মাধ্যমিক স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ থাকলে বিজ্ঞানাগার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হোক

রবিবার , ৫ আগস্ট, ২০১৮ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ
35

দেশের ২৯ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার নেই। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলোর পাঠদান করা হলেও হাতে কলমে শেখানোর জন্য স্থাপন করা হয় নি কোন বিজ্ঞানাগার। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য বলছে, দেশের মোট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২৯ শতাংশেই এখনো কোন বিজ্ঞানাগার স্থাপন করা হয় নি। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।

খবরে বলা হয়, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞানদুটোই সমান অপরিহার্য। শ্রেণিকক্ষে তত্ত্বীয় পাঠদান করা গেলেও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের জন্য বিজ্ঞানাগার থাকাটা আবশ্যক। সে হিসেবে বলা যায়, শুধু বিজ্ঞানাগারের অভাবে বিজ্ঞান শিক্ষায় ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব থেকে যাচ্ছে দেশের ২৯ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। ব্যানবেইসের ২০১৭ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে (নবম ও দশম) বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করছেন এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯ লাখ ৮১ হাজারেরও বেশি। কিন্তু বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার না থাকায় এর বড় একটি অংশই বিজ্ঞান বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, দেশের প্রায় একতৃতীয়াংশ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার না থাকার চিত্রটি হতাশাজনক। অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে না বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলেমেয়েরা বিজ্ঞান বিষয়ে সামান্য ধারণা লাভ করে থাকে। মূলত বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরি হয় মাধ্যমিক ধাপে গিয়ে। এ ধাপটিতে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে বিজ্ঞান শিক্ষায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষার অভাব ও পর্যাপ্ত ভৌত কাঠামো না থাকা। বিজ্ঞান শিক্ষার দুরবস্থার চিত্র ওঠে এসেছে সেভ দ্য চিলড্রেনের এক গবেষণায়। বেসরকারি এ উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত ‘চাইল্ড পার্লামেন্ট’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার না থাকা এবং ব্যবহারিক ক্লাস না হওয়াই শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞানের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জরিপের আওতাধীন মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছে, তাদের কোন ব্যবহারিক ক্লাস হয় না। এছাড়া ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছে, বিজ্ঞানাগারের জন্য তাদের অতিরিক্ত ফি পরিশোধ করতে হয়।

আমরা দেখি, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় সব বিদ্যালয়েই বিজ্ঞান বিভাগ চালু রয়েছে। শহরের বিদ্যালয়গুলোর কাজ চালিয়ে নেয়ার মতো বিজ্ঞানাগার থাকলেও গ্রামাঞ্চলে বিজ্ঞান শিক্ষা পরিস্থিতি মোটেই সন্তোষজনক নয়। না হবারই কথা। যেখানে ‘ব্যানবেইস’ ও ‘সেভ দি চিলড্রেনে’র তথ্যে বলা হচ্ছে দেশের এক তৃতীয়াংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থাকলেও বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য অপরিহার্য বিজ্ঞানাগার নেই সেখানে বিজ্ঞান শিক্ষা পরিস্থিতি কখনো সন্তোষজনক থাকতে পারে না। বিজ্ঞানাগার না থাকাটা শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান বিকাশের অন্তরায়। শিক্ষাবিদেরা বলে থাকেন, বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞান, দুটোই অপরিহার্য। শ্রেণিকক্ষে তত্ত্বীয় বিষয়ে পাঠদান করা গেলে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের জন্য বিজ্ঞানাগার থাকাটা অত্যাবশ্যক।

কেবল বিজ্ঞানাগারের অভাবে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যবহারিক জ্ঞানে অপূর্ণতা থেকে যাচ্ছে। আবার যেসব বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার আছে, সেখানেও এর সদ্ব্যবহার হয় না। দেখা যাচ্ছে, বিজ্ঞানাগার থাকলেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ নেই। তার ওপর অভাব রয়েছে শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে শেখানোর মতো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকেরও। এসব নানা কারণে বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরির মূল ধাপ মাধ্যমিকে এসে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে হলে ভৌত কাঠামোসহ বিজ্ঞান শিক্ষায় বিদ্যমান ঘাটতি দূর করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের সচেষ্টতা একান্ত প্রয়োজন। আজকের যুগ বিশ্বায়নের যুগ। বিশ্বায়নের মূলে রয়েছে বিজ্ঞানের অবদান। পাশ্চাত্য জগৎ বিজ্ঞানকে চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিনিয়ত গবেষণার মাধ্যমে মানব কল্যাণে নিত্য নতুন উদ্ভাবন করে চলেছে। এশিয়ায় অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বিজ্ঞান শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বে উন্নত দেশের সমাসনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। আজকের যুগ প্রতিযোগিতারও যুগ। বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে বিজ্ঞান শিক্ষায় অগ্রগতি অপরিহার্য। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে অগ্রসর হতে হলে বিজ্ঞান শিক্ষায় অগ্রগতির বিকল্প নেই।

আমাদের মনে রাখা দরকার, হাতে কলমে শিক্ষা ছাড়া বিজ্ঞান শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হবে না। কেবল ভবিষ্যতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতি হতে হলে কিংবা সাড়া জাগানো নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে হলে ব্যবহারিক বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ হওয়া ছাড়া গতি নেই। কারিগরি শিক্ষার ওপর আজকাল বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। এটা সময়েরই প্রয়োজন। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায়োগিক বিজ্ঞান শিক্ষায় জোর দেয়া দরকার। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষা ও চর্চার ভিত মজবুত হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা যে বিষয় বেছে নিক না কেন সেখানে ভালো করবে, সহজ ও প্রসারিত হবে তাদের দক্ষতা অর্জনের পথ। কাজেই প্রতিটি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের উচিত বিজ্ঞানাগার স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা। এ ব্যাপারে তাদেরই সর্বাগ্রে উদ্যোগী হতে হবে। একই সাথে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরেরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এমতাবস্থায় আমাদের প্রস্তাব, মাধ্যমিক স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ থাকলে বিজ্ঞানাগার স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

x