মাদক নির্মূল যুদ্ধ

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৯ মে, ২০১৮ at ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ
54

মাদক ইয়াবা নির্মূল অভিযান চলছে দেশব্যাপী। অভিযানে ২৬ মে পর্যন্ত বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৭৫ ছাড়িয়ে গেছে। গ্রেফতার হয়েছে কয়েক হাজারের বেশি। কড়া এবং রক্তাক্ত এই অভিযান নিয়ে বিএনপি এমন কী আধা সরকারি দল ও মহাজোটের শরিক এরশাদের জাতীয় পার্টি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। এরশাদ বলেছেন, মাদক সম্রাট সংসদেই আছে। তাকে শাস্তি দিলে দেশ মাদক নির্মূল হবে। এ’ ছাড়া সুশীল, চিন্তক সমাজের অনেকেই বন্দুক যুদ্ধের তীব্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, ভয়াল ইয়াবা বড়ির এন্ট্রি রুট টেকনাফের আলোচিতবিতর্কিত সরকারি দলের এমপিকে নিয়েও। অভিযোগ, ইয়াবা চোরাচালানে তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় দফায় দফায় খবর প্রকাশ হয়েছে। তাছাড়া ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায় সরকারের সংশ্লিষ্ট এজেন্সিতে তার নাম শীর্ষে থাকলেও কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না? এই অভিযোগ দিন দিন জোরালো হচ্ছে। কিছুদিন আগে দুদকে ডেকে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আলোচিত এমপির একজন বেয়াই এবং ইয়াবা ব্যবসায়ী অন্তঃকোন্দলে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছে বলে পুলিশসূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

এই ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেছেন, বিভিন্ন সরকারি গোয়েন্দা এজেন্সির অভিন্ন তালিকা ধরে মাদক বিরোধী অভিযান চলছে। মাদক ব্যবসা বা পাচারে যে বা যাদের সংশ্লিষ্টতা থাকুকনা কেন, কাউকে ছাড় দেয়া হবেনা। তিনি যে কোন দলের বা যতই প্রভাবশালী হোননা কেন, পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে বারবার একই প্রশ্নের তীরে বিদ্ধ হতে হচ্ছে। খুবই স্বাভাবিক। একে তো তিনি সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক তাছাড়া কিছুদিন আগে টেকনাফের এমপিকে নিয়ে কক্সবাজার, টেকনাফে দলীয় জনসভা করে এসেছেন। জনসভায় আলোচিত এমপির হাত ধরে তাকে আবারো টেকনাফ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে আসেন ওবায়দুল কাদের। তাই প্রশ্নটা বারবার অতি ব্যাস্ত সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেবের উপর আছড়ে পড়ছে। জবাবে তিনি বলছেন, যতই ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী হোন, সব মাদক ব্যবসায়ী ও পাচারকারীদের শাস্তি পেতেই হবে।

টেকনাফের এমপি প্রসঙ্গে তার উত্তর, কোনো নাক্ষী প্রমাণ ছাড়া একজন সংসদ সদস্যকে শাস্তি দেয়া যায়না। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত তালিকার শীর্ষে এই এমপির নাম থাকলেও এখন কোন কোন তালিকায় নাম নেই বলে জানা গেছে। কথা হচ্ছে, কোনভাবে কোন শীর্ষ মাদক সম্রাট বা গডফাদার যদি আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে রক্ষা পেয়ে যায়, তাহলে পুরো অভিযানের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। পাশাপাশি দেশে মাদক ভাইরাসের ভয়াল ছোবল প্রতিটা ঘরে ঘরেই আঘাত হানবে। হাজার হাজার চুনোপুঠির রক্তে বাংলার মাটি ভিজিয়েও মাদকের সর্বনাশা গ্রাস থেকে দেশকে বাঁচানো যাবেনা। এই ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কঠোর অবস্থান ধরে রাখতেই হবে। যিনি যতই ক্ষমতাধর হোন, মাদক ‘প্রভুবাবা’দের শাস্তির আওতায় আনতে হবেই। প্রয়োজনে ফিলিপিন, থাইল্যান্ড, মেক্সিকোর নজির সামনে রেখে এগুতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত অভিযান নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন, সুশীল ও চিন্তক সমাজের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তিও উঠেছে। এ’ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেতুমন্ত্রী এবং সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য হচ্ছে, মাদক ব্যবসায়ী বা ড্রাগ ডিলারেরা সশস্ত্র সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবসা চালায়। অভিযানে গেলে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর উপর তারা হামলা চালায়, আত্মরক্ষায় পাল্টা হামলায় বন্দুকযুদ্ধ বা এনকাউন্টারে নিহতের ঘটনা ঘটে। অভিযানে অংশ নেয়া বাহিনীর সদস্যরাও অনেকে আহত হয়েছেন।

