক্ষতায় তিনি ব্যস্ত ট্রাফিকে এঁকেবেকে বাইক চালিয়ে পৌঁছে যান স্টেডিয়ামের প্রথম নিরাপত্তা বলয়ের দায়িত্বে থাকা ইউনিফর্মধারী গার্লস গাইড, স্কাউটদের সামনে। থামার সংকেত দিলে তিনি বাইক থামিয়ে হেলমেট খুলে ফেলেন! দেখেতো বাচ্চাদের বিস্ময়ে ভিড়মি খাওয়ার যোগাড়! বহু বিদেশী রাষ্ট্রনায়ক এবং প্রতিনিধি পরে প্রেসিডেন্টের রাইডের ভিডিও ক্লিপ দেখে অভিভূত। ভিডিও ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। ত্রিশ হাজারের বেশি শেয়ারসহ দেখেছেন দশ কোটির বেশি মানুষ। সম্ভবত প্রেসিডেন্টের বাইক ষ্ট্যান্ট পূর্বেই সাজানো হয়েছে। না হলে এত নিখুঁত দৃশ্যায়ন কীভাবে সম্ভব! ভাইরাল ক্লিপটি আগ্রহীরা চাইলে উপভোগ করতে পারেন।
আসলে দেশ বা সরকার পরিচালনায় অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা ও সাহস দরকার। বর্তমান রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্ভবত শারীরিক দক্ষতায় সবার শীর্ষে আছেন। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টও যে কম যান না। মোদিকেও রাখা যায় তালিকায়। পুতিন, মোদি দু’জন মধ্য ষাটে, তুলনায় উইদোদো তরুণ! আসলে আমাদের অর্থমন্ত্রীর একটি বক্তব্য পড়ে অহেতুক দীর্ঘ অরাজনৈতিক বক্তব্য টানতে হলো। দেশ এখন পুরোপুরি নয়া উত্তেজনায় ফুটছে। ড,কামাল হোসেনের নেতৃত্বে তৃতীয় ধারার নতুন একটি জোটের কাঠামো দৃশ্যমান। বিএনপি নীতিগতভাবে এই জেটের সব দাবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে একসাথে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নির্বাচনের দিন ক্ষণ এগিয়ে আসার সাথে সাথে প্রতিদিনই রাজনীতির রূপ পাল্টাবে। মেরুকরণেও যোগ হবে নয়া নয়া চমক। লক্ষ্য নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসা। দেখেশুনে মনে হয়,সরকারি দল এখনো ক্ষমতার খোয়াবীতে! মানে সামনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে আবারো ক্ষমতায় আসবে, এটা নিশ্চিত! দশ বছর ক্ষমতায় থেকে দলটির নেতা-কর্মীদের আচরণ, বক্তব্য, বডি ল্যঙুয়েজে এটা পরিষ্কার, তারা আবার ক্ষমতায় আসবে! কোত্থেকে এই আত্মবিশ্বাসের জ্বালানির যোগান আসছে, তা অজানা। এটা সত্যি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত দশ বছরে আওয়ামী লীগ উন্নয়নের মহাসড়কে তুলে এনেছে, দেশকে। মানব উন্নয়নের পাশাপাশি সেবা ও ভোগ্য খাতের নানা সেক্টরে অবিশ্বাস্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির সূচকের পাশাপাশি আর্থিক খাতের লুটপাট, সরকারি দলের কিছু নেতা-কর্মীর উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, দখলবাজি, ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর অন্তঃকোন্দল ও ব্যক্তিস্বার্থের সংঘাত মেধাবী তরুণ প্রজন্মের কাছে নেতিবাচক ধারণা তুলে ধরেছে। ব্যাক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধু কন্যা, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বচ্ছতা, সততা ও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও তাঁর বেশিরভাগ সহযোগী এবং নেতাদের কার্যকলাপ নিয়ে গুন্‌জন প্রচুর। এই গুন্‌জনের পক্ষে যুক্তিও আছে। অনেক এম পি, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী নেতার দুর্নীতি- অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় ধারাবাহিক প্রতিবেদনও ছাপা হচ্ছে। কিন্তু অভিযোগের তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নজির খুবই নগন্য। যা দলের ভোটব্যাঙ্কের জন্য কোন সুখবর নয়। সবচে’ খারাপ খবর হচ্ছে, দেশে ধনী- দরিদ্রের অস্বাভাবিক বৈষম্য। কোটিপতির অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও দেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী ১০% অর্থাৎ এক কোটি ষাট লাখ মানুষের আয় কমছে। এদের মাথাপিছু আয় বার্ষিক ১০০ ডলারের নিচে। বিপুল জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় তুলে আনা না গেলে সমাজিক শৃংখলা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশ বর্তমান সরকারের আমলে ইর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করলেও দেশের ভিআইপি বা ধনীদের দেশী চিকিৎসা সেবায় আস্থা নেই। আমাদের রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, এম পি, ভিআইপিরা বিদেশী চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন নিয়মিত। তা মিডিয়ায়ও প্রচার করা হয় সাড়ম্বরে! এতে সাধারণ মানুষ দেশী চিকিৎসার উপর আগ্রহ হারাচ্ছে। যাদের ন্যূনতম আর্থিক সঙ্গতি আছে বা কঠিন অসুখে সামর্থ্য না থাকলেও ধারকর্জ বা জমিজমা বিক্রি করে বিদেশে চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ভারত, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে দেশীয় চিকিৎসা বা চিকিৎসকরাও সরকারি কর্তাদের সেবা দেয়ার চাপ না থাকায় সেবার বদলে টাকা শিকারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। এতে একদিকে পেশাগত মান নামছে, অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশের মতো চিকিৎসা সেবা অবকাঠামো গড়ে উঠছেনা। এটা হচ্ছে, উন্নয়নের ভয়াবহ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া!
এদিকে ব্যাঙ্কিং খাত গুটি কয় মাফিয়া কর্পোরেটের কব্জায় চলে গেছে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আটকে রেখেছে। সরকার বা অর্থ মন্ত্রণালয় এদের বছরের পর বছর ছাড় দিয়ে যাচ্ছে। ফলাফল, একের পর এক সরকারি ও বেসরকারি ব্যাঙ্কিং খাত রুগ্ন হয়ে পড়েছে। অতিকায় মাফিয়া খেলাপিরা নিজেরাই আবার নামে-বেনামে একাধিক ব্যাঙ্কের মালিক! দেশের সবচে’ স্পর্শকাতর ব্যাঙ্কিং খাতে এক লাখ একত্রিশ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ থাকার পর অর্থমন্ত্রী ব্যবস্থা না নিয়ে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা শিশুতোষ এবং হাস্যকর! তিনি ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি) প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকশেষে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ঋণখেলাপিরা নির্লজ্জ! প্রভাবশালী বলে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও কঠিন! নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, কিছুদিন আগে একজন খেলাপিকে প্রশ্ন করি, আপনি ঋণ পরিশোধ করছেন না কেন? ওনার জবাব,ঋণ নিতে অনেক জুতো ক্ষয় হয়েছে, তাই তিনি দিবেননা!’ বুঝুন, এবার কারা আমাদের ব্যাঙ্কগুলো লুটছে! আর অর্থমন্ত্রী কিনা, ব্যার্থতা ঢাকতে করছেন মস্করা! এর দায় কী আগামী নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনার দলকে শোধ করতে হবে না? সময় নেই। তবুও নির্লজ্জ মাফিয়া ঋণ খেলাপির দু’ একজনের বিরুদ্ধে অন্তত কঠোরতম পদক্ষেপ নিলে জননেত্রী শেখ হাসিনার জন সমর্থন সুনামির তোড়ে বেড়ে যাবেই।

x