মাত্র ২৫ শতাংশ জনবল দিয়েই চলছে কাস্টম হাউসের ল্যাব

পণ্য খালাসে বিলম্ব, ব্যবসায়ীদের গুনতে হয় লোকসান

জাহেদুল কবির

সোমবার , ৪ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ
48

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের সিংহভাগ আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী, আমদানি পণ্য বন্দর থেকে খালাসের আগে ক্ষেত্র বিশেষে পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করতে হয়। রাসায়নিক পরীক্ষকরা ঘোষণা অনুযায়ী পণ্যের গুণগতমান ঠিক আছে কিনা সেটি পরীক্ষা করে দেখেন। কেবল রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট সন্তোষজনক হলেই খালাসের অনুমতি মেলে। আবার কোনো আমদানিকারক মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য নিয়ে এলে নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদনে পরীক্ষকরা সেই পণ্যের যথাযথ শুল্কায়নের জন্য সুপারিশ করে থাকেন। অথচ বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাসায়নিক পরীক্ষাগারে (ল্যাব) জনবল সংকটে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে আমদানি-রপ্তানির গতি বাড়লেও চাহিদার মাত্র ২৫ শতাংশ জনবল দিয়েই চলছে কাস্টমসের ল্যাবটি। জনবল সংকটের কারণে সঠিক সময়ে নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেক সময় পণ্য খালাসেও বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়া বন্দরে আমদানি পণ্য পড়ে থাকায় ব্যবসায়ীদের আবার ডেমারেজ গুনতে হয়।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ল্যাবে বিদ্যমান জনবল কাঠামোতে ১৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ৪ জন। এছাড়া কাঠামোর বাইরে দু’জনকে ‘উর্ধ্বতন সহকারী পরীক্ষক’ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এরমধ্যে বর্তমানে আছেন মাত্র একজন। অথচ জনবল কাঠামো অনুযায়ী একজন প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক এবং ৩ জন উপ-প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষকের পদ ল্যাবের কার্যক্রম শুরু থেকেই শূণ্য রয়েছে। বর্তমানে দুইজন রাসায়নিক পরীক্ষকের মধ্যে আছেন একজন। এছাড়া ৬ জন সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষকের মধ্যে একজনও নেই। জনবল কাঠামো অনুযায়ী ৩ জন ল্যাব এটেন্ডেন্ট থাকলেও আবার পিয়ন নাই। ফলে প্রতিদিন ল্যাবে যে পরিমাণ পণ্যের নমুনা এসে জমা হচ্ছে, সেইসব পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেই রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে পরীক্ষকদের।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ল্যাবের জন্য প্রস্তাবিত জনবল কাঠামোতে ৮টি পদে ৯৫ জনকে নিয়োগের প্রস্তাব করেছে। এরমধ্যে রয়েছেন, একজন অতিরিক্ত প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক, ৩ জন উপ-প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক, ৮ জন রাসায়নিক পরীক্ষক, ৪৬ জন সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক, ৬ জন ল্যাব এটেন্ডেন্ট, এবং একজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর। তবে কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পদ সৃষ্টির বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনুমোদিত হলেও নিয়োগবিধি চূড়ান্তকরণের নথিটি আইন মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। এছাড়া নিয়োগবিধির কিছু অংশ সংশোধনের জন্য আইন মন্ত্রণালয় অনেক আগে এনবিআরে পাঠালেও এখন পর্যন্ত তা চূড়ান্ত হয়নি। ফলে রাসায়নিক পরীক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় কাউকে নিয়োগ দিতে পারেনি এনবিআর।
নাম প্রকাশ করার না শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান জনবল কাঠামো অনুযায়ী রাসায়নিক পরীক্ষাগার পরিচালিত হচ্ছে যুগ্ম কমিশনারের অধীনে। তবে প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো অনুসারে রাসায়নিক পরীক্ষাগার পরিচালিত হবে সরাসরি কাস্টম হাউসের কমিশনারের অধীনে। এক্ষেত্রে আবার জনবল কাঠামো সংশোধনের ফাইলটিও কাস্টমসের টেবিলে পড়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়াটিও তাই ঝুলে আছে।
অন্যদিকে ল্যাবের পরীক্ষকরা জানান, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ল্যাবে প্রতিদিন বিভিন্ন পণ্যের ৬০-৭০টি নমুনা আসে। এগুলো আবার দ্রুত টেস্ট করে দিতে হয়। কিন্তু জনবলের সংকটের কারণে পরীক্ষকদের রীতিমত নাভিশ্বাস উঠে যায়। বিদ্যমান জনবল দিয়ে যেখানে ১২-১৫টি নমুনা পরীক্ষা করার কথা, সেখানে বর্তমানে করতে হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০টি পর্যন্ত পরীক্ষা।
কাস্টম হাউসের কয়েকজন স্টেকহোল্ডার জানান, বর্তমানে আগের চেয়ে আমদানি-রপ্তানির পরিমান বেড়েছে। অথচ কাস্টম হাউসের ল্যাবটি চলছে সেই মান্ধাতা আমলের সিস্টেমে। পরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ব্যবসায়ীরা সঠিক সময়ে পণ্য খালাস করতে পারে না। এতে ব্যবসায়ীদের ডেমারেজ গুনতে হয়। তাই কাস্টমস কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত জনবল নিয়োগের বিষয়টি সুরাহা করা। আবার দেখা যায়, যন্ত্রপাতির অভাবে কিছু কিছু পরীক্ষা এখানে করা যায় না। বাধ্য হয়ে তখন পণ্যের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়। এতেও ব্যবসায়ীদের সময়ক্ষেপন হয়।
রাসায়নিক পরীক্ষাগারের জনবল সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টস হাউসের কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে বর্তমানে প্রস্তাবিত জনবল কাঠামোটি আগের জায়গাতে আছে। তবে জনবল সংকটের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

x