অপ্রিয় হলেও আমাদের মানতে হবে,মানবাধিকার কিন্তু মানুষের জন্য, মানবেতর কোন দ্বিপদীর জন্য নয়। যারা সর্বনাশা মাদক, ইয়াবার ভয়াল নেশার নীল বিষে পুরো একটা প্রজন্মকে শেষ করে দিচ্ছে, তারা চেহারাঅবয়বে মানুষ হলেও মানবেতর দ্বিপদী হিংস্র জন্তু! এরা চারপেয়ে হিংস্র বন্য জন্তুর চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর ও নিকৃষ্ট। টাকা,সম্পদ, ক্ষমতা ও প্রভাবের লোভে আমাদের তারুণ্য ও শ্রেষ্ঠ জনশক্তির বড় অংশকে পঙ্গু ও জীবনীশক্তি তিল তিল করে নিংড়ে নিচ্ছে, ঘৃণ্য দ্বিপদীরা। মানবাধিকারের অজুহাতে এদের দয়া দেখানো মানে নিজের সন্তানকে ভয়াল মাদকের নীল বিষের দংশনে তিল তিল করে শেষ করে দেয়া! আমরা এটা পারিনা, কোনভাবেই। কিন্তু এটাও সত্য,জীবনমৃত্যুর এই খেলায় কোনভাবেই যেন একজন নিরাপদ বা নীরিহ ব্যাক্তিও ষেন শাস্তি না পান। এমন হলে পুরো দায়টা কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর চাপবে। মাদকযুদ্ধে সাফল্য আসলে নিশ্চিতভাবে জননেত্রী শেখ হাসিনার সাফল্যের মুকুটে সবচে’ হিরন্ময় আরেকটি নয়া পালক যুক্ত হবে। ভয়াল এক অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে জাতি। ব্যর্থতা বা কোন মাদক সম্রাটকে দায়মুক্তি তার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধও করতে পারে। আশা করি, তিনি সর্বোচ্চ সতর্ক আছেন। ঝাড়বংশে মাদক নির্মূলের পর দুর্নীতি বিরোধী চিরুনী অভিযান শুরু করাও জরুরি। কারণ, আমাদের কারো কারো ভিতরে লোভের অতিকায় দৈত্য ঘাটি গেড়ে বসে আছে। বিশেষ করে সরকারি দল, অনুগ্রহভাজন আমলা, লুঠেরা মাফিয়া এবং একশ্রেণির সুবিধাভোগী পেশাজীবীদের মাঝে লোভ ভাইরাসের সংক্রমণ এখন ভয়াবহ।

কিছু মানুষের সম্পদ ও ভোগ ক্ষুধা সাত মহাসাগরের গভীরতাকে হার মানিয়েছে। কোনভাবেই এই ক্ষুধার আগ্রাসন থামছেনা। অতল ক্ষুধার সর্বনাশা ভাইরাস নির্মূলে দরকার দুর্নীতি বিরোধী সর্বাত্মক যুদ্ধ। আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশ ও জাতির স্বার্থে বিষয়টা দ্রুত বিবেচনায় নিবেন।

x